কেবল সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় নয়, আরও অনেক ইস্যুতে স্পষ্ট হয়ে উঠছে বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগের মধ্যকার দ্বন্দ্ব। প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বরাবরই বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের অভিযোগ করে আসছেন৷ অন্যদিকে, খোদ প্রধানমন্ত্রী বলছেন, বিচার বিভাগ স্বাধীন৷ আর অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলছেন, দ্বন্দ্ব কেন হবে, বরং ‘আদর্শিক পার্থক্য’র (আইডলজিক্যাল ডিফারেন্স) জায়গা তৈরি হয়েছে।
বিদেশযাত্রায় কার অভিমত, শৃঙ্খলাবিধির গেজেট প্রকাশ কার এখতিয়ার, শৃঙ্খলাবিধি হস্তান্তরের পরও প্রধান বিচারপতির সেটি গ্রহণ না করার মতো বিষয়ে সাধারণ মানুষের সামনে বিভক্তির জায়গাগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠছে। অবশ্য আইন বিশ্লেষকরা বলছেন, এটা খারাপ কিছু নয়। বিতর্কের জায়গা থাকতে পারে। তবে ষোড়শ সংশোধনী নিয়ে আইন কমিশনের চেয়ারম্যান এ বি এম খায়রুল হকের বক্তব্যের পর বিষয়গুলো নানা ডালপালা মেলেছে। শুরুটা মাসদার হোসেন মামলার রায় বাস্তবায়ন করা না করার মধ্য দিয়ে।
কত জায়গায় মতবিরোধ-
রাষ্ট্র বনাম মাসদার হোসেন মামলার রায়ের আলোকে ২০০৭ সালের পহেলা নভেম্বর বিচার বিভাগ পৃথক হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি: নেই পৃথক সচিবালয়, হয়নি বিচারকদের শৃঙ্খলাবিধি৷ এরই মধ্যে বিচারপতিদের অভিশংসন ক্ষমতা সংসদের হাত থেকে সরিয়ে ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের মধ্য দিয়ে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল ব্যবস্থায় ফেরা। অন্যদিকে অ্যাটর্নি বলছেন, ষোড়শ সংশোধনীর মধ্য দিয়ে বিচারকদের অপসারণ ক্ষমতা সংসদের হাত থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হলেও তা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের কাছে গেছে এমন নয়, বরং এক ধরনের শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু এরই মধ্যে গত ৬ আগস্ট সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের সভাও অনুষ্ঠিত হয়।
শৃঙ্খলাবিধির গেজেট: ষোড়শ সংশোধনীর রায়ই নয়, চলতি বছরের শুরু থেকে দফায় দফায় গণমাধ্যমে নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগের টানাপড়েন চোখে পড়ে। বিচার বিভাগ আলাদা হলেও নিম্ন আদালতের বিচারকদের এখনও নিয়ন্ত্রণ করে আইন মন্ত্রণালয়৷ তাদের বদলি, পোস্টিং আইন মন্ত্রণালয়ের হাতে রয়ে গেছে৷ বিচার বিভাগের সুপারিশ উপেক্ষা করারও অভিযোগ আছে৷ গত মে মাসে আইন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে অধঃস্তন আদালতের বিচারকদের প্রশিক্ষণের জন্য বিদেশে পাঠানোর ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের অনুমতি না নেওয়ায় উচ্চ আদালত ও মন্ত্রণালয়ের দ্বন্দ্ব প্রকাশ্য রূপ নেয়।
আদালতে ডাক পড়ে দুই সচিবের: বিচারিক আদালতের বিচারকদের শৃঙ্খলাবিধির গেজেট করতে বার বার সময় নেওয়ায় গত ৮ ডিসেম্বর সরকারের দুই সচিবকে তলব করেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। দুই সচিব হলেন-আইন মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগের সচিব আবু সালেহ শেখ মোহম্মদ জহিরুল হক এবং একই মন্ত্রণালয়ের ড্রাফটিং ও পার্লামেন্টারি উইংয়ের সচিব মোহম্মদ শহিদুল হক।
