আইএফআইসি ব্যাংক ভবনের ৯০ কদম পশ্চিমে ‘খানা বাসমতি’ রেস্টুরেন্টের সামনে থেকে অপহৃত হন ওই ব্যাংকের করপোরেট কমিউনিকেশন্স ও ব্র্যান্ডিং বিভাগের অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট শামীম আহমেদ। অপহরণকারীরা ওই রেস্টুরেন্টের সামনে প্রায় দুই ঘণ্টা সাদা রংয়ের একটি ‘হাইএস মাইক্রোবাস’ নিয়ে অপেক্ষা করে। এরপর শামীম আহমেদ রেস্টুরেন্টে খেতে আসলে তাকে জোর করে মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। গত বুধবার (২৩ আগস্ট) দুপুর দেড়টার পর রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকা পুরানা পল্টনে এই অপহরণের ঘটনা ঘটে।
তার আগে ‘খানা বাসমতি’ রেস্টুরেন্টে অপহরণকারীরা দুপুরের খাবার খায়। ওই রেস্টুরেন্টে থাকা ক্লোজ সার্কিট (সিসি) ক্যামেরায় তাদের খাওয়াদাওয়ার দৃশ্য ধারণ করা রয়েছে। ফুটেজ দেখে অপহরণকারীদের খুব সহজে চিহ্নিত করা সম্ভব বলে দাবি করেছেন শামীম আহমেদের পরিবারের সদস্যরা।
অপহরণের ঘটনায় ২৩ আগস্ট পল্টন মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন শামীম আহমেদের স্ত্রী শিল্পী আহমেদ। তিনি মোবাইলে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দুপুরে খাবারের জন্য তিনি (শামীম আহমেদ) অফিস থেকে বের হন। টিটু নামে তার এক বন্ধুর সঙ্গে বাসমতি রেস্টুরেন্টে দুপুরের খাবার খাওয়ার কথা। অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর যখন তিনি রেস্টুরেন্টে আসছিলেন না, তখন টিটু হোটেল থেকে বের হয়ে সামনে পান-সিগারেটের দোকান ও গার্ডদের জিজ্ঞেস করে জানতে পারেনে যে, তাকে (শামীম আহমেদ) তুলে নিয়ে গেছে। এরপর তিনিই (টিটু) আইএফআইসি অফিস ও আমাদের জানান।’
আজ (শুক্রবার) সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, ৬১ পুরানা পল্টনে আইএফআইসি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের ৯০ কদম পশ্চিমে ‘খানা বাসমতি’ রেস্টুরেন্টের অবস্থান। ২৩ আগস্ট দুপুরে এই হোটেলের সামনে থেকে তুলে নেওয়া হয় আইএফআইসি ব্যাংক কর্মকর্তা শামীম আহমেদকে। অন্তত ৯ জন অপহরণকারী এতে অংশ নেয়।
রেস্টুরেন্ট কর্তৃপক্ষ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, হোটেলের সামনে প্রায় ২ ঘণ্টা ধরে সাদা রংয়ের একটি মাইক্রোবাস দাঁড়ানো ছিল। দুপুর ১টা ১০ মিনিটের দিকে দু’জন লোক রেস্টুরেন্টে এসে নিচতলায় মাঝামাঝি স্থানে দু’টি টেবিল বুক করে। এরপর পূর্বনির্ধারিত টেবিলে না বসে তারা ৯জন রেস্টুরেন্টে প্রবেশের মুখে প্রথম দু’টি টেবিলে বসে খাওয়াদাওয়া করে।
এই ৯ জনকে খাওয়ান ওয়েটার ময়নাল হোসেন। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দুই টেবিল একসঙ্গে করে দুইপাশে চার জন করে তারা মোট আট জন বসেন। আরেক পাশে আলাদা বসেন এক জন। মোট নয়জনের খাবারের বিল হয় ৩ হাজার ৩৪০ টাকা। খাবারের তালিকায় ভর্তা, ভাজি, বোয়াল মাছ ও খাসির মাংস ছিল।’
