জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের সব ধরনের প্রমাণ থাকার পরও তার ফাঁসি নিশ্চিত না হওয়ায়, এর পুরো দায় প্রসিকিউশনের ওপর চাপিয়ে দিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। এদিকে প্রসিকিউটররা বলছেন, আপিল বিভাগে যুক্তি উপস্থাপন থেকে শুরু করে পরিচালনা করেছেন অ্যাটর্নি জেনারেল। প্রসিকিউশন ট্রাইব্যুনালে মামলা পরিচালনা করেছে এবং সেখানে ফাঁসির রায় হয়েছে। তাহলে এই ব্যর্থতা প্রসিকিউশনের হয় কী করে?
এদিকে দীর্ঘদিন বিচার চেয়ে আন্দোলনের সঙ্গে জড়িতরা বলছেন, যদি অ্যাটর্নি জেনারেল দেখেন যে, গ্যাপ আছে তাহলে ত্রুটিগুলো দূর করার দায়তো তারও। আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনে সাক্ষ্য আইন প্রযোজ্য না। বিরোধীপক্ষের আইনজীবীরা ফৌজদারি আইনের দিকে টানার চেষ্টা করেছে। সংশ্লিষ্টদের সদিচ্ছা থাকলেও তারা তাদের অভ্যস্ত ফৌজদারি ও দেওয়ানি দুই জায়গায় আটকে থাকছেন।
মানবতাবিরোধী অপরাধে ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে সাঈদীর মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়। ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর আপিল বিভাগ এই দণ্ড কমিয়ে সাঈদীকে আমৃত্যু কারাগারে রাখার আদেশ দেন। পরে সাঈদীর আমৃত্যু কারাদণ্ডের সাজা কমিয়ে এবং ফাঁসি চেয়ে রিভিউ আবেদন করে রাষ্ট্রপক্ষ। দেড় বছর পর আজ (সোমবার) রিভিউ আবেদন খারিজ করে দেন আপিল বিভাগ। ফলে বাকি জীবন কারাগারে কাটাতে হবে সাঈদীকে।
সাঈদীর ফাঁসি চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষের রিভিউ আবেদন খারিজ করে দেওয়ার পর সোমবার অ্যাটর্নি জেনারেল আবারও ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশনের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘সাঈদীর মতো এই রকম একটা লোক, তার যে দণ্ড পাওয়া উচিত ছিল, সেই দণ্ডটা পেল না। এ দুঃখ আমার রয়েই যাবে।’ অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘আদালতে যেভাবে তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করা দরকার ছিল, ট্রাইব্যুনালে বিচার পরিচালনাকালে সেভাবে উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হয়েছে প্রসিকিউশন। সেটা করা হয় নাই বলে আজকে আমরা সাঈদীর ফাঁসির আদেশ পেলাম না।’
ট্রাইব্যুনালের কী কী দুর্বলতা ছিল সে বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর নির্দেশেই বিসাবালিকে হত্যার উদ্দেশে যে রাজাকার গুলি করেছিল, তাকে এই মামলায় হাজির করা যায়নি। সেক্ষেত্রে সহায়তাকারী হিসেবে সাঈদীকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেন নাই আপিল বিভাগ।’
অ্যাটর্নি জেনারেলের এই অভিযোগের বিষয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন টিমের সদস্যরা বলছেন, এ মামলার ব্যর্থতার বিষয়গুলো রায় থেকে সরিয়ে ফেলার আবেদন যখন আপিল আদালতে করা হলো, তখন কেন অ্যাটর্নি জেনারেল বিরোধিতা করলেন না। ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন দলের সদস্য তুরিন আফরোজ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা খুব হাস্যকর যুক্তি দিচ্ছেন। আমরা তো ট্রাইব্যুনালে এ মামলায় সাঈদীর মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করেছি। আর সেটি হয়েছে সবকিছু প্রমাণ করেই। প্রসিকিউশনের দুর্বলতা থাকলে তো ট্রাইব্যুনালে মৃত্যুদণ্ডের রায় হতো না। রিভিউ আবেদনের মামলা পরিচালনা করছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল নিজেই। সেক্ষেত্রে দায় কেন আমাদের ওপর পড়বে।’
প্রসিকিউশন টিমের আরেকজন আইনজীবী জেয়াদ আল মালুম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কোথাও কোনও ত্রুটি থাকলে আপিল বিভাগে যুক্তি তো তিনি (অ্যাটর্নি জেনারেল) প্লেস করছেন। তিনি শুধরে নেবেন। আমার প্রশ্ন হলো, রায় থেকে প্রসিকিউটরের ব্যর্থতার বিষয়টি যখন সরিয়ে নেওয়ার আবেদন জানানো হলো, তখন অ্যাটর্নি জেনারেল আপত্তি করলেন না কেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা মিডিয়ায় ব্যর্থতার কথা বলে যে দ্বৈত আচরণ করেছেন, তা মানুষকে অবশ্যই ব্যথিত ও বিভ্রান্ত করবে।’
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চেয়ে আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুনতাসির মামুন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘১৯৭৩ সালে যারা আইন করেছিলেন, তারা অনেক দূরদর্শী। তারা সময় থেকে এগিয়ে ছিলেন। কারণ, যারা আইনটি এখন বাস্তবায়ন করছেন, সদিচ্ছা থাকলেও তারা ফৌজদারি ও দেওয়ানি আইনে মামলা পরিচালনা করতে অভ্যস্ত। তারা এখনও এই দুই জায়গাতে আটকে আছেন।’
/এপিএইচ/
আরও পড়ুন: আমৃত্যু কারাগারেই থাকতে হবে সাঈদীকে








