বয়লার বিস্ফোরণে ৬ মাসে ৪৩ জন নিহত

আমানুর রহমান রনি
০৬ জুলাই ২০১৭, ১১:০৪আপডেট : ০৬ জুলাই ২০১৭, ২০:৫৭

 

গাজীপুরে বয়লার বিস্ফোরণে বিধ্বস্ত কারখানা মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শিল্প কারখানাগুলোতে বয়লার বিস্ফোরণের সংখ্যা বেড়েই চলছে। একটি পর একটি দুর্ঘটনা ঘটলেও বয়লারের মানোন্নয়নে নেই কোনও পদক্ষেপ। ফলে বয়লার বিস্ফোরণে  প্রাণহানির সংখ্যাও বেড়ে চলেছে। কেবল এ বছরের প্রথমার্ধেই এই সংখ্যা ৪৩ জন। বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিম্নমান ও মেয়াদোত্তীর্ণ বয়লার ব্যবহারের কারণেই ঘটছে এসব দুর্ঘটনা। এ বিষয়টি দেখভালের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাটিও রয়েছে জনবলের চরম সংকটে। তাই সহসা এই সংকট উত্তরণের পথ দেখছেন না তারা।

বাংলাদেশের শ্রমিকদের নিয়ে কর্মরত সংগঠন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ থেকে ২০১৬ সালে বয়লার বিস্ফোরণের ৩৩টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৪১ জন। আর ২০১৭ সালের প্রথমার্ধেই পাঁচটি ভয়াবহ বয়লার বিস্ফোরণে নিহত হয়েছেন ৪৩ জন শ্রমিক। সেই হিসাবে গত সাড়ে পাঁচ বছরে নিহতের সংখ্যা ৮৪।

এ বছরের প্রথম মাসেই ২৬ জানুয়ারি গাজীপুর সিটি করপোরেশনের পূবাইল এলাকায় গাড়ির পরিত্যক্ত টায়ার গলিয়ে কেমিক্যাল তৈরির কারখানায় বয়লার বিস্ফোরণের ঘটনায় সাত শ্রমিকের মৃত্যু হয়। আহত হয় আরও সাত জন। জানুয়ারিতেই সিরাজগঞ্জের একটি কারখানায় বয়লার বিস্ফোরণে তিন জনের মৃত্যু হয়। এছাড়া, এপ্রিলে কুষ্টিয়াতে দুই জন ও একই মাসে দিনাজপুরের গোপলগঞ্জে মৃত্যু হয় ১৮ জন শ্রমিকের।

সর্বশেষ, গত সোমবার (৩ জুলাই) গাজীপুরের কোনাবাড়ী নয়াপড়া এলাকায় মাল্টিফ্যাব লিমিটেড পোশাক কারখানায় বয়লার বিস্ফোরণের ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১৩ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। এই দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ৫০ জনেরও বেশি। তাদের মধ্যে কয়েকজন গুরুতর আহত হওয়ায় নিহতের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই ঘটনা তদন্তে জেলা প্রশাসক ও ফায়ার সার্ভিস পৃথক দুইটি কমিটি গঠন করেছে। দায়ের করা হয়েছে মামলা।

এদিকে বিলসের তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ সালে সারাদেশে বয়লার বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে ৭টি। এসব দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন আট জন শ্রমিক, আহত হয়েছেন ৩৫ জন। এছাড়া, ২০১৩ সালে বয়লার বিস্ফোরণে নিহত হয়েছেন ছয় জন, আহত ২৫ জন; ২০১৪ সালে নিহত হয়েছেন পাঁচ জন, আহত ৮১ জন; ২০১৫ সালে নিহত হয়েছেন ছয় জন, আহত ৮৩ জন এবং ২০১৬ সালে সাতটি বয়লার বিস্ফোরণে নিহত শ্রমিকের সংখ্যা ১৬ জন, আহত ১৩ জন। সব মিলিয়ে এই পাঁচ বছরে ৩৩টি বয়লার বিস্ফোরণে নিহত হয়েছেন মোট ৪১ জন শ্রমিক, আহত হয়েছেন ২৩৭ জন। আহতদের অনেককেই পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয়েছে।

