বিচারপতিদের তদারকি কি সংসদ সদস্যরা করবেন, প্রশ্ন আপিল বিভাগের

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
০২ জুন ২০১৭, ০০:০৪আপডেট : ০২ জুন ২০১৭, ০১:৫৯

সুপ্রিম কোর্ট

বিচারকদের অপসারণে করা ষোড়শ সংশোধনী বহাল রাখলে বিচারকরা যদি ১০টার বদলে আদালতে সাড়ে ১০টায় বসেন এটা কে দেখবে সে প্রশ্ন তুলেছেন আপিল বিভাগ।বিচারপতিরা অ্যাটর্নি জেনারেলের কাছে জানতে চেয়েছেন তখন সংসদ সদস্যরা সেটি দেখবেন কিনা।

বৃহস্পতিবার প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন সাত সদস্যের বেঞ্চ রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তি শোনেন। দিনের শুরুতে উত্তর দেন অতিরিক্ত আটর্নি জেনারেল মুরাদ রেজা। এরপর অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম তার যুক্তি উপস্থাপন শুরু করেন। শুনানির এক পর্যায়ে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, বিচার বিভাগ রাষ্ট্রের একটি অঙ্গ। নিজেদের বিচার নিজেরা করাটা ন্যায়বিচার ও আইনের শাসনের পরিপন্থী। এ বিচার করতে গিয়ে বিচারপতিদের আবেগ অনুভূতির ঊর্ধ্বে ওঠা সম্ভব নাও হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, চিকিৎসকদের সংগঠন বিএমডিসি’র কথা বলেন তিনি। অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, কোনো চিকিৎসকের বিরুদ্ধে চিকিৎসায় অবহেলার জন্য বা শর্ত ভঙ্গের কারণে বিএমডিসি কোনও ব্যবস্থা নিয়েছে তার কোনও নজির নেই। তাই আইন করার আগে ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করা উচিত হবে না।

এসময় বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা বলেন, সব বিভাগতো নিজেদের বিচার নিজেরাই করে। প্রধান বিচারপতি এ বক্তব্যকে সমর্থন করেন। প্রধান বিচারপতি বলেন, বিষয়টি যদি সংসদের হাতে দেওয়া হয়, তখন বিচারকরা ১০টার পরিবর্তে সাড়ে ১০টায় বসলো। এটা কে দেখবে? সংসদ সদস্যরা কি এখানে এসে দেখবেন ?

এসময় আপিল বিভাগের জেষ্ঠ্য বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহহাব মিঞা বলেন, কোনও বিচারপতিই প্রধান বিচারপতির অধীন না। তারা স্বাধীন। প্রধান বিচারপতির কাছ থেকে ক্ষমতা যদি নিয়ে যান তাহলে জজদের কে তদারকি করবেন? কেউ তো তখন প্রধান বিচারপতিকে মানবেন না। এর ফলে বিচার বিভাগের শৃঙ্খলা ভেঙে পড়বে।

বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহহাব মিঞা বলেন, বিচারকরা ১২টায় বেঞ্চে বসবেন, দুই তিন বছর পর রায় লিখবেন। প্রধান বিচারপতিকে বুড়ো আঙুল দেখাবেন। তখন প্রধান বিচারপতি একমাত্র বেঞ্চ গঠন ছাড়া কিছুই করতে পারবেন না।

প্রধান বিচারপতি অ্যাটর্নি জেনারেলকে উদ্দেশ করে বলেন, আপনি বলেছেন যে কোনও নাগরিক সংসদে গিয়ে একজন বিচারকের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে পারবেন। এটা হলে তো সব শেষ করে দেবেন।

জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, শেষ হবে কেন? সামরিক আইন দিয়ে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের বিধান করা হয়েছে। তা যদি রাখা হয় তবে সেটা হবে ইতিহাসের বিরাট ভুল। আপনারা কেন সংসদের ওপর আস্থা রাখতে পারছেন না?

অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম শুনানিতে বলেন, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি, জাতীয় সংসদ, সুপ্রিম কোর্ট অর্থাৎ শাসন বিভাগ, আইন সভা ও বিচার বিভাগ সবই সংবিধান দ্বারা সৃষ্ট। নির্বাহী বিভাগ আইন সভা বা বিচার বিভাগ কেউ সার্বভৌম নয়। বিচার বিভাগ সংবিধান দ্বারা সৃষ্ট। সৃষ্টি তার স্রষ্টার ভাল-মন্দ বিচার করার ক্ষমতা রাখে না। সংবিধানের মূল অনুচ্ছেদসমূহ সমস্ত বিতর্কের ঊর্ধ্বে। কেবলমাত্র যখন তা সংশোধন হয় তখন সে সংশোধন সংবিধানের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ কি না তা বিচার করার এখতিয়ার উচ্চ আদালতের আছে। তিনি বলেন, সংবিধান অনুযায়ী সব ক্ষমতার মালিক জনগণ। এই জনগণ আছে বলেই সংসদ, বিচার বিভাগ আছে।

প্রধান বিচারপতি বলেন, জনগণের কল্যাণের কথাই আমরা চিন্তা করছি। জনগণের অধিকার রক্ষায় বিচারিক আদালতের বিচারকরা কাজ করে যাচ্ছেন। এ জন্য আমাকে নিম্ন আদালতগুলো পরিদর্শনের জন্য প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেতে হচ্ছে। অথচ সেই নিম্ন আদালতের বিষয়ে সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদে হাত দিয়েছেন। এটা ফিরিয়ে দিন। আমি আপনার সঙ্গে আছি। তিনি বলেন, শুধুই কী ১১৬তে হাত দিয়েছেন, সরকারি কর্মকমিশন (পিএসসি), নির্বাচন কমিশন বিষয়ক অনুচ্ছেদ নিয়েও আপনাদের চিন্তা করতে হবে। এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে স্বাধীনতার প্রশ্ন জড়িত। আমরা যখন সংবিধানের ব্যাখ্যা দেবো তখন পুরো সংবিধানকেই পর্যালোচনা করবো। সুপ্রিম কোর্ট সংবিধানের অভিভাবক। আমরা শুধুই বিচারক বা বিচার বিভাগ নয়, দেশের ভবিষ্যতের কথাও চিন্তা করতে হবে। তিনি বলেন, এখন যত মামলা বিচারাধীন আছে তার ৮০ ভাগ মামলাই তো ওইসব (অধঃস্তন) আদালতে।  

অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ৯৬(৩) এ বলা নেই যে, বিচারকদের অপসারণের বিষয়টি সংসদ তদন্ত করবে।

সুপ্রিম কোর্টের বিচারক অপসারণ ক্ষমতা জাতীয় সংসদের হাতে পুনর্বহাল সংক্রান্ত সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের করা আপিলের ওপর শুনানি শেষ হয়েছে গতকাল বৃহস্পতিবার। আদালত এটি যে কোনোদিন রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রেখেছেন।

প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে আপিল বিভাগের সাত বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে রাষ্ট্রপক্ষের করা আপিলের ওপর শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত মোট ১১ কার্যদিবস শুনানি হয়েছে। গতকাল অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম ও অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মুরাদ রেজাই শুনানি করেন। তাদের বক্তব্য শেষে রিট আবেদনকারীপক্ষে অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বক্তব্য রাখেন।

শুনানির শেষ পর্যায়ে অ্যাডভোকেট মনজিল মোরশেদ বলেন, পঞ্চম সংশোধনী মামলার রায়ের বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের কাছে কিছু অভিমত রাষ্ট্রপক্ষ পুনর্বিবেচনার আবেদন করেছিল। কিন্তু ৯৬ অনুচ্ছেদের সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল নিয়ে রাষ্ট্রপক্ষ কোনও রিভিউ আবেদন করেনি। তিনি বলেন, সুপ্রিম কোর্ট যখন কোনও রায়ে সিদ্ধান্ত দেয় সেই সিদ্ধান্ত বিলুপ্ত করে সংসদ কোনও আইন করতে পারে না।

/এমটি/ইউআই/এমএ/টিএন/আপ- এমএ/

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
বিশ্ব অর্থনীতির সামনে দুই কঠিন পথ, নেপথ্যে ইরান যুদ্ধ ও এআই সংকট
বিশ্ব অর্থনীতির সামনে দুই কঠিন পথ, নেপথ্যে ইরান যুদ্ধ ও এআই সংকট
এবার পল্লবীতে মিললো আরেক নারীর গলিত মরদেহ
এবার পল্লবীতে মিললো আরেক নারীর গলিত মরদেহ
নিখোঁজ ব্যবসায়ীর হাত-পা বাঁধা মরদেহ উদ্ধার
নিখোঁজ ব্যবসায়ীর হাত-পা বাঁধা মরদেহ উদ্ধার
ওপেনএআই’র নতুন বাজি ‘কোডেক্স’
ওপেনএআই’র নতুন বাজি ‘কোডেক্স’
সর্বাধিক পঠিত
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম