দুই দশক আগেও উপমহাদেশে বাবার ইমেজ ছিল ‘রাগী’, ‘দূরত্বের’ আর ‘কর্তার’। সন্তান ছোট থেকে মায়ের কাছে থাকার কারণে সব আদর-আহ্লাদের আর আবদারের জায়গা ছিল মা। বাবাকে কিছু বলতে গেলেই ভয়ে কুঁকড়ে যেত সন্তান। কোনও চাহিদা বাবার কাছে পৌঁছানোর বেলাতেও মায়েরা সাবধান করে দিতেন, বলতেন ‘এখন না, পরে কখনও’।
এরপর মায়েরা ঘরে থেকে বেরিয়ে চাকরি করতে শুরু করেন। ফলে সন্তানের কাছে বাবা-মায়ের থাকার সময়ও প্রায় সমান হতে শুরু করে। বাবাদের আলাদা করে তৈরি করে রাখা ভয়ের দেয়াল ভেঙে যেতে থাকে। চাকরি করা স্ত্রীদের একটু সহায়তা করার মানসিকতা থেকে স্ত্রী যখন রান্নাঘরে ঢোকেন তখন সন্তানের সঙ্গে খেলাধুলা আর পড়ানোর কাজটা বাবাই করেন। সমাজ বিজ্ঞানীরা বলছেন, এভাবেই বদলে যেতে থাকে বাবার ইমেজ।
বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করেন মোশাররফ হোসেন। বাবা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমি কখনও মনে করতে পারি না যে বাবার শরীরের স্পর্শ পেয়েছি। বাবাকে ভয় পেতাম। এমনকি স্কুলের রেজাল্টে বাবার সই এনে দিতেন মা। আমাদের ভাইবোনদের জগৎ ছিল মাকে ঘিরেই। সরকারি চাকরিজীবী বাবা নানা জেলায় জেলায় চাকরির জন্য যেতেন। ফিরতেন কয়েক মাস পর। তখন তিনি আরও অপরিচিত।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি যখন সংসার শুরু করি তখন আমার স্ত্রীও চাকরি করেন। সন্তানের জন্য দুজনের সময় ভাগাভাগি করে নিই। এর মধ্যে কখন যে সন্তান আমার বন্ধু হয়ে গেছে তা খেয়াল করিনি। এটা আসলে সময়ের দাবি।’
বিশ শতকের গোড়ার দিকে বাবা দিবস পালন শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্রে। বিশ্বে একেকটি দেশ একেক দিন বাবা দিবস পালন হয়। তবে বাংলাদেশসহ এশিয়া ও ইউরোপের অধিকাংশ দেশ জুন মাসের তৃতীয় রবিবার পালন করে দিবসটি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক মাহবুবা নাসরিন বলেন, ‘বাবা সন্তানের উপর নির্ভরশীলতার সম্পর্ক ছিলে। এখন যেহেতু সে সম্পর্ক মায়ের সঙ্গেও হয়, সেহেতু বাবা-সন্তানের সম্পর্ক এখন বন্ধুত্বের রূপ নিয়েছে।’
ছেলে সন্তানের জন্য বাবা বন্ধু হওয়া কতটা জরুরি তা উল্লেখ করতে গিয়ে মনোচিকিৎসক মোহাম্মদ আসিফ বলেন, ‘ছেলে যখন বড় হয় তখন দুনিয়াটা চেনানোর চোখ তৈরিতে অভিভাবকের গুরুত্ব অপরিসীম। আর বাবা যেহেতু ছেলেদের ঘোরাফেরার পরিসরটা চেনেন ফলে ভালো-মন্দ তিনি জানেন অন্য অনেকের চেয়ে বেশি। এই বাবা যখন বন্ধুর বেশে সন্তানের সঙ্গে মেশেন তখন সে সন্তানের বিপদগামী হওয়ার সুযোগ কম।’
এখনকার সমাজের এই বদলে যাওয়া পরিবেশের কারণে ছোটবেলায় যে বাবার সঙ্গে ছিল বিস্তর দূরত্ব সেটি কাটিয়ে উঠেছে সন্তানরা। এ প্রসঙ্গে নারী উদ্যোক্তা রেজওয়ানা বলেন, ‘কোনও দিন ভাবিনি আমার কোনও সমস্যা নিয়ে প্রথম হাজির হবো বাবার কাছে। তেমন সম্পর্কই ছিল না। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা বদলে গেছে। এখন বাবা অবসরে গেছেন। ফেসবুকে থাকেন বেশিরভাগ সময়। আমার ছবিতে, স্ট্যাটাসে দিব্যি বন্ধুর মতো কমেন্ট করেন। এই ছোট ছোট বদলগুলো আসলে সমাজকে বদলে দেয়।’
বাবাদের বদলে যাওয়া এ ইমেজ ভালো না খারাপ- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কে চায় বাবাকে ভয় পেতে।’
/এসটি/








