মুফতি আব্দুল হান্নান। হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশ বা হুজিবি-র শীর্ষ নেতা। বাড়ি গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়ায়। ৯০ দশকের মাঝামাঝিতে প্রচার সম্পাদক হিসেবে হুজিবিতে যোগ দেয়। তবে সাংগঠনিক তৎপরতার কারণে অল্প দিনেই হয়ে ওঠে হুজির শীর্ষ নেতা। এমনকি বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের বিস্তার ও উত্থানে তাকে জঙ্গিদের গুরু বলা হয়ে থাকে। ২০০০ সালে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সমাবেশস্থলের পাশে ৭৬ কেজি ওজনের বোমা পুঁতে রেখে তাকে হত্যাচেষ্টা চালিয়েছিল। ওই ঘটনাতেই প্রথম আলোচনায় আসে মুফতি হান্নান। এরপর আত্মগোপনে থেকে আরও অনেক হামলার নেতৃত্ব দেয় সে।২০০১ সালে রমনা বটমূলে বোমা হামলা, সিপিবির সমাবেশে বোমা হামলা, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে আওয়ামী লীগের জনসভায় গ্রেনেড হামলার ঘটনা ও সিলেটে ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর বোমা হামলার মূল হোতা সে। ২০০৫ সালের ১ অক্টোবর রাজধানীর বাড্ডার বাসা থেকে তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়,২০০৬ সালের ১৯ নভেম্বর এবং ২০০৭ সালের ১ নভেম্বর দুদফায় ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয় মুফতি আব্দুল হান্নান।ওই স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির বরাতে জানা যায়, মুফতি হান্নানের পুরো নাম মুফতি মাওলানা আব্দুল হান্নান মুন্সি।গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়ার হিরণ এলাকায়। তার বাবার নাম মুন্সী নূর মোহাম্মদ। মায়ের নাম রাবেয়া বেগম। স্ত্রী জাকিয়া পারভীন রুমা। মুফতি হান্নান চার সন্তানের জনক। তার দুই ছেলে ও দুই মেয়ে।বড় ছেলে যশোরের একটি কলেজে পড়ে। ছোট ছেলে ঢাকায় একটি মাদ্রাসার ছাত্র। দুই মেয়ে নাজনীন খানম ও নিশি খানম স্থানীয় মহিলা মাদ্রাসার শিক্ষার্থী।
সূত্র জানায়, গোপালগঞ্জের গওহরডাঙ্গা মাদ্রাসা ও বরিশালের শর্ষিনা আলিয়া মাদ্রাসায় লেখাপড়া করে মুফতি হান্নান।এরপর সে চলে যায় ভারতে। ভারতের দেওবন্দ মাদ্রাসায় পড়াশুনা শেষে, ১৯৮৭ সালে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামিক শিক্ষায় স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে। ১৯৮৮ সালে তিনি পাকিস্তানের করাচির জামিয়া ইউসুফ বিন নূরিয়া মাদ্রাসায় ফিকাহশাস্ত্রে পড়াশুনা শেষ করে।পাকিস্তানে পড়তে গিয়েই মুফতি হান্নান জঙ্গিবাদ ও জিহাদি কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে।
সূত্র জানায়,আশির দশকের শেষের দিকে আফগানিস্তানে সোভিয়েতবিরোধী যুদ্ধ চলছিল। মুফতি হান্নান পাকিস্তানের সীমান্ত শহর খোস্তে গিয়ে সেখানকার একটি মুজাহিদ ক্যাম্পে সামরিক প্রশিক্ষণ নেয়। তারপর সোভিয়েত বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে যোগ দেয়।যুদ্ধ করতে গিয়ে মুফতি হান্নান সেসময় আহতও হয়েছিল। পাকিস্তানের পেশোয়ারে কুয়েত আল হেলাল হাসপাতালে ১০ মাস চিকিৎসাধীন ছিল সে। চিকিৎসা শেষে করাচির ওই মাদ্রাসায় ফিকাহশাস্ত্রে ডিগ্রি নিয়ে ১৯৯৩ সালে দেশে ফিরে আসে মুফতি হান্নান।
দীর্ঘদিন ধরে জঙ্গিবাদবিরোধী কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একজন কর্মকর্তা জানান,দেশে ফিরে আসার এক বছরপর মুফতি হান্নান হুজির কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হয়। ১৯৯৪ সালে প্রথম সে হুজির গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার থানা প্রচার সম্পাদকের দায়িত্ব পায়। কিন্তু সাংগঠনিকভাবে দক্ষ হওয়ায় অল্প দিনের মধ্যেই সে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে চলে আসে। গ্রামে থাকা অবস্থায় সে সোনার বাংলা কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ নামে একটি সাবানের কারখানা চালাতো।সেই কারখানায় মুফতি হান্নানের অনুসারী জঙ্গি সদস্যরাই কাজ করতো।সাবান তৈরির কারখানার আড়ালে সে কৌশলে বিস্ফোরক সংগ্রহ করে বোমা তৈরি করতো।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওই কর্মকর্তা বলেন, মুফতি হান্নান হুজিবির সামরিক শাখার দায়িত্ব পালন করতো। তার নেতৃত্বেই প্রথম ১৯৯৯ সালের ৬ মার্চ যশোরের উদীচীর অনুষ্ঠানে বোমা হামলা করা হয়। একই বছরের ৮ অক্টোবর খুলনা শহরের আহমদিয়া মসজিদে বোমা হামলার নেপথ্য নায়কও সে। ২০০০ সালের জুলাইয়ের ২২ তারিখ কোটালীপাড়ায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সমাবেশ করার কথা ছিল। কিন্তু এর দুই দিন আগেই ২০ জুলাই সমাবেশস্থলের কাছ থেকেই ৭৬ কেজি ওজনের একটি বোমা উদ্ধার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এই ঘটনার পরপরই মুফতি হান্নানের নাম আলোচনায় আসে। এরপর থেকে সে আত্মগোপনে থেকে জঙ্গি কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল। ২০০১ সালের ২০ জানুয়ারি পুরানা পল্টনে সিপিবির সমাবেশে বোমা হামলা চালানো হয় মুফতি হান্নানের নেতৃত্বে। একই বছর ১৪ এপ্রিল পয়লা বৈশাখের দিন রমনা বটমূলে বোমা হামলা, ৩ জুন গোপালগঞ্জের বানিয়ারচরের গির্জায় বোমা হামলা, ১৬ জুন নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়ায় আওয়ামী লীগ অফিসে বোমা হামলা, ২৩ সেপ্টেম্বর বাগেরহাট জেলার আওয়ামী লীগের এক নির্বাচনী জনসভায় বোমা হামলার নেপথ্যেও মুফতি হান্নানের সম্পৃক্ততা রয়েছে। এছাড়া ২০০২ সালের সিরাজগঞ্জে আওয়ামী লীগের আরেকটি নির্বাচনী আলোচনা সভায় বোমা হামলার নায়কও এই হান্নান। ওই বছরের ২৮ সেপ্টেম্বর ও ৭ নভেম্বর সাতক্ষীরা ও ময়মনসিংহের একাধিক সিনেমা হলে হামলা চালানো হয় মুফতি হান্নানের নেতৃত্বে। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার মূল নায়ক সে।
এছাড়া ২০০৪ সালের ২১ মে সিলেটে হজরত শাহজালাল (র.)-এর মাজারে বাংলাদেশে তৎকালীন ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর হামলা করে মুফতি হান্নান ও তার সহযোগীরা।এই মামলাতেই ফাঁসি কার্যকর হচ্ছে মুফতি হান্নানের। হান্নানের পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় সর্বশেষ গ্রেনেড হামলা হয় ২০০৫ সালের ২৭ জানুয়ারি হবিগঞ্জে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, মুফতি হান্নান একজন দুর্ধর্ষ জঙ্গি। সামরিক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি সে বোমা তৈরিতেও দক্ষ ছিল। সব ধরনের অস্ত্র চালনায় প্রশিক্ষণ ছিল তার। এসব কারণে সে ছিল বেপরোয়া।
জঙ্গিবাদ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসা গবেষক ও মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেন, ‘আফগানিস্তান থেকে যুদ্ধ ফেরত মুফতি হান্নান উদীচীর ঘটনা দিয়ে শুরু করে, হবিগঞ্জের সমাবেশে হামলার মাধ্যমে শতাধিক ব্যক্তি হত্যার ঘটনায় পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে জড়িত সে। সে সামরিক প্রশিক্ষণ থাকার কারণেই যে দলের শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছেছে তা ঠিক নয়।তার সঙ্গে দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থার যোগাযোগও ছিল। একারণে সংগঠনের মধ্যে তার প্রভাব ছিল সবচেয়ে বেশি।’
জঙ্গিবাদ বিষয়ের এই গবেষক বলেন, ‘মুফতি হান্নানের ফাঁসি কার্যকরের মধ্য দিয়ে হুজিবি’র একটি অংশের অবসান ঘটতে যাচ্ছে। কারণ হুজিবি’র অধিকাংশ নেতাকর্মী এখন কারাগারে। বাইরে যারা আছে, তাদের ঘুরে দাঁড়াবার ততটা শক্তি ও সামর্থ্য নেই। এর কারণ হলো, তাদের ডাকে সাধারণ মানুষ যেমন এখন আর সাঁড়া দিচ্ছে না, তেমনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানেও তারা কোনঠাসা হয়ে পড়েছে।
/এপিএইচ/
আরও পড়ুন: মুফতি হান্নানসহ তিন জঙ্গির ফাঁসি কার্যকর