বিলসের তথ্য সমন্বয়কারী ইউসূফ আলী মামুন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা দেশের গণমাধ্যম থেকে এসব তথ্য সংগ্রহ করে থাকি। এসব দুর্ঘটনার নেপথ্যে বয়লারের মেয়দোত্তীর্ণ হয়ে যাওয়া ও মনিটরিংয়ের অভাব রয়েছে।’ সঠিকভাবে দেখাশোনা করা হলে এমন ঘটনা কখনই ঘটত না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বাংলাদেশের শিল্প কারখানাগুলোতে প্রধানত শক্তি উৎপাদনের জন্য বয়লার ব্যবহার করা হয়। এই প্রক্রিয়া পরিচালিত হয় পানিকে বাষ্পে পরিণত করার মাধ্যমে। রাইস মিল, ডাইয়িং মিল, পোশাক কারখানাসহ বিভিন্ন কারখানায় ব্যবহৃত হয় বয়লার। শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে কল-কারখানা পরিদর্শন অধিদফতর থেকে এসব বয়লারের অনুমোদন দেওয়া হয়। বয়লারের জন্য আলাদা পরিদর্শন অধিদফতরও রয়েছে। সংশ্লিষ্ট অধিদফতরের হিসাব অনুযায়ী, দেশের প্রায় তিন হাজার কারখানায় ব্যবহারের জন্য নিবন্ধিত বয়লারের সংখ্যা সাড়ে পাঁচ হাজার। এর বাইরেও অনিবন্ধিত বয়লারও রয়েছে।

অবাক করার মতো তথ্য হলো— দেশের সাড়ে পাঁচ হাজার নিবন্ধিত বয়লারের জন্য পরিদর্শন অধিদফতরের জনবল মাত্র আট জন। এদের মধ্যে একজন প্রধান পরিদর্শক, দুই জন উপ-প্রধান পরিদর্শক এবং বাকি পাঁচ জন পরিদর্শকের দায়িত্ব পালন করেন। শিল্প এলাকাগুলো ভাগ করে দায়িত্ব পালন করেন এই পাঁচ জন পরিদর্শক।

বয়লার পরিদর্শক শরাফত আলী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা এখনও পাঁচ জন পরিদর্শকই আছি। পাঁচ জন মিলেই কাজ করছি। আমরা জনবল চেয়ে অর্গানোগ্রাম তৈরি করে পাঠিয়েছি। তা এখনও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। আমরা বয়লারের সনদ ও অপারেটরদের সনদ দিয়ে থাকি। কিন্তু এত বড় কর্মযজ্ঞ করার ক্ষেত্রে যে জনবল দরকার তা কখনও আমাদের ছিল না এবং এখনও নেই।’

বয়লার অধিদফতরের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতিটি বয়লার বছরে যদি একবারও পরীক্ষা করা হয়, তাহলেও একেকজন পরিদর্শককে বছরে এক হাজারেরও বেশি বয়লার পরীক্ষা করতে হবে। ওই পরিদর্শক বছরের প্রতিটি দিন কাজ করলেও তাকে দিনে তিনটি করে বয়লার পরীক্ষা করতে হবে। বয়লারগুলো সারাদেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকায় প্রকৃতপক্ষে তাই এই জনবল দিয়ে বছরে একবারও প্রতিটি বয়লার পরীক্ষা করা সম্ভব নয়।

এই হিসাব কেবল নিবন্ধিত বয়লারের। অধিদফতরের অনুমোদনহীন বয়লারকে হিসাবে নিলে এই চিত্রটি আরও করুণ।

দেশে বর্তমানে মেয়াদোত্তীর্ণ বয়লার ৫৯৬ টি

বয়লার অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৫৯৬টি বয়লার মেয়াদোত্তীর্ণ অবস্থায় আছে। এসব বয়লারের ১৬১টি গাজীপুরে, ৭১টি চট্টগ্রামে, ৭১টি রাজশাহীতে, ৯৫টি ঢাকা-হবিগঞ্জ-সিলেটে, ১০৭টি নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদী-মুন্সিগঞ্জে এবং বাকি ৯১টি ঢাকা জেলায় অবস্থিত। নিয়ম অনুযায়ী, মেয়াদ শেষ হওয়ার একমাস আগে পরিদর্শনের জন্য বয়লার অধিদফতরে আবেদন করতে হয় কারখানার মালিকদের। পরিদর্শকরা পরিদর্শন শেষে বয়লারকে ঝুঁকিমুক্ত মনে করল এর মেয়াদ বাড়ান, আর ঝুঁকিপূর্ণ মনে করলে এর নিবন্ধন বাতিল করেন।

/টিআর/

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বিদ্যুতের দাম বাড়ায় শিল্প ও জ্বালানি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে
বিদ্যুতের দাম বাড়ায় শিল্প ও জ্বালানি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম