‘শিশুটি এখন আগের চেয়ে ভালো আছে, তাকে স্যালাইনের পাশাপাশি এনআইসিইউতে থাকা অন্য মায়েদের বুকের দুধ খাওয়ানো হচ্ছে চামচে করে। তার জন্ডিস এবং শ্বাসকষ্ট আগের চেয়ে অনেক কমেছে। আমরা তাকে সুস্থ করতে তুলতে সাধ্যমতো চেষ্টা করছি।’ কথাগুলো বলছিলেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নিওনেটোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মনীষা ব্যানার্জী।
প্রসঙ্গত, গত ১১ মার্চ মিরপুরের নবাবেরবাগ বেড়িবাঁধ এলাকায় ডাস্টবিন থেকে পলিথিনে মোড়ানো শিশুটিকে উদ্ধার করে শাহআলী থানা পুলিশ। পরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে শিশুটিকে নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (এনআইসিইউ) রাখা হয়। এখনও সেখানেই তার চিকিৎসা চলছে।
শিশুটির দিকে বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে জানিয়ে বাংলা ট্রিবিউনকে ডা. মনীষা ব্যানার্জী বলেন, ‘কেবল আমরা নই, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের প্রতিটি চিকিৎসক সহ সংশ্লিষ্টরা শিশুটির ব্যাপারে সতর্ক। এর আগেও আমরা এরকম কয়েকটি শিশুকে সুস্থ করে হস্তান্তর করতে পেরেছিলাম। এই শিশুটিকেও আমরা সুস্থ করে তুলতে চাই।’
শিশুটি ধীরে-ধীরে সেরে উঠছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ধীরগতিতে হলেও শিশুটির শারীরিক অবস্থার উন্নতি হচ্ছে। আমরা তাতেই সন্তুষ্ট। কন্যা শিশুটি নির্ধারিত সময়ের আগেই ভূমিষ্ঠ হয়েছে। শিশুটির ওজন মাত্র এক কেজি ৭০০ গ্রাম (৩.৭৫ পাউন্ড)। সাধারণত একজন নবজাতকের ওজন থাকে আড়াই থেকে চার কেজি। শিশুটির মুখে ঘা ছিল এবং জন্মের পর সে খাবারও পায়নি।’
শিশুটিকে ডাস্টবিন থেকে কুড়িয়ে পেয়েছেন বিপ্লব হোসেন। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বাচ্চাটাকে আমি নিজের মেয়ের মতো করে বড় করতে চাই, আমি ওর বাবা হতে চাই। আমার দুটি ছেলে থাকলেও আমি ওকে নিজের মেয়ের মতো লালন-পালন করতে চাই।’
সেদিনের ঘটনা সম্পর্কে বলতে গিয়ে বিপ্লব হোসেন বলেন, ‘আমার স্ত্রী লিপি বেগম প্রথমে ডাস্টবিনের ভেতরে থাকা পলিথিন থেকে কান্নার শব্দ শুনতে পায়। সে কাছে গিয়ে দেখে পলিথিন দিয়ে শিশুটি জড়ানো। তারপর সে বাচ্চাটিকে নিয়ে বাসায় চলে আসে। শিশুটির শরীরে তখন পিঁপড়া বাসা বেঁধেছে, শরীর লাল হয়ে গেছে পিঁপড়ার কামড়ে। সঙ্গে-সঙ্গে আমি শাহআলী থানায় খবর দিয়েছি। থানার সহযোগিতায় শিশুটিকে নিয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে দ্রুত চলে যাই। সেখানেই এখন তার চিকিৎসা চলছে।’
শিশুটিকে নিজের কাছে রাখার সব রকম চেষ্টা করবেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ওকে পাওয়ার জন্য যা কিছু করতে হয় আমি করব। কোর্টে যেতে হলে যাব। মেয়ের নাম ঠিক করেছি আমার মৃত বোন আশার নামে। মেয়েটিকে আমার স্ত্রী কুড়িয়ে পেয়েছে, বাসায় আনার পর তার নাড়ি কেটেছি আমরা। তাহলে এই মেয়ে কেন অন্য কোথাও গিয়ে বড় হবে?’
বিপ্লব হোসেন আরও বলেন, ‘আমি আপনার প্রতিবেদনের মাধ্যমে সবাইকে জানাতে চাই, শিশুটিকে পাওয়ার পর আমার সহায়-সম্পত্তি যতটুকু আছে তার সমান ভাগ দুই ছেলে আর মেয়ের নামে লিখে দেব। এই মেয়েকে আমি লেখাপড়া শেখাব নিজের দুই ছেলের মতো করে, তাতে কোনও কার্পণ্য থাকবে না। এসব কথা আমি কেবল মুখে বলছি না।’
বিপ্লব হোসেনের বক্তব্য ডা. মনীষা ব্যানার্জীকে জানালে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি আমাদের হাতে নেই। শিশুটিকে পুলিশ নিয়ে এসেছে, এটি এখন সরকারি সিদ্ধান্ত। কিন্তু এর আগে এরকম যে কয়টি শিশুকে আমরা পেয়েছিলাম, তাদেরকে শিশু নিবাস কেন্দ্রে হস্তান্তর করা হয়েছিল। এটাই নিয়ম।’
তিনি আরও বলেন, ‘শিশু নিবাস কেন্দ্র থেকে যথাযোগ্য প্রমাণ এবং নিয়ম মেনেই শিশুদের কোর্টের মাধ্যমে দত্তক দেওয়া হয়। এখানে আমাদের কিছু করার নেই। আমরা কেবল তাকে সুস্থ করার দায়িত্বে নিয়োজিত। বাচ্চাটি আগে সুস্থ হোক, তারপর এ বিষয়ে যাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার তারাই নেবেন।’
এএআর/
আরও পড়ুন: একটি শিশুকে বাঁচানোর জন্য








