নির্মাণ শ্রমিকদের নিরাপত্তা চিঠি চালাচালিতেই সীমাবদ্ধ

Send
শাহেদ শফিক
প্রকাশিত : ১৪:০০, অক্টোবর ২৪, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২১:০১, অক্টোবর ২৪, ২০২০

BT-Newনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত না করেই দেশে ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। ফলে নির্মাণ সেক্টরে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটছে। তাতে শ্রমিকসহ সাধারণ মানুষের হতাহতের ঘটনাও ঘটছে। কিন্তু তদারকির সংস্থা কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদফতর এবং রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) কোনও ব্যবস্থা নিচ্ছে না। নেই কোনও নজরদারি। কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে তাদের কার্যক্রম মালিকপক্ষের সঙ্গে চিঠি চালাচালিতেই সীমাবদ্ধ। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এ সেক্টরের সঙ্গে জড়িত নির্মাণ শ্রমিক ও সাধারণ পথচারীরা। তারা বলছেন, সরকার ও মালিকপক্ষের চরম অবহেলার কারণে এমন ঘটনাগুলো ঘটছে।

গত ১৭ অক্টোবর রাজধানীর মোহাম্মদপুরে একটি নির্মাণাধীন ভবন থেকে রড পড়ে এক নারী নিহত হন। সে ঘটনায় ওই নির্মাণাধীন ভবনের মালিকের বিরুদ্ধে এখনও কোনও মামলা করা হয়নি। এছাড়া গত ২৮ সেপ্টেম্বর ধানমন্ডির ৩২ নম্বর এলাকায় একটি বহুতল ভবনের নির্মাণ কাজ করা অবস্থায় মাচা ভেঙে ৩ জন শ্রমিক নিহত হন।

নির্মাণ শ্রমিকরা বলছেন, কর্মক্ষেত্রে তাদের নিরাপত্তার জন্য যথেষ্ট আইন রয়েছে। কিন্তু সেই আইনের প্রয়োগ হচ্ছে না। বর্তমানে আইনের ১০ শতাংশও সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে নির্মাণ সেক্টরটি নিরাপদ হচ্ছে না। প্রতিনিয়ত ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিআইএলএস) তথ্যমতে, গত ছয় বছরে রাজধানীতে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় ৬২০ জন শ্রমিক নিহত হয়েছেন। এ সময় আহত হয়েছে ৫৭৮ জন। তাদের মধ্যে অনেকেই পঙ্গু জীবন-যাপন করছেন। এর মধ্যে ২০১৫ সালে ৬১ জন, ২০১৬ সালে ৮৫ জন, ২০১৭ সালে ১৩৪ জন, ২০১৮ সালে ১৬১ জন, ২০১৯ সালে ১৩৪ জন এবং চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত ৪৫ জন নিহত হয়েছেন। তাতে দেখা গেছে, দুর্ঘটনার সংখ্যা প্রতিবছর দিন দিন বাড়ছে। আর ২০০২ সাল থেকে চলতি বছর পর্যন্ত ১৯ বছরে কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় এক হাজার ৭০৬ শ্রমিক নিহত হয়েছেন।

দুর্ঘটনার কারণ উল্লেখ করতে গিয়ে বিআইএলএস জানিয়েছে, ভালো সিঁড়ির অভাব ও সিঁড়িতে পর্যাপ্ত আলোর অভাব; এলোমেলোভাবে রড, বালু ও ইট রাখা; কর্মক্ষেত্রে নেট না থাকা অথবা নাজুক নেটের ব্যবহার; কপিকলের ব্যবস্থা না থাকা; হেলমেট, গ্লাভসের ব্যবস্থা না করা; খালি পায়ে কাজ করা; অসাবধানতা ও অসচেতনভাবে আবদ্ধ স্থানে প্রবেশ, প্রচণ্ড রোদে কাজ করা; ত্রুটিপূর্ণ যন্ত্রপাতির ব্যবহার; বিশ্রাম কম; দুর্বল মাচা; দেয়াল বা মাটি চাপা পড়া; ঝুলন্ত অবস্থায় কাজের সময় বেল্ট ব্যবহার না করা; ভালো জুতা বা বুট ব্যবহার না করা; আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব ও ত্রুটিপূর্ণ বৈদ্যুতিক লাইনের কারণে দুর্ঘটনা ঘটছে।

