রাজধানীর পান্থপথে বসুন্ধরা সিটি শপিং মলে গত সাত বছরে ভয়াবহ তিনটি আগুনের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় প্রাণহানিসহ কয়েক শ’ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। বসুন্ধরা সিটির অগ্নিকাণ্ডের সময় নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা নিয়ে ব্যবসায়ী ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তাদের মনে প্রশ্ন উঠেছে। রবিবারের আগুনের ঘটনায় দুজন আহত হলেও অগ্নিকাণ্ড ছিল ভয়াবহ। আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের ২৯টি টিম কাজ করেছে। আগুন নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার ত্রুটি সম্পর্কে ফায়ার সার্ভিসের সাবেক উপপরিচালক সেলিম নেওয়াজ ভুঁইয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বসুন্ধরা সিটির আগুন নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা আধুনিক হলেও ভেন্টিলেটিং সিস্টেম না থাকায় তা ঠিক মতো কাজে আসছে না।’ এদিকে রবিবারের আগুনের সময় বসুন্ধরা সিটি এলাকায় হাজির হয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র বসুন্ধরা সিটিতে বারবার আগুন লাগার ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তবে বসুন্ধরা কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, আগুন নিয়ন্ত্রণে আধুনিক সব ধরনের ব্যবস্থা তাদের রয়েছে তবে অতিরিক্ত ধোঁয়ার কারণে সবচেষ্টা করার পরও রবিবারের আগুন শেষ পর্যন্ত তারা নিজেরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি।
বসুন্ধরার শপিং কমপ্লেক্সে পাশাপাশি দুটি ভবন রয়েছে। এগুলো হলো পান্থপথ সড়কমুখী আটতলা ভবন এবং পেছনের ১৯ তলা ভবন। দুটি ভবনেই অতীতে ভয়াবহ তিনটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এরমধ্যে ২০০৯ সালের ১৩ মার্চ ভয়াবহ আগুনে সাত জনের মৃত্যু হয়, আহত হন শতাধিক। সেই অগ্নিকাণ্ডের পর শপিং মলটি অন্তত একমাস বন্ধ ছিল। এরপর ওই বছরেরই আগস্টে আরও একটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ছয় বছর পর ২০১৫ সালের ৩ সেপ্টেম্বর বসুন্ধরা সিটিতে ফের অগ্নিকাণ্ড ঘটে। ঠিক একবছর পর ২১ আগস্ট সকাল ১১ টায় ফের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলো।
২০০৯ সালের ১৩ মার্চের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় সাতজনের মৃত্যুর পর ফায়ার সার্ভিস তদন্ত করে। তখন বসুন্ধরার অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থায় বেশকিছু ত্রুটি ধরা পড়েছিল। তা ঠিক করার জন্য পরামর্শও দিয়েছিল ফায়ার সার্ভিস। সেসব পরামর্শ মানা হয়েছিল কিনা? এমন প্রশ্নের জবাবে বসুন্ধরা সিটির ইনচার্জ টিআইএম লতিফুল হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, আমি চারবছর ধরে এখানে কাজ করছি। ফায়ার সার্ভিব যেসব বিষয় পরামর্শ দিয়েছে, তা মানা হয়েছে। আমাদের আধুনিক অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা রয়েছে। আমরা আগুন ছয়তলায় সি-ব্লকেই রেখেছি। বাড়তে দেইনি। আমাদের অন্তত ৬০ জন ফায়ার ফাইটার কাজ করছে।
বসুন্ধরার শপিং মলে অাগুন নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় কোনও ত্রুটি ছিল কিনা? এমন প্রশ্নের জবাবে ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন) মেজর শাকিল নেওয়াজ রবিবার সন্ধ্যা সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘আমরা তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। আগুনের উৎসসহ ত্রুটি থাকলে তদন্ত কমিটি তা খুঁজে বের করবে।’ তিনি বলেন, ‘রবিবার সকালে লাগা আগুন নিয়ন্ত্রণে ২৯টি ইউনিটের দেড়শ কর্মী কাজ করছেন। রাত ৮ টা ৫০ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। মার্কেটের ভেতর প্লাস্টিকের পিভিসি পাইপ থাকায় আগুন বেড়েছিল। আমরা দোকানের সার্টার কেটে আগুনে পানি দিয়েছে। আগুন এখন নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। বর্তমানে ডাম্পিংয়ের কাজ চলছে। আজ সারারাত থেকে শুরু করে আগামীকালও কাজ করতে হতে পারে।’ তিনি আরও বলেন, 'ছাদে যারা আটকে পড়েছিলেন, তাদের মধ্যে তিনজন নারীসহ অন্তত ১৯ জনকে আমরা উদ্ধার করেছি।’
ক্ষয়ক্ষতি বিষয়ে শাকিল নেওয়াজ বলেন, সি-ব্লকে অন্তত একশ দোকান রয়েছে। কোনওটি আংশিক, কোনওটি পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’
ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, রবিবার বেলা ১১টা ২৩ মিনিটে মার্কেটের লেভেল-৬-এর সি-ব্লকে 'এমএস সুজ' অথবা ‘খন্দকার সুজ’ নামের দুটি জুতার দোকান থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। দুটি দোকান পাশাপাশি। দোকান দুটি বন্ধ ছিল। আগুন লাগার পর থেকেই ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা আগুন নেভানোর কাজ করেছে। তবে অগ্নিকাণ্ডের পরপর ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যায় শপিং মল এবং আশেপাশের এলাকায় এতে কাজ করতে সমস্যা হয়েছিল।’
বসুন্ধরা সিটির জ্যেষ্ঠ মহাব্যবস্থাপক মোস্তফা রায়হেল ইমাম জানান, ষষ্ঠ তলার একটি লেদার সুজ-এর দোকানে অগ্নিকাণ্ডের সূচনা ঘটে। ভবনের সি-ব্লক থেকে আমরা কর্ডন করে রেখেছি, আগুন ছড়াতে পারেনি।
বসুন্ধরা সিটির হেড অব মার্কেটিং জসিমউদ্দীন বলেছেন, ছয় তলার সি ব্লকের ৭ থেকে ৮টি দোকান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আগুন ৬ তলা থেকে ছড়িয়ে পড়তে দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, ‘আমাদের নিজস্ব ৬০ জন ফায়ার ফাইটার এবং ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ছাড়া বর্তমানে মার্কেটের ভেতরে আর কেউ নেই। আমারা আজই মার্কেট পরিষ্কার করে ফেলব। আশা করছি আগামীকাল বা পরশুর মধ্যে মার্কেট খুলে দেওয়া সম্ভব হবে।’
মার্কেটের নিজস্ব অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা আছে কিনা—সাংবাদিকদের এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আগের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর বিশেষজ্ঞরা যেসব পদক্ষেপ নিতে বলেছিলেন আমরা সেগুলো নিয়েছিলাম। আজকে আপনারা দেখেছেন যে, আমাদের নিজস্ব ফায়ার ফাইটারাই আগুন নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলেন। আর ছোটখাটো অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা তো দেশের সব মার্কেটেই ঘটে।’
আগুন লাগার কারণ সম্পর্কে বসুন্ধরা সিটির দোকান মালিক সমিতির সভাপতি এমএ হান্নান আজাদ বলেন, ‘এটা নাশকতার আগুন কিনা, সে আশঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছি না। যেহেতু বসুন্ধরা ও যমুনার শপিং মলে নাশকতার হুমকি দেওয়া হয়েছিল তাই বিষয়টি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে আগেও নাশকতার বিষয়ে আমাদের সতর্ক করা হয়েছিলো। এই আগুন সেই নাশকতার অংশ কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’
শপিং মলের ৫ম তলায় জুয়েলারির দোকান। ৬ষ্ঠ তলায় মোবাইল, জুতা, ব্যাগ, ইলেক্ট্রিক পণ্যের দোকান। ৭ম তলায় কয়েকটি ব্র্যান্ডের পোশাকের ও জুতার দোকান রয়েছে। ৮ম তলায় ফুড কোর্ট ও সিনেপ্লেক্স অবস্থিত। আর নবম তলায় জেনারেটরের সরঞ্জাম। শপিং মলের বেজমেন্টে একটি সুপার শপ রয়েছে।
এরই মধ্যে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আনিসুল হক। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, ‘বারবার কেন বসুন্ধরায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে? বিষয়টি নিয়ে আমরা পরবর্তী সময়ে বসুন্ধরা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলব।’
ঘটনাস্থল পরিদর্শনকালে ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক বি. জে. আহম্মদ আলী খান বলেন, ‘ছয়তলার সিলিংয়ে আগুন লেগেছে। প্রথমে পানির সংকট ছিল, পরবর্তী সময়ে ওয়াসার সঙ্গে কথা হয়েছে। এখন আর পানির সমস্যা নেই।’
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার শেখ মারুফ হাসান বলেন, ‘আমরা এখানে ফায়ার সার্ভিসকে কাজ করার উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করে দিচ্ছি। কোনও হতাহতের খবর আমরা পাইনি।’
এর আগে বসুন্ধরায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাগুলোর সময় উপস্থিত ছিলেন ফায়ার সার্ভিসের সাবেক উপপরিচালক সেলিম নেওয়াজ ভুঁইয়ার। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আগুন নিজে হাটে না। আমরা আগুনকে হাটাই। আগুনের হিট ছড়িয়ে পড়ে। এরপর ধার্য পদার্থ থাকলে তা আগুন ধরে যায়। বসুন্ধরার মূল সমস্যা হলো মলটিতে ভেন্টিলেটর নেই। তাদের উচিত দ্রুত ভেন্টিলেটর পদ্ধতি করা।’
তিনি বলেন, ‘আগুন লাগতে পারে। রাজধানীর অনেক শপিং মলেই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা এর আগে ঘটেছে। তবে তা ছড়িয়ে পড়ে না। বসুন্ধরারটি ছড়িয়ে পড়ে দ্রুত। এ জন্য অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার মধ্যে ভেন্টিলেটরও থাকা জরুরি।’
আরও পড়তে পারেন: বসুন্ধরায় আগুনের ঘটনা তদন্তে ৫ সদস্যের কমিটি গঠন
/এআরআর/এমএনএইচ/








