বিভাগীয় সাজা ভোগ করার কারণে গাইবান্ধার সাঁওতাল পল্লীতে আগুন দেওয়ার ঘটনায় শনাক্ত দুই পুলিশ এখনই ফৌজদারি আইনের আওতায় আসবেন না বলে জানিয়েছেন গাইবান্ধার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এ সার্কেল) মো. রবিউল ইসলাম। তবে আইনজীবীরা বলছেন, মুখ্য হাকিম ও ডিএজির পৃথক দু’টি তদন্ত প্রতিবেদনেই আগুন লাগানোয় পুলিশের নাম আসায় ফৌজদারি আইনে ব্যবস্থা না নেওয়ার কোনও কারণ নেই। সাঁওতাল নেতারা বলছেন, অভিযুক্ত পুলিশদের আইনের আওতায় না এনে এক স্টেশন থেকে প্রত্যাহার করে আরেক স্টেশনে বদলি করে রিজার্ভ রাখা আদৌ কোনও সাজা হতে পারে না। আর মূল হোতারা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৯ মার্চ) রংপুর রেঞ্জের ডিআইজির হাইকোর্টে জমা দেওয়া প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গাইবান্ধা পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) উপপরিদর্শক (এসআই) মাহবুবুর রহমান ও গাইবান্ধা পুলিশ লাইনসের কনস্টেবল মো. সাজ্জাদ হোসেন আগুন দেওয়ার ঘটনায় জড়িত ছিলেন। ঘটনার পর তাদের সাময়িক বহিষ্কার করা হয়। বর্তমানে এসআই মাহবুবুর দিনাজপুর জেলা পুলিশ লাইনস (রিজার্ভ ফোর্স) ও কনস্টেবল সাজ্জাদ পঞ্চগড় জেলা পুলিশ লাইনসে (রিজার্ভ ফোর্স) কর্মরত রয়েছেন।
সাঁওতাল নেতারা বলছেন, আগুন লাগানোর ঘটনায় পুলিশের জড়িত থাকার কথা বললেও কেউ তা শুনতে চায়নি। আমরা মামলা করতে গেলেও পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা নেওয়া হয়নি।
তদন্ত প্রতিবেদনে দু’জন পুলিশের চিহ্নিত হওয়ার বিষয়ে সাঁওতাল নেতা রবীন্দ্রনাথ সরেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এখন দু’জন পুলিশের ওপর দায় দিয়ে বাকিদের চেনা যায়নি বলে মুক্ত করে দেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে মূল হোতাদের বাঁচানো হলো। পুলিশ তো হুকুমের আসামি। এলাকার ইউএনও, এমপি, ওসি— এদের বাদ দিয়ে যারা হুকুম তামিল করেছে, তাদের দু’জনের ওপর দায় চাপিয়ে এ ঘটনার নিষ্পত্তি করার চেষ্টা করলে তা মেনে নেওয়া হবে না।’
উল্লেখ্য, রংপুর চিনিকলের সাহেবগঞ্জ ইক্ষু খামারের ১ হাজার ৮৪২ একর জমির মালিকানা নিয়ে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সঙ্গে চিনিকল কর্তৃপক্ষের দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছিল। গত ৬ নভেম্বর চিনিকল কর্তৃপক্ষ জমি উদ্ধার করতে গেলে সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষের সময় সাঁওতালদের বাড়িঘরে লুটপাট হয়। সংঘর্ষের এক পর্যায়ে পুলিশ গুলি চালায়। ওই ঘটনায় নিহত হন তিন সাঁওতাল, আহত হন অনেকে।
ঘটনার প্রায় এক মাস পর সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে আসা একটি ভিডিও’র ভিত্তিতে সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। ওই ভিডিওতে দেখা যায়, সাঁওতাল পল্লীর ভেতরে পুলিশ সদস্যরা গুলি ছুঁড়ছেন। কয়েকজন পুলিশ সদস্য একটি ঘরে লাথি মারছেন এবং পরে এক পুলিশ সদস্য ওই ঘরে আগুন জ্বালিয়ে দেন। পুলিশের সঙ্গে সাধারণ পোশাকে থাকা আরেকজন অন্য ঘরে আগুন ছড়িয়ে দিতেও সহায়তা করেন।
গাইবান্ধার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এ সার্কেল) মো. রবিউল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘হাইকোর্টের নির্দেশে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি উচ্চ আদালতে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার আগেই ওই দু’জনকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে। পরে মাহবুবুরকে দিনাজপুরে ও সাজ্জাদকে পঞ্চগড় পুলিশ লাইনসে (রিজার্ভ ফোর্স) বদলি করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে আগেই বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। একটা সাজার মধ্যেই তারা আছেন। ফলে এখন আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
ওই ঘটনায় দুই সাঁওতাল নারীর দায়ের করা মামলার আইনজীবী ব্যরিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আজকের প্রতিবেদন থেকে এটি নিশ্চিত করে বলার সময় এসেছে যে পুরো ঘটনার সঙ্গে রাষ্ট্র জড়িত। পুলিশ নিজের বুদ্ধি বা সাহস থেকে আগুন লাগাবে না। তাহলে এই ঘটনার মূল হোতা এবং এই পুলিশদের বিরুদ্ধে কেন ফৌজদারি আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, সে প্রশ্ন তুলতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘শুরুতেই আমরা পুলিশি তদন্তের বাইরে বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করেছিলাম। আমাদের আশঙ্কা ছিল যে পুলিশি তদন্তে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে না। সেই শঙ্কা সত্য হলো যখন কিনা দু’জন পুলিশকে চিহ্নিত করে বাকিদের চেনা যায়নি বলে উল্লেখ করা হচ্ছে।’ তারপরও চিহ্নিত দুই পুলিশের বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইনে ব্যবস্থা নিতে বাধা থাকার কোনও কারণ নেই বলে উল্লেখ করেন তিনি।
এদিকে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোতাহার হোসেন সাজু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এরই মধ্যে তাদের সাময়িক বহিষ্কার করে বিভাগীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অপরাধ প্রমাণিত হলে তাদের বিরুদ্ধে আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে এখনই ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নেই। তাদের অপরাধ প্রমাণিত হলে চূড়ান্ত বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত হবে। তারপরও আদালত নির্দেশে ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে কিছু বলা থাকলে তা নেওয়া যেতে পারে।’
আরও পড়ুন-
পুলিশের আগুনে পুড়ল সাঁওতাল বসতি, তদন্ত রিপোর্টে কেন নেই? (ভিডিও)
সাঁওতাল পল্লীতে আগুন: জড়িত ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা
/টিআর/