দুর্ঘটনার মধ্যে ওপর থেকে পড়ে মৃত্যু; ওপর থেকে পড়ে অঙ্গহানি; মাটিচাপা পড়ে মৃত্যু; বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনায় মৃত্যু; মাটি বহনকারী গাড়ি দুর্ঘটনা অগ্নিদগ্ধ হওয়া; চোখে আঘাত লাগা বা অন্ধ হয়ে যাওয়া; মাথায় আঘাত পাওয়া; হাত, পা কেটে বা ভেঙে যাওয়া ও আবদ্ধ গ্যাসে মৃত্যু হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিআইএলএস-এর পরিচালক কোহিনূর মাহমুদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, নির্মাণ খাতের বড় বড় ফার্ম কিছুটা নীতিমালা মেনে চলে। সেক্ষেত্রে ছোট ছোট কিংবা ব্যক্তি মালিকানাধীন ভবনগুলো এই নীতিমালা মানতে চায় না। সেখানে ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে। আর আমরা পত্রিকাগুলো অনুসন্ধান করে দুর্ঘটনার যে সংখ্যা পাচ্ছি প্রকৃতপক্ষে তা আরও অনেক বেশি। শুধুমাত্র বড় বড় কোনও কোম্পানির নির্মাণে যদি কোনও শ্রমিক নিহত হয় সেগুলোই পত্রিকায় বেশি প্রকাশ পায়।

তিনি আরও বলেন, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান অধিদফতরকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। এই প্রতিষ্ঠান প্রধানের পদের নামই হচ্ছে ‘পরিদর্শক’। কিন্তু পরিদর্শনের জন্য যদি তার পর্যাপ্ত ক্ষমতা না থাকে তাহলে সেখানে আইনের প্রয়োগ কীভাবে হবে? তাই দাবি অনুযায়ী তাদের ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার দেওয়া উচিত।

রাজধানীতে এমন কী পরিমাণ ভবন ঝুঁকি নিয়ে নির্মাণ হচ্ছে তার তথ্য সঠিক কোনও তথ্য নেই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোতে। রাজউক বলছে, তারা বিল্ডিং কোড অনুযায়ী ভবন নির্মাণ হচ্ছে কিনা সে বিষয়টি দেখছেন। নির্মাণের ক্ষেত্রে শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি দেখাশোনার মূল দায়িত্ব কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদফতরের। বিষয়টি নিয়ে বক্তব্য দিতে রাজি হননি রাজউক চেয়ারম্যান সাঈদ নূর আলম।

জানতে চাইলে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদফতরের ঢাকা জেলার উপ-মহাপরিদর্শক এ কে এম সালাউদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমাদের জনবলের অভাব রয়েছে। আমাদের চাহিদা হচ্ছে ২০ হাজার জনবলের। কিন্তু সেখানে মন্ত্রণালয় থেকে ৩ হাজার জনবল চাওয়া হয়েছে। সেটার অনুমোদন পেলে হয়তো সমস্যার কিছুটা সমাধান হবে। এর মধ্যেও আমরা তৈরি পোশাক শিল্পের (আরএমজি)  পাশাপাশি নির্মাণ সেক্টরকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি। কারণ আমরা দেখেছে এ সেক্টরে বেশি মৃত্যু ঘটছে। আমাদের যে জনবল আছে সেটা দিয়ে প্রতিদিন নির্মাণাধীন ভবন পরিদর্শন করছি। পাশাপাশি আমাদের জনবলকে প্রশিক্ষণের জন্যও ব্যবস্থা করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, আমরা প্রথমে কোনও ভবনে যখন দেখি নিরাপত্তা বিঘ্নিত করে নির্মাণ করা হচ্ছে তখন প্রথমে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে ভবন মালিককে চিঠি দিয়ে জানাই। তাতে সমাধান না হলে দ্বিতীয় চিঠি দিয়ে থাকি। এরপরেও সমাধান না হলে তৃতীয় চিঠি দিয়ে কোর্টে মামলা করি। কিন্তু বিষয়টি হচ্ছে আমাদের হাতে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা নেই। ফলে আমরা তাৎক্ষণিক কোনও ব্যবস্থা নিতে পারি না। আর কোর্টে মামলা হলে সেটা একটু দীর্ঘ সময় লেগে যায়। আমরা আইন প্রয়োগের সেই ক্ষমতা চাই।

নির্মাণ শ্রমিকরা জানিয়েছেন, রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে প্রতিদিন গড়ে ৪০ লাখের মতো নির্মাণ শ্রমিক কাজ করছেন। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে না। বহুতল ভবনে নির্মাণ শ্রমিকরা অরক্ষিত অবস্থায় কাজ করে। তাতে কোনও ধরনের জীবন রক্ষাকারী সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয় না। ভবন নির্মাণে যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় নির্মাণ শ্রমিকদের পাশাপাশি আশপাশের মানুষ ও ভবনের নিচের পথচারীরা নিরাপত্তাহীনতায় থাকেন। শ্রমিকরা আইনি সুরক্ষাও পাচ্ছেন না।

জাতীয় বিল্ডিং কোডে কর্মকালীন একজন শ্রমিকের কী কী নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নিতে হবে তার বিস্তারিত উল্লেখ থাকলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে। আর বিষয়টি তদারক করার দায়িত্ব যাদের, তারাও উদাসীন। ফলে নিরাপত্তা উপেক্ষিত থাকায় প্রাণহানির সংখ্যা বাড়ছে।

কর্মক্ষেত্রে কোনও শ্রমিক মৃত্যুবরণ করলে আগে এক লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিধান ছিল। তবে ২০১৮ সালের শ্রম আইন মৃত্যুর কারণে শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ দ্বিগুণ করে দুই লাখ টাকা করা হয়েছে। আহত হয়ে স্থায়ীভাবে অক্ষম হলে ক্ষতিপূরণের টাকাও দ্বিগুণ করা হয়েছে। আগে এই ক্ষতিপূরণ ছিল এক লাখ ২৫ হাজার টাকা। এখন সেটা বাড়িয়ে করা হয়েছে আড়াই লাখ টাকা।

২০১৪ সালের জাতীয় বিল্ডিং কোড অনুযায়ী কাজের সময় শ্রমিকের মাথায় হেলমেট পরা বাধ্যতামূলক করা হয়। এছাড়া যারা কংক্রিটের কাজে যুক্ত তাদের হাতে গ্লাভস ও চোখের জন্য ক্ষতিকর কাজে শ্রমিকদের চশমা ব্যবহার পরিধান করতে হবে। ওয়েল্ডার ও গ্যাস কাটার ব্যবহারের সময় রক্ষামূলক সরঞ্জাম যেমন গ্লাভস, নিরাপত্তা বুট, অ্যাপ্রোন ব্যবহার করতে হবে। তাছাড়া ন্যাশনাল বিল্ডিং কোডে ভবনের ওপরে কাজ করার সময় শ্রমিকের নিরাপত্তায় বেল্ট ব্যবহারও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কিন্তু এর কোনোটিই বাস্তবে দেখা যায় না। এসব নিশ্চিত করবে ভবন মালিকপক্ষ।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ নির্মাণ শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সরকারের ন‌্যূনতম মজুরি বোর্ডের সদস্য শেখ মোহাম্মদ নুরুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, নির্মাণ শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্র কখনও নিরাপদ ছিল না। আইনে যা যা বলা আছে বর্তমানে তার মাত্র ১০ শতাংশ বাস্তবায়ন হচ্ছে। আমরা এটাকে কমপক্ষে ৭০ শতাংশ যাতে নিশ্চিত করা হয় তার দাবি জানাচ্ছি। আইন যদি কড়াকড়িভাবে বাস্তবায়ন করা হয় তাহলে কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের মৃত্যু শূন্যে নেমে আসবে বলে আশা করি। এজন্য শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্র তদারকির দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠান কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদফতরের সক্ষমতা আরও বাড়াতে হবে।

/এমআর/এমএমজে/

লাইভ

টপ