বিদেশে যাওয়ার অনুমতি দেবে কে: গত ৯ মে ‘বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাগণের বিদেশ গমনের ক্ষেত্রে আবশ্যিকভাবে সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ গ্রহণ সংক্রান্ত’ একটি সার্কুলার জারি করেন সুপ্রিম কোর্ট। এতে বলা হয়, সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিচার বিভাগে নিযুক্ত ব্যক্তি ও ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা বিধানের বিষয়টি রাষ্ট্রপতির উপর ন্যস্ত এবং সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শ করে তার বাস্তবায়ন হয়। ফলে বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তার কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতি, ছুটি মঞ্জুরি, নিয়ন্ত্রণ, শৃঙ্খলা বিধান, বিদেশ গমন ও চাকরির অন্যান্য শর্তসহ সব বিষয় সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শক্রমে নির্ধারণ করা অনস্বীকার্য।
শৃঙ্খলাবিধিতে দরকার নেই মন্ত্রীর: গেজেট হওয়া না হওয়া নিয়ে দীর্ঘ আলাপের পর আইন মন্ত্রণালয়কে ছাড়াই রাষ্ট্রপতির সম্মতি নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট বিচারিক আদালতের বিচারকদের চাকরির শৃঙ্খলাসংক্রান্ত বিধিমালা প্রণয়ন করতে পারে বলে আদালতে জানান ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম। কয়েক মাসে দফায় দফায় সময় নেওয়ার পর আইনমন্ত্রী আনিসুল হক গত মাসের শেষে শৃঙ্খলাবিধির একটি খসড়া জমা দিলেও কয়েকটি শব্দ ও বিধি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রধান বিচারপতি তা গ্রহণ না করে ফেরত দেন।
পরে মতপার্থক্য নিরসনে ৩ আগস্টের মধ্যে আইনমন্ত্রী, অ্যাটর্নি জেনারেল ও আইন মন্ত্রণালয়ের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে আলোচনায় বসারও প্রস্তাব দেন প্রধান বিচারপতি। তবে আইনমন্ত্রী বসতে চেয়েও অসুস্থতার কারণে বসতে পারেননি। এই প্রেক্ষাপটে রবিবার মাসদার হোসেন মামলায় আবেদনকারী পক্ষের অন্যতম আইনজীবী আমীর-উল ইসলাম আপিল বেঞ্চে ওই মত লিখিত আকারে উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, শৃঙ্খলাসংক্রান্ত বিধিমালা করতে আইন মন্ত্রণালয়ের দরকার নেই। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগ বিধিমালা করে ১১৬ অনুচ্ছেদ অনুসারে কেবল রাষ্ট্রপতির সম্মতি নিলেই হয়।
এদিকে, এই পরিস্থিতিকে কোনও দ্বন্দ্ব বলতে রাজি নন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বেশকিছু বিষয়ে যা ঘটতে দেখা যাচ্ছে, সেটি কোনও দ্বন্দ্ব নয়। দ্বন্দ্ব তো হতো তখনই যখন কোনও একটি পদের জন্য কনটেস্টে নামতো কেউ। এখানে সে সুযোগ নেই। বরং এটিকে আদর্শিক ভিন্নতার জায়গা বলা যতে পারে।’
তবে পুরো বিষয়টিকে আদর্শিক ভিন্নতা বলতে চান না আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। তিনি বলেন, ‘তারা একটি রায় দিয়েছেন, সেটি আলোচনা-পর্যালোচনা চলছে। কেউ যদি বঙ্গবন্ধুকে গালি দেয় তাহলে অবশ্যই সেটিতে জনগণ প্রতিক্রিয়া দেখাবে, এটি স্বাভাবিক। তাই বলে এটাকে দ্বন্দ্ব বা আদর্শিক ভিন্নতা বলতে চাই না।’
/ইউআই/এএম








