করোনাকালে কেমন আছে চিড়িয়াখানার পশু-পাখিরা

Send
হাসনাত নাঈম
প্রকাশিত : ১৩:০৫, আগস্ট ০১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০৮:৩৪, আগস্ট ০২, ২০২০

হরিণরাস্তা ভরা শ্যাওলা। মানুষের শোরগোল নেই কোনও। ভেসে আসে পাখির কিচিরমিচির। কান পাতলে শোনা যায় বাঘের হালুমসহ বিভিন্ন পশুর ডাক। বাংলাদেশ জাতীয় চিড়িয়াখানার পরিবেশটা এখন এমনই। দর্শনার্থীরা প্রাণীদের দেখা পেতে মুখিয়ে থাকতো এখানে। আর এখন মাথা উঁচিয়ে দলবেঁধে প্রাণীরাই যেন মানুষ দেখতে উন্মুখ হয়ে থাকে!

করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের কারণে প্রায় চার মাসেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ রয়েছে জাতীয় চিড়িয়াখানা। এ কারণে প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও পশুপাখির পরিচর্যার দায়িত্বপ্রাপ্তরা ছাড়া কেউই এতে প্রবেশ করতে পারেননি। ফলে এখানে সুনসান নীরবতা। যত্রতত্র চিপসের প্যাকেট কিংবা পানীয়র বোতলসহ ময়লা-আবর্জনা পড়ে নেই। বলা যায় অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে চিড়িয়াখানা। পশুপাখির জন্য এ যেন গহীন জঙ্গলের আবাসের মতো।সিংহ

জাতীয় চিড়িয়াখানা ঘুরে ভেতরের পিচঢালা রাস্তা ছাড়া বাকি সবখানে শ্যাওলা দেখা গেছে। পুরো জায়গাটি গাছ-গাছালিতে পরিপূর্ণ থাকায় বাইরের চেয়ে এখানকার তাপমাত্রা কিছুটা শীতল।

কেমন আছে চিড়িয়াখানার পশু-পাখি

বর্তমানে জাতীয় চিড়িয়াখানা জনমানব শূন্য হওয়ায় পশু-পাখি নিশ্চিন্তে বিচরণ করছে। কারও মনে ভয়ডর নেই। খাঁচার এক কোণে লুকিয়ে থাকতে হচ্ছে না। এখন ওরা মানুষ দেখলে বরং সামনে এগিয়ে আসে। তাদের অবাক দৃষ্টি বলে, এরা কারা!কুমির

চিড়িয়াখানার কিউরেটরের কার্যালয়ের সামনেই বক প্রজাতির পাখি মদনটাকের খাঁচা। কাছে গেলেই লম্বা গলা উঁচিয়ে ভালোভাবে দেখার চেষ্টা করে সে। মাঝে মধ্যে জোরেশোরে ডাকও ছাড়ে সবাই মিলে।জলহস্তি

আরেকটু সামনে গেলে দেখা যায় হরিণ। প্রায় শতাধিক হরিণ আপন মনে বিচরণ করছে। কখনও দলবেঁধে দৌড়াচ্ছে, কখনোবা সবাই একত্র হয়ে মানুষ দেখতে আসছে। এর অদূরেই বাঘের খাঁচা। শিকারের ইচ্ছে থাকলেও হরিণদের পানে তাকিয়ে দেখা ছাড়া তার আর কোনও কাজ নেই। সে অলস সময় পার করে শুয়ে-বসে।জিরাফ

রেসাস বানরগুলো বসে আছে আয়েশি ভঙ্গিতে। অজগর সাপগুলো একই ঢঙে বিশ্রাম নিচ্ছে। উল্লুক তো রীতিমতো সঙ্গিনীর মাথা থেকে উঁকুন বেছে দিচ্ছে। জলহস্তী নাক-চোখ ভাসিয়ে রীতিমতো পানিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। একইভাবে কুমির নাক ভাসিয়ে গা ডুবিয়ে ঘুমাচ্ছে। হাতিগুলো মনের আনন্দে পানিতে দাঁড়িয়ে গোসল করছে, কোনোটা আবার ঠাঁয় রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে।বাঘ

সবচেয়ে মজার ব্যাপার, জিরাফের খাঁচার কাছে গেলে ওরাই বরং মানুষ দেখতে থাকে। খাঁচার কাছে যেতেই সব জিরাফ মাথা উঁচিয়ে তাকিয়ে আছে। মনে হলো, ওরা বুঝি মানুষ দেখলো কয়েক জনম পরে! হায়েনার ব্যাপারও একই, সামনে গেলে এই প্রাণীরা কাছে চলে আসে।জেব্রা

চিড়িয়াখানার সব গাছেই আছে কাঠবিড়ালি। তারা কোনোভাবেই নিজেদের চোখ এড়াতে দেয় না। ময়ূর পেখম তুলে নাচে মগ্ন। গ্রেটার ফ্লেমিংগো চত্বর তো তাদের কিচিরমিচিরে মুখর।ময়ূর

করোনাকালে চিড়িয়াখানায় জন্মেছে প্রায় অর্ধশত প্রাণী

চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গত ২০ মার্চ থেকে আজ পর্যন্ত প্রায় ৫০টি নতুন প্রাণী জন্ম নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জিরাফ, জেব্রা, ঘোড়া, জলহস্তী, হরিণ, ময়ূর, ইমু পাখি। এছাড়া অস্ট্রিচের ৯টি ডিম পাওয়া গেছে। এগুলো ফোটানোর অপেক্ষায় আছে।বানর

দর্শনার্থী না থাকাকে প্রাণীদের জন্য ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন বাংলাদেশ জাতীয় চিড়িয়াখানার কিউরেটর ডা. মো. নুরুল ইসলাম। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পশু-পাখি এখন আপন মনে ঘুরে বেড়াচ্ছে। দর্শনার্থী থাকলে পশু-পাখি ভয়ে খাঁচার এক কোণে বসে থাকতো। ওরা ঠিকমতো খেতো না, খাবার নষ্ট হতো। কিন্তু এখন কোনও খাবার নষ্ট হয় না। বর্তমানে পশুপাখির প্রজনন সঠিকভাবে হচ্ছে। ফলে বিভিন্ন প্রাণীর প্রসব হার বৃদ্ধি পেয়েছে, পাখি শাখায় ডিম উৎপাদন বেড়েছে।’হাতি

করোনাকালীন পরিস্থিতি নিয়ে এই কর্মকর্তার ভাষ্য, ‘চিড়িয়াখানা প্রতিষ্ঠার শুরু থেকে এখন পর্যন্ত কখনও একদিনের জন্য জনমানব শূন্য ছিল না। বর্তমানে চিড়িয়াখানা বন্ধ থাকলেও আমাদের দৈনন্দিন কাজ নিয়মিতভাবে করে যাচ্ছি। প্রাণীদের সুরক্ষায় আমরা সবসময় সজাগ আছি।’

ছবি: সাজ্জাদ হোসেন

 

 

/জেএইচ/

লাইভ

টপ