পুরনো রূপে ‘সড়ক শৃঙ্খলা’

Send
শাহেদ শফিক
প্রকাশিত : ১১:০১, সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১১:০১, সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২০

শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের পর সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে নানা পদক্ষেপ নিয়েছিল সরকার। এজন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে কঠোর নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছিলো। তাতে এ সেক্টরে অনেক পরিবর্তন আসে। কিন্তু বছর দুয়েক যেতে না যেতেই পাল্টে গেলে সেই চিত্র। সরকার প্রধানের পক্ষ থেকে যেসব নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিলো তা পালন করা হচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর উদাসীনতা দেখা দিয়েছে। ফলে সড়ক জুড়ে সেই পুরানো বিশৃঙ্খলা আবার নতুন করে দেখা দিয়েছে।

২০১৮ সালের ২৯ জুলাই রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে বাসের চাপায় দুই শিক্ষার্থী মারা যায়। এর প্রতিবাদে সারাদেশে নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনে নামে শিক্ষার্থীরা। ওই আন্দোলনের পর ১৬ আগস্ট ঢাকা শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রীর তৎকালীন মুখ্য সচিব মো. নজিবুর রহমানের সভাপতিত্বে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় নগরীর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন ও গণপরিবহন ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফেরাতে অন্তত ডজন খানেক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চলাচলের সময় সব গণপরিবহনের দরজা বন্ধ রাখা, নির্ধারিত স্টপেজ ছাড়া যাত্রী ওঠানামা বন্ধ করা, বাসের ভেতর চালক ও হেলপারের বৃত্তান্ত প্রদর্শন, চালক ও যাত্রীদের সিট বেল্টের ব্যবস্থা রাখা, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় স্বয়ংক্রিয় ও রিমোট কন্ট্রোলড অটোমেটিক বৈদ্যুতিক সিগন্যাল ব্যবস্থা চালু করা, মহাসড়ক বা দূর পাল্লার বাসে চালক এবং যাত্রীদের জন্য সিট বেল্ট স্থাপন করার মতো পদক্ষেপ নেওয়া অন্যতম। কিন্তু সেসব নির্দেশনার কোনওটিই এখন আর দেখা যাচ্ছে না। এ নিয়ে সাধারণ যাত্রীদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে।

নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সরকারের নির্দেশনা অমান্য করে যত্রতত্র যাত্রী উঠানো হচ্ছে। নির্ধারিত স্থানে বাস দাঁড়ায় না। যাত্রী পারাপারের সময় অধিকাংশ পরিবহনের দরজা খোলা থাকে। লাগানো হয়নি চালক ও হেলপারদের জীবন বৃত্তান্ত। অধিকাংশ সড়ক থেকেও মার্কিং উঠে গেছে। স্টপেজগুলোও চিহ্নিত নেই।

দুই সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের চাহিদা অনুযায়ী বর্তমানে সংস্থা দুটি দেড় শতাধিক বাস স্টপেজ ও যাত্রী ছাউনি নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে ডিএসসিসির কেইস প্রকল্পের আওতায় দুই সিটিতে ১০টি করে ২০টি যাত্রী ছাউনি নির্মাণ করা হয়। এছাড়া ডিএসসিসির মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে নির্মাণ করা হয়েছে আরও ২০টি। বাকিগুলো নির্মাণাধীন রয়েছে। তবে সরেজমিনে দেখা যায়, দৃষ্টিনন্দন এসব ছাউনির বেশির ভাগের সামনেই বাস দাঁড়ায় না। কোথাও কোথাও যাত্রী ছাউনিগুলো ভেঙে পড়েছে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) উপ-পরিচালক (এনফোর্সমেন্ট) মোহাম্মাদ আব্দুর রাজ্জাক বলেন, সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর জন্য প্রতিদিন আমাদের ১০-১২টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হয়। তাছাড়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি সরকারের ট্রাফিক ডিভিশনও কাজ করছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনাগুলো সব পরিবহন মালিকদের জানিয়ে দিয়েছি। আর এগুলো দেখার দায়িত্ব বিআরটিএ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। আমাদের পক্ষ থেকে যা যা করার দরকার আমরা সব করছি।’

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ওই বৈঠকে সড়ক ব্যবস্থাপনায়ও ৯টি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য সিটি করপোরেশনকে নির্দেশ দেওয়া হয়। সেই নির্দেশনাগুলো হচ্ছে- রাজধানীর যেসব স্থানে ফুটওভার ব্রিজ বা আন্ডারপাস রয়েছে, তার উভয় পাশে ১০০ মিটারের মধ্যে রাস্তা পারাপার সম্পূর্ণ বন্ধ করতে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি যারা আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে ফুটওভার ব্রিজ বা আন্ডারপাস ব্যবহার করবেন, তাদের ‘ধন্যবাদ’ কিংবা ‘প্রশংসাসূচক’ সম্বোধনের ব্যবস্থা নিতে হবে। এছাড়া, ফুটওভার ব্রিজ ও আন্ডারপাসে প্রয়োজনীয় পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। লাগাতে হবে পর্যাপ্ত সিসি ক্যামেরা। ওই ২০১৮ সালের ২০ আগস্টের মধ্যে এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়। এছাড়া ৩০ আগস্টের মধ্যে আন্ডারপাস ও ফুটওভার ব্রিজের বাইরে আয়নার ব্যবস্থা করতে বলা হয়।

১৮ আগস্টের মধ্যে শহরের সব সড়কে জেব্রা ক্রসিং ও রোড সাইন দৃশ্যমান করে ফুটপাত দখলমুক্ত, অবৈধ পার্কিং এবং অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং সড়কের নাম ফলক দৃশ্যমান স্থানে সংযোজনের জন্য দুই সিটি করপোরেশন ও ডিএমপিকে নির্দেশ দেওয়া হয়। তখন নির্দেশনাগুলোর মধ্যে শুধুমাত্র জেব্রা-ক্রসিং ও কিছু সিগন্যাল সাইন লাগানো হয়। পরবর্তীতে জেব্রা-ক্রসিং এর মার্কিং উঠে গেলেও তা আর স্থাপন করা হয়নি। সড়কে স্বয়ংক্রিয় বৈদ্যুতিক সিগনাল ব্যবস্থাপনা স্থাপন করে তা পুলিশকে হস্তান্তর করবে। এছাড়া, রাজধানীতে রিমোট কন্ট্রোল অটোমেটিক বৈদ্যুতিক সিগনালিং চালু করতে হবে। কিন্তু সিগন্যাল বাতিগুলো ঠিক করা হলেও তা চালু করা হয়নি। ফলে হাতের ইশারায় চলছে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ।

বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে ডিএসসিসির প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ ও ট্রাফিক সিগন্যাল প্রকল্পের পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সড়কের অনেক জায়গা থেকে মার্কিং উঠে গেছে। সেগুলো আবার স্থাপনের জন্য মেয়র নির্দেশ দিয়েছেন। এছাড়া ট্রাফিক সিগন্যালের যেসব ত্রুটি ছিল তা ঠিক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

বুধবার নগরীর বাংলা মটর এলাকায় দেখা গেছে শাহবাগ থেকে বাংলামটর পেরিয়ে পান্থকুঞ্জ পার্কের কোনায় একটি যাত্রী ছাউনি ও বাস স্টপেজ রয়েছে। কিন্তু যাত্রী ছাউনিটি থাকলেও মার্কিং উঠে যাওয়ায় তাতে বাস স্টপেজ চিহ্নিত নেই। সেখানে কোনও বাসকে দাঁড়াতে দেখা যায়নি। এই পথ দিয়ে চলাচলরত প্রায় প্রতিটি বাসকেই বাংলামটর সিগন্যালেই যাত্রী উঠানামা করতে দেখা গেছে।

কথা হয় শিখর পরিবহনের চালক নাজিম উদ্দিনের সঙ্গে। তিনি বলেন, কোথাও কোনও রোড মার্কিং নেই। বাস স্টপেজ চিহ্নিত নেই। যাত্রীদের মাঝেও সচেতনতা নেই। তারা মোড় আসলেই বাসে উঠতে বা বাস থেকে নামতে পারাপারি শুরু করে। একটু দূরে গিয়ে স্টপেজে যেতে চায় না। এসব নিয়ে বাকবিতণ্ডা করে।

নগরীর বাসাবো এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে সিটি করপোরেশন কর্তৃক নির্মিত ছাত্রী ছাউনিটি ভেঙে গেছে। তাতে বসার কোনও ব্যবস্থাও নেই। সামনের বাস স্টপেজটির মার্কিংও উঠে গেছে। ফলে যেখানে সেখানেই যাত্রী উঠানামা হচ্ছে।

সেখানে বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা রফিক, রহমান ও নসরুল হামিদ বলেন, সড়কে যখন কোনও লাশ পড়ে তখনই সবার টনক নড়ে। কয়েক দিন গেলে সব ভুলে যায়। ঠিক ২০১৮ সালে কলেজের শিক্ষার্থী রাজীব ও দিয়ার মৃত্যুর পর যখন আন্দোলন শুরু হয় তখন কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। এখন আবার আগের মতই হয়ে গেছে।

/এমআর/

লাইভ

টপ
X