‘গ্রেনেড হামলার দুদিন পরেও নেত্রী ছিলেন শোকে বিহ্বল’

উদিসা ইসলাম
২১ আগস্ট ২০১৭, ১৯:৪৯আপডেট : ২২ আগস্ট ২০১৭, ০১:১১

২১ আগস্টে গ্রেনেড হামলার পর শেখ হাসিনা (ফাইল ছবি)

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার পর পুরো দেশের মানুষ অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা কখন কথা বলবেন তা জানার জন্য। জাতির সামনে তিনি হাজির হয়েছিলেন আরও অনেক পরে। তবে এই চরম দুঃসময়ে তার সঙ্গে সবার আগে মুখোমুখি দেখা করতে পেরেছিলেন যে দু’জন সাংবাদিক তারা বলেছেন সেই মুহূর্তে শেখ হাসিনা ছিলেন শোকে পাথর, বিহ্বল। তারপরেও ওই হামলায় আহত-নিহত সবার কথা ভাবছিলেন তিনি।

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বিকালে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের জনসভা চলাকালীন সময়ে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার মুখোমুখি হন তদানীন্ত বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা। এ ঘটনায় বহু হতাহতের ঘটনা ঘটে। প্রথমে মানব ঢাল তৈরি করে ও পরে নিজস্ব নিরাপত্তা রক্ষীদের সহায়তায় ধানমন্ডির সুধাসদনে ফেরেন শেখ হাসিনা। এরপর টানা দুদিন সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার অবস্থায় ছিলেন না তিনি। ভীতবিহ্বল আওয়ামী সভাপতি ২৩ আগস্ট গণমাধ্যমে প্রথম কথা বলেন এটিএন বাংলার সঙ্গে। টানা দুদিন বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকার পর সে সুযোগ পান এটিএন বাংলার তদানীন্তন সাংবাদিক ও বর্তমানে এটিএন নিউজের প্রধান নির্বাহী মুন্নী সাহা।

ঘটনার দুইদিন পরের বর্ণনা দিতে গিয়ে মুন্নী সাহা বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যে ছবি সবগুলো পত্রিকায় আজ (২১ আগস্ট ২০১৭) প্রকাশিত হচ্ছে সেটি সম্ভবত ২২ তারিখ দুপুরে সুধা সদনের দোতলায় তোলা। সেখানে কয়েকজন ফটো জার্নালিস্ট গিয়েছিলেন সেইদিন, কোনও রিপোর্টার দোতলায় ওঠেননি। উনি পরদিন বিকেলে যখন নিচে নামেন তখন তার সামনে রিপোর্টারদের মধ্যে আমি একা ছিলাম। সারাদিন তিনি কখন নীচে নামবেন সেই অপেক্ষা করছিলাম। উনি বিকেলের দিকে যখন নামেন, তখন সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়িয়েছিলেন নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা শামীম ভাই, শিরিন আখতারসহ আরও কয়েকজন আর আমি, ভেতর দিকের সিঁড়িটাতে। সারদিনই শুনছিলাম নামবেন, ওপর থেকে আমরা অপেক্ষা করছিলাম সেই খোঁজ পেয়েছেন, চা পাঠিয়েছেন, অপেক্ষা করতে বলেছিলেন।’

মুন্নী সাহা বলেন, ‘উনি যখন নেমে সিঁড়ির গোড়াটায় পৌঁছালেন তখন একটু যেন বিহ্বল হয়ে পড়েছিলেন। পরনে ছিল হালকা আকাশী রঙের সূতির শাড়ি। নামতে গিয়ে আমাদের দেখে একটা সিঁড়ি মিস করে গেলেন এবং পড়ে যাচ্ছিলেন। দৌড়ে গিয়ে শিরিন আপা তাকে জড়িয়ে ধরলেন। উনি আমাদের সামনে পেয়ে হাউমাউ করে কাঁদছিলেন। আমাকে জড়িয়ে ধরে সেকি কান্না! তিনি কান্নাজড়িত বিহ্বল অবস্থাতেই আবার আদর করে খোঁজখবর নেন সাংবাদিকদের।’

এতবড় হামলার ঘটনা থেকে বেঁচে ফিরে সেই প্রথম সাংবাদিকের সামনে দাঁড়ান তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা। কতক্ষণ হবে সময়টা জানতে চাইলে বাংলা ট্রিবিউনকে মুন্নী সাহা বলেন, ‘সেখানেই দাঁড়িয়ে আমরা দশ পনেরো মিনিট কথা বলেছি। তার হাতটা ধরেছিলাম। শিরিন আপাকে তিনি জড়িয়ে ধরে রেখেছেন, আমার একটা হাত তার হাতে। ওভাবেই আমরা বাইরের ঘরের দিকে আসি। আমার সঙ্গে স্ট্যান্ড না থাকায় মাইক্রোফোন নিয়ে মাটিতে বসেছি। কথা বলতে বলতেই আমাকে ইশারা দিয়ে কাছে ডাকলেন। আমি এক হাতে তার হাত ধরে আছি আরেক হাতে মাইক্রোফোন। এত বড় নেতার হাত ধরে ইন্টারভিউ করা যায় কিনা সেটা তখন মাথাতেই আসেনি। যে মানুষ এতটা ট্রমার মধ্যে, যিনি আমাকে এভাবে আদর করছেন, আমি তার হাতটা ধরে আছি, ছাড়িনি এই অনুভূতি মানুষটাকে অনুভব করতে দেওয়া উচিত। মৃত্যুর পথ থেকে বেঁচে আসলে মা যেমন করে সেভাবেই উনি কেঁদে বুকে টেনে নিয়েছেন, আমিও হাতটাই ধরে ছিলাম: একজন মানুষ, ভাল আত্মার মানুষ, তার হাতটা ধরে আছি।’

সেসময় চ্যানেল আইতে কর্মরত সাংবাদিক নজরুল কবীর ছিলেন দ্বিতীয় সাক্ষাতকার গ্রহীতা। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমার অ্যাসাইনমেন্ট ছিল সুধাসদনে, সেখানেই সারাক্ষণ থাকা। সেসময় শেখ হাসিনা সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেননি। আমরা অপেক্ষা করছি। এরইমধ্যে জানা গেল আইভি রহমান মারা গেছেন। সাক্ষাতের অনুমতি মেলায় ২৪ তারিখ বিকেল চারটার দিকে আওলাদ হোসেন এসে বললেন ওপরে যেতে। দোতলায় একটা রিডিং রুম আছে সেখানে বসেছিলেন শেখ হাসিনা। আইভী আপার মৃত্যুর বিষয়ে প্রতিক্রিয়া নিয়েই কথা হচ্ছিল মূলত। যতবার তাঁর কথা উঠেছে ততবার টপ টপ করে চোখের পানি পড়েছে। নজরুল কবীর বলেন, বেরিয়ে আসার আগ মুহূর্তে একটা কথা জানতে চাই বললে শেখ হাসিনা বলেন, ‘বল কী বলবি’। আমি জানতে চাই, ‘আপা আপনার কি মনে হয়, কারা এটা ঘটাতে পারে।’ উনি উত্তর দেন, ‘হরকাতুল জেহাদতো সারাজীবনই আমাকে মেরে ফেলতে চেষ্টা করছে। এটা আমার জন্য নতুন কিছু না। এখনতো ওরাই ক্ষমতায়, ওদের সহযোগীরাই ক্ষমতায়। দ্যাখ, ওরা চাইছে আমি মরে গেলে বাংলার মানুষ শেষ হবে। বাংলার মানুষকে এত সহজ না শেষ করা। জাতির পিতাকে মেরেও আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করা সম্ভব হয়নি।’ এরপর দুপুরে খেয়েছে কিনা, মুখ শুকনা কেন সে খবরও নিয়েছেন নেত্রী।

সেসময় প্রথম সাক্ষাতে শেখ হাসিনার চেহারায় শোকের না চিন্তার ছায়া ছিল প্রশ্নে বর্তমানে বাংলা ট্রিবিউনের প্ল্যানিং এডিটর হিসেবে কর্মরত নজরুল কবীর বলেন, ‘যখন উনাকে আসতে দেখেছি, নির্বাক—অনেকটা পাথরের মতো। আর নিহত আহত নেতা কর্মীদের কথা বলতে গিয়ে তিনি কান্নায় ভেসে গেছেন।’

 

/টিএন/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
দেশে ফিরেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান
দেশে ফিরেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান
মূল্যস্ফীতির আগুনে পুড়ছে মানুষ, বাড়ছে বিদ্যুতের দাম এরপর কী
মূল্যস্ফীতির আগুনে পুড়ছে মানুষ, বাড়ছে বিদ্যুতের দাম এরপর কী
থানায় স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকে নির্যাতনের অভিযোগ, ৩ পুলিশ সদস্য প্রত্যাহার
থানায় স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকে নির্যাতনের অভিযোগ, ৩ পুলিশ সদস্য প্রত্যাহার
কট্টরপন্থি ইহুদিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার নির্দেশ নেতানিয়াহুর
কট্টরপন্থি ইহুদিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার নির্দেশ নেতানিয়াহুর
সর্বাধিক পঠিত
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম