হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার রশিদপুর ও ফয়জাবাদ চা বাগানের কোল ঘেঁষে নিভৃত এক গ্রাম সুন্দ্রাটিকি। বাহুবল সদর থেকে ৫ কিলোমিটার দূরের এ গ্রামের অধিকাংশ লোকই শ্রমজীবী। কাজ করেন চা বাগান, লেবু বাগানে। অন্যান্য টুকটাক কাজও করেন কেউ কেউ। অবস্থাপন্ন কিছু পরিবারও রয়েছে এ গ্রামে। আলাদা কোনও বিশেষত্ব না থাকায় আশপাশের দু’দশ গ্রামের মতো সুন্দ্রাটিকিরও তেমন পরিচিতি ছিল না। তবে নৃশংস এক ঘটনায় দেশজুড়ে পরিচিত হয়ে উঠেছে নিভৃত এ গ্রামটি। গ্রামের একটি বিল থেকে চার শিশুর মাটিচাপা লাশ উদ্ধারের পর রাতারাতি গ্রামটি পরিচিত হয়ে পড়ে দেশজুড়ে। বর্তমানে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে গ্রামটি। আর এই আলোচনার ভেতরে সবচেয়ে ‘বিতর্কিত’ ও ‘সমালোচিত’ চরিত্রের নাম আব্দুল আলী ওরফে বাগাল।
সুন্দ্রাটিকি গ্রামের মৃত আব্দুল জব্বারের ছেলে আব্দুল আলী। জীবিকা নির্বাহের তাগিদে অনেক বছর আগে তিনি ফয়জাবাদ চা বাগানে পাহারাদারের কাজ নেন। স্থানীয়ভাবে তিনি পরিচিত ‘বাগাল’ নামে। দীর্ঘদিন ধরে বাগানে কাজ করায় তার নামের সঙ্গেই জুড়ে যায় বাগাল শব্দটি। এ পেশায় যুক্ত থাকার সুবাদে ইতোমধ্যে তিনি কৌশলে চা বাগানের বেশকিছু ভূমি দখল করে ফল বাগানও গড়েছেন। এছাড়াও চা-বাগানের গাছ পাচারে তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ পাওয়া গেছে স্থানীয়দের কাছে।
দু’দুটি খুনের ঘটনাও জড়িয়ে আছে আব্দুল আলীর নামের সঙ্গে। প্রায় ২৫ বছর আগে সুন্দ্রাটিকি গ্রামে খুন হয়েছিলেন আব্দুল জলিল নামে এক ব্যক্তি। তখন অভিযোগের আঙুল উঠেছিলো আব্দুল আলীর দিকেও। এর ৫ বছর পর আরও একটি হত্যার ঘটনা ঘটে সুন্দ্রাটিকি গ্রামে। রশিদপুর চা বাগানের নাচঘরের পাশ থেকে উদ্ধার হয় ভাদেশ্বর ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান মত্তাছির মিয়ার ভাই মোশাহিদ মিয়ার লাশ। এ ঘটনাতেও জড়িত থাকার অভিযোগ উঠে আব্দুল আলীর বিরুদ্ধে। অবশ্য দুটি খুনের ঘটনাতেই আপোষ রফার মাধ্যমে বেঁচে যান আব্দুল আলী বাগালসহ সুন্দ্রাটিকির বাসিন্দারা। এ দুটো মামলা থেকে বেঁচে গেলেও জেলের গেট দিয়ে ঠিকই তাকে মাথা নিচু করে ঢুকতে হয়েছিলো। প্রায় ২২ বছর আগে ফয়জাবাদ হিলসে শ্রীমঙ্গলের বাসিন্দা জনৈক শিপার মিয়ার একটি ফল বাগান জোর করে দখল করতে চেয়েছিলেন। এ ঘটনাতেও তাকে কিছুদিন হাজতবাস করতে হয়েছে।
আব্দুল আলী বাগালের প্রথম স্ত্রী হালিমা বেগম বাগান দখলের ঘটনায় তার স্বামীর কিছুদিন কারাবাসের কথা স্বীকার করলেও ঘটনাটিকে সাজানো বলে দাবি করেন। হালিমা বেগমের ভাষ্য, তার স্বামী আপাদমস্তক ভাল মানুষ। ‘হক কথা’ বলেন, তাই তাকে অনেকে পছন্দ করেন না।
আব্দুল আলীর সাত ছেলেমেয়ে। প্রথম স্ত্রী হালেমা বেগমের ঘরেই সব সন্তানের জন্ম। দ্বিতীয় স্ত্রী হাজেরা বেগম নিঃসন্তান। সন্তানদের মধ্যে ৫ জনই ছেলে। এরা হচ্ছেন বিলাল মিয়া, জয়নাল মিয়া, ফেরদৌস মিয়া, জুয়েল মিয়া ও রুবেল মিয়া। দুই মেয়ে খেলা বানু ও নাসিমা বেগম।