ঘটনার সময় রেস্টুরেন্টের সামনে গার্ডের দায়িত্বে ছিলেন আহম্মদ আলী ও বাহাদুর। আহম্মদ আলী বলেন, ‘প্রায় দুই ঘণ্টা সাদা রংয়ের একটি মাইক্রোবাস রেস্টুরেন্টের সামনে ছিল। মাইক্রোবাসের লোকজন হোটেলে খাওয়া দাওয়া করে। দুপুর দেড়টার কিছু পর রেস্টুরেন্টের দিকে আসার সময় একজনকে তারা জোর করে গাড়িতে তুলে নিয়ে যান। কাকে নিয়ে গেছে শুরুতে আমরা চিনতে পারিনি। পরে জানতে পেরেছি, উনি আইএফআইসি ব্যাংকের কর্মকর্তা ।’
‘খানা বাসমতি’ রেস্টুরেন্টের ঠিক সামনে রয়েছে পান-সিগারেট ও মোবাইলে টক-টাইম লোডের ভাসমান দোকান। ওইদিন দোকানে ছিলেন করিম। তিনি বলেন, ‘কালো গ্লাসের একটি গাড়ি অনেকক্ষণ পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল। পূর্ব পাশ থেকে (আইএফআইসি ব্যাংকের সামনে থেকে) একজন আসেন। হোটেলের সামনে আসার পর গাড়ি থেকে নেমে কয়েকজন তাকে (শামীম আহমেদ)ধরে টেনে গাড়ি তোলেন। গাড়িতে তোলার আগ মুহূর্তে ওই ব্যক্তি হোচট খেয়ে পড়ে যান। এরপর টেনে হিচড়ে তাকে গাড়ির ভেতরে নেওয়া হয়। তাকে তুলে নেওয়ার পর গাড়িটি এখান থেকে দ্রুত চলে যায়।’
অপহরণকারীরা যে দুই টেবিলে বসে দুপুরের খাবর খেয়েছিল, তার ঠিক ওপরে দুইপাশে দু’টি সিসি ক্যামেরা রয়েছে। এই ক্যামেরা দু’টিসহ রেস্টুরেন্টের ভেতরে মোট আটটি সিসি ক্যামেরা রয়েছে। অপহরণকারীদের স্পষ্ট ছবি সিসি ক্যামেরার ফুটেজে রয়েছে বলে জানান খানা বাসমতির কর্মচারিরা।
টেবিলের ওপরে থাকা দু’টি ক্যামেরার একটির ফোকাস দরজার দিকে ও অন্যটি টেবিলের দিকে। একপাশে বসা চার জনের মধ্যে অন্তত তিন জনের চেহারা ফুটেজে দেখা গেছে। এছাড়া, খাওয়ার আগে ও পরে হাত ধোয়ার জন্য বেসিনে যাওয়া-আসার সময় একাধিক সিসি ক্যামেরায় তাদের ফুটেজ রয়েছে।
শুক্রবার (২৫ আগস্ট) অফিস বন্ধ থাকায় অপহরণের ব্যাপারে আইএফআইসি ব্যাংক কর্তৃপক্ষের কারও বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ব্যাংকের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত সিকিউরিটি গার্ডরা জানান, তারা এব্যাপারে কিছু জানেন না। সিকিউরিটি ইনচার্জ মো. আজিজ বলেন, ‘এ নিয়ে আমি কোনও কথা বলতে পারবো না। আজকে ব্যাংক বন্ধ। খোলার পর এসে আপনি দায়িত্বশীলদের সঙ্গে কথা বলুন।’
এদিকে রেস্টুরেন্টের সিসিটিভি ফুটেজ দেখে সহজেই অপহরণকারীদের শনাক্ত করা সম্ভব হবে বলে দাবি করেন শামীম আহমেদের স্ত্রী শিল্পী আহমেদ। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘রেস্টুরেন্টে বসে অপহরণকারীরা খেয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজে তাদের ছবি রয়েছে। পুলিশ চাইলে সহজেই এদের চিহ্নিত করা সম্ভব।’
ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাইলে পল্টন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাহমুদুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা শামীম আহমেদের বর্তমান অবস্থান শনাক্ত করতে পারিনি। আমাদের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।’
‘খানা বাসমতি’র সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেছেন কিনা, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমরা সবগুলো বিষয় মাথায় রেখে কাজ করে যাচ্ছি।এখনও অবস্থা অপরিবর্তিত রয়েছে।’








