‘রিশা ফুল আর প্রজাপতি খুব ভালবাসতো। প্ল্যাস্টিকের প্রজাপতি দিয়ে ঘর সাজাতো। ছোট ভাইবোনদের প্রতি নির্দেশ ছিল- কেউ যেন এই প্রজাপতিতে হাত না দেয়। রিশা তার পড়ার টেবিলের ওপরে দেয়ালে লাগিয়েছিল প্রায় দশটি প্ল্যাস্টিকের প্রজাপতি। সেখানে এখন আছে পাঁচটি,বাকি প্রজাপতিগুলো পড়ে গেছে। আমার মেয়েটা মরে গেছে। আর দেয়ালে লাগানো ওর প্রজাপতিগুলো ঝরে পড়েছে। আমার ঘরের প্রাণটাই নাই। প্রজাপতিগুলো থাকবে কী করে’, কথাগুলো বলতে বলতে মেয়ের ছবি হাতে নিয়ে বিলাপ করছিলেন রিশার মা তানিয়া হোসেন। এসময় তাকে সান্ত্বনা দেয় রিশার ছোট বোন তিশা, ছোট ভাই রবি, আর বাকরুদ্ধ বাবা মো. রমজান হোসেন।
প্রসঙ্গত, সুরাইয়া আক্তার রিশা (১৫) ছিল রাজধানীর কাকরাইলে উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের অস্টম শ্রেণির ছাত্রী। ২০১৬ সালের ২৪ আগস্ট দুপুরে ওই স্কুলের সামনে ওবায়দুল নামে এক বখাটের ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত হয়সে। দু’দিন পর ২৮ আগস্ট ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় রিশা।
রিশার মৃত্যুর একবছর পর আজ (২৮ আগস্ট) পুরনো ঢাকায় তাদের বাসায় গিয়ে দেখা যায়, পুরো বাসায় মানুষ মাত্র চার জন। রিশার বাবা, মা, ছোট ভাই এবং বোন। কারও মুখে কোনও কথা নেই। রিশার মা মসলা বাটছেন। বাবা আরেক ঘরে কাজ করছেন। আর ছোট দুই ভাইবোন মায়ের পাশে বসে আছে। কিসের মসলা বাটছেন জানতে চাইলে রিশার মা বলেন, ‘গতকাল (রবিবার) থেকেই মাদ্রাসার এতিম শিশুদের খাওয়াচ্ছি। আজও খাওয়াবো। পোলাও, গরুর মাংস, ডাল আর পায়েস। তবে পায়েসটা আমি বাসায় রান্না করবো। মেয়েটা আমার হাতের পায়েস পছন্দ করতো। তাই আজ যাদের খাওয়াবো তাদেরকেও আমি আমার হাতে রান্না করেই খাওয়াতে চাই।’
তানিয়া হোসেন মসলা বাটেন আর বিলাপ করেন, ‘সারাদিন যেমন তেমন, কিন্তু রাতে ঘুম হয় না। মনে হয় মেয়েটা আমার সারাঘর ধরে হাটে। আমাকে ডাকে।’
এবার রিশার বাবা রমজান হোসেন মুখ খুললেন, ‘বিচারের জন্য গত একটা বছর ধরে কোর্টে ঘুরছি। এত সাক্ষী, এত প্রমাণ, তারপরও কি আমার মেয়েটার খুনির বিচার হবে না? ওতো (আসামি ওবায়দুল) মানুষ না। মানুষ হলে কেউ কাউকে এভাবে ছুরি মারতে পারে না।’
এ কথা শুনে তানিয়া হোসেন চিৎকার করে কেঁদে উঠলেন এবং বলতে লাগলেন, ‘আমার মেয়েটারে যখন ছুরি মারছে, তখন কত কষ্টই না জানি মেয়েটার হইছে। অথচ এই মেয়েরে কোনোদিন আমরা ফুলের টোকা পর্যন্ত দেইনি। এত লক্ষ্মী মেয়ে আমার ছিল যে, কখনও তার (টোকা) দরকারই পড়েনি। আমার সেই লক্ষ্মী বাচ্চাটাই নাই। ঘরের বড় সন্তান যে কী-সেটা কেবল বাবা-মাই বোঝে। মা-বাবা বেঁচে থাকতে সন্তানের মৃত্যু যন্ত্রণা যেন কাউকে পেতে না হয়। মা-বাবা থাকতে কারও সন্তান যেন মারা না যায়। এর চেয়ে কষ্ট দুনিয়াতে আর কিছু নেই।’
তানিয়া হোসেন এবার মশলা বাটা রেখে উঠে দাঁড়ান। পাশের ঘরে গিয়ে বলেন, ‘এটা রিশার ঘর। সব আছে আগের মতো। যেখানে রিশা যেটা রেখেছিল, সেগুলো সরানো হয়নি কিছুই। কেবল আমার মেয়েটা নেই। এই বাসার প্রজাপতিটা নেই। ঘরে থাকতে পারি না। রাস্তায় বের হয়ে রিশাকে খুঁজি।কিন্তু কোথাও পাই না মেয়েকে। কেউ আমাকে এখন ওর মতো করে মা বলে না।’ বলতে বলতে বাঁধাই করানো রিশার ছবিটি চোখের সামনে তুলে আনেন তানিয়া। ছবিতে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলেন, ‘‘আমার মেয়েটা বাঁচতে চেয়েছিল। ওবায়দুল যখন ওকে ছুরি মারে,তখন সে বাম হাত দিয়ে ছুরিটা ধরেছিল। কত কষ্টই আমার মেয়েটা পেয়েছে। তারপর হাসপাতালের আইসিইউ’র বেডে আমার কাছে পানি খেতে চাইলো। পানিটাও দিতে পারি নাই। সেখানকার ডাক্তাররা বলেছিল, ‘অপারেশনের রোগীকে পানি দিতে হয় না।’ আমি কেবল তখন তুলা ভিজিয়ে ঠোট মুছায়ে দিলাম। তখন মেয়েটা আমার হাতটা শক্ত করে ধরেছিল-সেই শেষ ধরা। আমার মেয়েটা আর আমাকে ধরলো না। চলে গেল।’