কম যান না আব্দুল আলী বাগালের ছেলেরাও। গত দূর্গাপুজায় প্রতিমা বিসর্জনের আগের দিন আব্দুল আলী বাগালের এক ছেলে কিছু সঙ্গী নিয়ে রশিদপুর চা বাগানের পূজানুষ্ঠানে যান। সেখানে তাদের হাতে যৌন হয়রানির শিকার হন এক নারী চা শ্রমিক। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিসর্জনের পরদিন সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ভাংচুর চালানো হয় চা শ্রমিকদের বাড়িঘরে।
৩১ অক্টোবর স্কুলের ছাত্রীদের যৌন হয়রানির ঘটনাকে কেন্দ্র করে ফয়জাবাদ হাইস্কুলে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার নেতৃত্বে ছিল আব্দুল আলী বাগালের ছেলে ও স্কুলের ছাত্র রুবেল মিয়া। চার শিশু হত্যার দায় স্বীকার করে এই রুবেল এখন কারাগারে। গ্রামবাসীর অভিযোগ, রুবেল ও তার বন্ধুরা মিলে প্রায়ই ছাত্রীদের উত্ত্যক্ত করতো। এমন অভিযোগে স্কুল কর্তৃপক্ষ তাদের শাসন করলে রুবেল ও তার সঙ্গীরা স্কুলে হামলা-ভাংচুরের ঘটনা ঘটায়।
তবে আব্দুল আলীর উত্থান ও চার খুনের ঘটনার পেছনে রয়েছে তার পঞ্চায়েত প্রধান হওয়ার চেষ্টা এবং প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করার খায়েশের বিষয়টি।
গ্রামবাসী জানায়, প্রায় ৪ হাজার জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত সুন্দ্রাটিকি গ্রামে গোষ্ঠীভিত্তিক পঞ্চায়েত প্রথা এখনও প্রচলিত। এই গ্রামে ৮টি গোষ্ঠীর প্রত্যেকটির রয়েছে পৃথক পঞ্চায়েত। এগুলোর মধ্যে একটি গোষ্ঠীর পঞ্চায়েত প্রধান হচ্ছেন আব্দুল আলী। তবে অভিযোগ রয়েছে, এই পদটি তিনি কৌশলে বাগিয়ে নেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গ্রামের কয়েকজন ব্যক্তি আরও জানান, এক সময় আব্দুল আলী ছিলেন গ্রাম পঞ্চায়েত আবদুর রউফের সহযোগী। আবদুর রউফ মারা গেলে গ্রামের রীতি অনুযায়ী পঞ্চায়েতের প্রধান হন তার ছেলে আব্দুল মঈন সুমন। কিন্তু চতুর, বাকপটু এবং কৌশলী আব্দুল আলী বাগাল কৌশলে সুমনকে সরিয়ে এ দায়িত্ব দখল করে নেন। এ নিয়ে এখনও ঐ পঞ্চায়েতের মধ্যে দ্বন্দ্ব রয়ে গেছে।
অন্য পঞ্চায়েতগুলোর নেতৃস্থানীয়রা হলেন, সুন্দ্রাটিকি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক আব্দুল খালেক তালুকদার, মধু মিয়া, নূর আলী ওরফে নূরাই মিয়া, আব্দুল মঈন সুমন, ফরিদ মিয়া, সেলিম আহমেদ, টেনু মিয়া, আব্দুল হাই, উস্তার মিয়া, আকল মিয়া।
এদিকে, নিজের পঞ্চায়েতে দ্বন্দ্বের মধ্যেই অন্য পঞ্চায়েতগুলোর প্রধানদের সঙ্গেও আব্দুল আলীর মতবিরোধ ছিল প্রকাশ্যে। গ্রামবাসীরা জানান, নানা বিষয়ে সুন্দ্রাটিকি গ্রাম পঞ্চায়েতের মুরুব্বিরা ঐকমত্যে পৌঁছলেও আব্দুল আলী বাগাল বেশিরভাগ সময়েই ভিন্ন মত প্রকাশ করতেন। এ কারণে গ্রামের বিভিন্ন বিষয়ের বিরোধ নিষ্পত্তি হতে অনেক সময় লাগতো।
তবে সম্প্রতি সুন্দ্রাটিকি গ্রাম পঞ্চায়েতের হেফাজতে থাকা কয়েক একর সরকারি পতিত জমি বিক্রির ক্ষেত্রে আলীসহ সব পঞ্চায়েত প্রধানরা ঐকমত্যে পৌঁছান। এসব জমি গোচারণ ভূমি, খেলার মাঠ ও কবরস্থান হিসেবে যুগ যুগ ধরে ব্যবহার হয়ে আসছিল। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এসব জমি তারা সরকারের নিয়ম মেনে লিজ নিয়েছেন। এসব লিজের জায়গা থেকে প্রায় ৬০ শতাংশ জমি গ্রামের সকলে মিলে ১৩ লাখ টাকার কিছু বেশি দামে একটি পক্ষের কাছে বিক্রি করেন। আর সে টাকা দিয়ে গত বছরের শেষের দিকে স্থানীয় খেলার মাঠে শিরনির আয়োজন করা হয়। ৯টি গরু ও ১০টি খাসি জবাই করে করা ওই শিরনিতে সুন্দ্রাটিকি গ্রামবাসী ছাড়াও আশপাশের বেশ কয়েক গ্রামের লোকজন ভুড়িভোজ করেন। এতে প্রায় ৪ হাজার লোককে আপ্যায়ন করা হয়েছিল বলে গ্রামবাসীর দাবি। আয়োজনটা বড় হলেও এই শিরনির হিসাব নিয়ে আরেক পঞ্চায়েত প্রধান সুন্দ্রাটিকি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক আব্দুল খালেক তালুকদারের সঙ্গে বিরোধ তৈরি হয় আব্দুল আলীর। সবগুলো পঞ্চায়েতের সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার ক্ষেত্রেও এ দু’জন প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়ায় শিরনির হিসাব নিয়ে তাদের বিরোধ গ্রামের গোষ্ঠীগুলোর মধ্যেও প্রভাব ফেলে। বিষয়টি নিয়ে তখন উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টিও হয়েছিল আ.খালেক ও আ. আলীর নেতৃত্বধীন গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে। চার শিশুকে হত্যার পেছনেও এই ঘটনা প্রভাব ফেলে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে।
১২ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার উপজেলার সুন্দ্রাটিকি গ্রামের মো. ওয়াহিদ মিয়ার ছেলে জাকারিয়া আহমেদ শুভ (৮), তার চাচাত ভাই আব্দুল আজিজ-এর ছেলে তাজেল মিয়া (১০) ও আবদাল মিয়ার ছেলে মনির মিয়া (৭) এবং তাদের প্রতিবেশী আব্দুল কাদির-এর ছেলে ইসমাঈল হোসেন (১০) নিখোঁজ হয়। ১৭ ফেব্রুয়ারি বুধবার একটি বিলের ধারে তাদের মরদেহ পাওয়া যায়। এ ঘটনায় এলাকাবাসী ও নিহতের স্বজনরা প্রথমে মুখ না খুললেও পরে আব্দুল আলীর এক ছেলেকে গ্রেফতার করা হয়। এ সময় বেরিয়ে আসে পঞ্চায়েত প্রধান আব্দুল আলীর সংশ্লিষ্টতারও নানা তথ্য।
নিহতের স্বজনরা জানিয়েছেন, ভিন্ন পঞ্চায়েতের লোক হয়েও তাদের বিষয়ে নাক গলানোর কারণে আব্দুল খালেকের সঙ্গে তাদের পূর্ব বিরোধ ছিলো। তারা মূলত আব্দুল খালেক মাস্টারের পঞ্চায়েতের লোক ও আত্মীয় হওয়ায় আব্দুল আলী তাদের বিষয়ে অকারণে খবরদারি করতো, এটা তাদের সহ্য হতো না। আর তাদের কাছে সম্মান না পাওয়ায় প্রতিবেশীদের মাধ্যমে তাদের হেনস্থা করার চেষ্টা চালাতেন পঞ্চায়েত প্রধান আব্দুল আলী।
নিহতের স্বজনরা আরও জানান, শিশুগুলো নিহত হওয়ার কয়েকদিন আগে বাড়ির সীমানায় থাকা একটি বড়ই গাছের ডাল কাটা ও ফল পাড়া নিয়ে প্রতিবেশীদের সঙ্গে ঝগড়া বাঁধে। এসময় আব্দুল আলী সেখানে বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য এগিয়ে এলে তার বিচার না মানার ঘোষণা দেন ওয়াহেদ মিয়া ও তার স্বজনরা। এতে প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হন আলী।
পরে এ নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে ১৭ ফেব্রুয়ারি বুধবার স্থানীয় ও স্বজনদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে আব্দুল আলীকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
চার ছাত্র হত্যা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের ওসি মোক্তাদির আলম জানান, আব্দুল আলীর বিরুদ্ধে ৪টি মামলা রয়েছে।
বাহুবল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোশারফ হোসেন জানান, আব্দুল আলীর বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। তবে সেগুলো পুলিশ যাচাই বাছাই করছে।
/টিএন/








