রাজধানীর চাঁদনী চক শপিং মলের একটি রেস্তোরাঁয় হকার খোকন মোল্লা (২৮) খুনের নেপথ্যে ছিল সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্ব। এছাড়াও ফুটপাতে জায়গা দখল ও ইয়াবা ব্যবসা নিয়েও বিরোধ ছিল হকারদের মধ্যে। নিউমার্কেট থানা পুলিশ,ওই এলাকার হকার এবং নিহত খোকন মোল্লার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে।
গত ২২ ফেব্রুয়ারি দুপুরের পর চাঁদনী চক মার্কেটের সিজান রেস্তোরাঁয় খোকন মোল্লা ও বাবুল ব্যাপারীকে ছুরিকাঘাত করে সাহাবুদ্দিন, হানিফসহ আরও কয়েকজন। পরে স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক খোকনকে মৃত ঘোষণা করেন। বাবুল ঢামেক হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। তারও বুকে ও পিঠে গুরুতর জখম ছিল।
আহত বাবুল বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, তারা নিউমার্কেট থানা যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তাদের সঙ্গে হকার সাহাবুদ্দিন ও খোকনের ব্যক্তিগত কোনও দ্বন্দ্ব নেই। তবে মার্কেটের ভেতরে ইয়াবা সেবন নিয়ে তাদের বাধা দেওয়ার কারণে এই খুন হতে পারে।
ঘটনার দিন রাতেই নিহত খোকন মোল্লার স্ত্রী মিনারা বেগম বাদী হয়ে শাহাবুদ্দিন, সোহেল, রিপন, হানিফসহ পাঁচজনের নাম উল্লেখ করে ও আরও পাঁচ অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করে নিউমার্কেট থানায় একটি হত্যা মামলা করেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নিউমার্কেট থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মহিউদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে মূলত সিনিয়র-জুনিয়রের দ্বন্দ্বের কারণে। হামলাকারী সাহাবুদ্দিন-হানিফ গ্রুপটি বাবুল-খোকন মোল্লা গ্রুপের চেয়ে সিনিয়র। এ নিয়ে তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব ছিল। হত্যাকাণ্ডের দুদিন আগে হানিফকে খোকন মোল্লা মারধর করেছিল। এতে সাহাবুদ্দিনের গ্রুপ ক্ষুব্ধ হয়। কারণ হানিফ খোকনের চেয়ে সিনিয়র। এটা নিয়ে কয়েকবার সালিশ বৈঠকও হয়েছে, কিন্তু কোনও সমাধান হয়নি। এরপরই এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।’
তিনি বলেন, ‘মামলার চার আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। প্রধান আসামি সাহাবুদ্দিনকে গ্রেফতার করা যায়নি। গ্রেফতার চার জনের মধ্যে তিন জন আদালতে ও আমার কাছে যথাক্রমে ১৬৪ ও ১৬১ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে। তাদের স্বীকারোক্তিতে হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি স্পষ্ট।’
নিহত খোকনের বাবার নাম কালু মোল্লা। তাদের গ্রামের বাড়ি ফরিদপুরের সালতার ফুলবাড়িয়া গ্রামে। খোকন স্ত্রী ও তিন মেয়েকে নিয়ে কামরাঙ্গির চরের চর-খলিফাঘাটে থাকতেন। বড় মেয়ে ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী। চাঁদনী চক মার্কেটের গেটের সামনের ফুটপাতে ও নিউমার্কেট ওভার ব্রিজের ওপরে কসমেটিক্সসহ বিভিন্ন গৃহস্থালী সামগ্রীর দোকান আছে খোকন মোল্লার। কর্মচারীরা দোকান পরিচালনা করে। তিনি নিউমার্কেট যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
নিহত খোকনের স্ত্রী ও মামলার বাদী মিনারা বেগম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মার্কেটের কোনও ঝামেলার কথা কখনও বাসায় বলতো না। তবে আমি শুনেছি তিনি (খোকন) রাজনীতি করতেন। মিছিল মিটিংয়ে যেতেন। ঘটনার দুদিন আগে সাহাবুদ্দিনের সঙ্গে তার ঝামেলা হয়েছিল। শুধু এই কারণে খুন করবে এমনটা আমাদের বিশ্বাস হয় না। হয়তো আরও কোনও কারণ থাকতে পারে।’
নিউমার্কেট ও চাঁদনী চক মার্কেটের সামনের হকারদের অনেকেরই পরিচিত ছিলেন নিহত খোকন মোল্লা । গত আট বছর ধরে তিনি নিউমার্কেট এলাকায় ব্যবসা করেন। তবে এই হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে এখানকার হকাররা কেউ মন্তব্য করতে চাননি।
চাঁদনী চকের সামনে হ্যান্ডব্যাগ বিক্রেতা রাশেদুল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘যারা মারামারি করছে তারা রাজনীতি করে। আমি হেঁটে হেঁটে ব্যাগ বিক্রি করি। এ বিষয়ে কিছুই জানি না।’
এদিকে আহত বাবুলের ভাই লোকমান মোল্লা জানান, চাঁদনী চক মার্কেটের ছাদে মাদক সেবন নিয়ে ঝামেলা চলছিল। ছাদে সাহাবুদ্দিন, হানিফ ও সোহেল অনেকেই ইয়াবা সেবন করে। এতে বাবুল ব্যাপারী ও খোকন মোল্লা বাধা দিয়েছিল। সাহাবুদ্দিন অনেক দিন ধরে এই মার্কেটে ব্যবসা করে। খোকন তার চেয়ে বয়সে ছোট এবং ব্যবসা করে ভালো পজিশনে যাচ্ছে, এতে তারা ক্ষুব্ধ ছিল।’
নিহত খোকন মোল্লার বোন শাহিনুর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সামনে মার্কেটে একটা নির্বাচন ছিল। সেই নির্বাচনে আমরা ভাই একটি পদে নির্বাচনও করতো। যারা হত্যা করছে তারা সবাই মাদকসেবী। এদের বিচার হওয়া দরকার।’
চাঁদনীচক মার্কেট বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খলিলুর রহমান এই হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে কোনও মন্তব্য করতে চাননি। তিনি জানান, যারা ফুটপাতে ব্যবসা করেন, তারা সমিতির কেউ না। তাদের সঙ্গে সমিতির কোনও সম্পর্ক নাই। বিষয়টি পুলিশ যাচাই-বাছাই করে দেখবে।
উল্লেখ্য, গতবছর ও চলতি বছরের প্রথমদিকে রাজধানীর মিরপুর, বাড্ডা ও উত্তরায় পৃথক পৃথক ঘটনায় সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্বের কারণে কয়েকটি হত্যাকাণ্ড ঘটে। সম্প্রতি উত্তরায় কিশোর আদনান কবিরের হত্যার ঘটনাটিও ছিল সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্বের পরিনাম।
/এআরআর/ এপিএইচ/
আরও পড়ুন:








