মুসা ও মাহফুজের হাত ধরে জঙ্গিবাদে আলম ওরফে আব্দুল্লাহ

নুরুজ্জামান লাবু
২৮ আগস্ট ২০১৭, ২২:৫৮আপডেট : ২৯ আগস্ট ২০১৭, ০২:১০

আলম ওরফে আব্দুল্লাহ নব্য জেএমবির শীর্ষ দুই নেতা মাইনুল ইসলাম মুসা ও হাতকাটা মাহফুজ ওরফে সোহেল মাহফুজের হাত ধরে জঙ্গিবাদে জড়িয়েছিল ময়মনসিংহের ভালুকায় নিহত জঙ্গি আলম প্রামাণিক। তার সাংগঠনিক নাম ছিল আব্দুল্লাহ ড্রাইভার। আগে বাহক হিসেবে কাজ করলেও ধীরে ধীরে সে বোমা তৈরির কারিগর হয়ে ওঠে। ভালুকার বাসায় বোমা তৈরি করতে গিয়েই বিস্ফোরণে নিহত হয় সে। ওই রাতেই বাসা থেকে পালিয়ে যাওয়া তার স্ত্রী পারভীন ও দুই শিশু সন্তানকে আটক করেছে পুলিশ। কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সিটিটিসির অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের কাছে আলম ওরফে আব্দুল্লাহর বিষয়ে তথ্য ছিল। তাকে ধরতে আমরা অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। কিন্তু তার আগেই নিজে বোমা বানাতে গিয়ে সে নিহত হয়। তার সঙ্গে সহযোগী আর কেউ ছিল কিনা সে বিষয়ে আমরা খোঁজ-খবর করছি।’

সিটিটিসি সূত্র জানায়, জঙ্গিবাদে জড়িয়ে গত বছরের নভেম্বরে কথিত হিজরতের নামে ঘর ছাড়ে এই আলম প্রামাণিক। তবে প্রথম দিকে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ থাকলেও চলতি বছরের জানুয়ারিতে সে মোবাইল নম্বর বন্ধ করে দিয়ে পরিবারের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। হিজরতের সময় সঙ্গে নেয় স্ত্রী-সন্তানদের। হিজরতের পরে প্রথমে কুষ্টিয়া গিয়ে একটি বাসায় আস্তানা গাড়ে। এর আগেও সে ঢাকায় ছিল। ঢাকায় থাকা অবস্থায় সে গাড়ির চালক ও গাড়িচালকের সহযোগী হিসেবে কাজ করেছে। কিছুদিন পিকাপ ভ্যানও চালিয়েছে। পরবর্তীতে সাভারে একটি লেদ মেশিনেও কাজ করে সে।

সিটিটিসির কর্মকর্তারা বলছেন, ‘মাস কয়েক আগে তারা কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় একটি বাসায় অভিযান চালিয়েছিল সিটিটিসির একটি দল। ওই বাসায় এই আলম ওরফে আব্দুল্লাহ ছিল। কিন্তু অভিযানের আগের দিনই স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে ওই বাসা ছেড়ে চলে যায় সে। এরপর থেকেই তাকে খুঁজে আসছিল সিটিটিসির কর্মকর্তারা।’

সিটিটিসির কর্মকর্তাদের ধারণা, ওই সময়ই আলম ওরফে আব্দুল্লাহ কুষ্টিয়া থেকে ময়মনসিংহের ভালুকায় চলে যায়।

সিটিটিসির একজন কর্মকর্তা জানান, কুষ্টিয়ায় এই আলম ওরফে আব্দুল্লাহ আরমান নামে এক জঙ্গি সদস্যের আশ্রয়ে ছিল। আরমান তাকে বাসা ভাড়া করে দেওয়াসহ নিজের ডিস ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চাকরিও দিয়েছিল। ভেড়ামারার ঠাকুর দৌলতপুরের আছান আলীর ছেলে আরমান আলী নিজ বাসায় থেকেই জঙ্গি কার্যক্রম করে আসছিল। তিন দিন আগে কুষ্টিয়ায় পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয় আরমান আলী।

সিটিটিসির ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘আরমান নিহত হওয়ায় আলম ওরফে আব্দুল্লাহসহ তার সহযোগীরা বুঝতে পারে আব্দুল্লাহর সন্ধান যেহেতু পুলিশ পেয়েছে, ফলে তাদের বাসার সন্ধানও পেতে পারে। একারণে তিন দিন আগে নতুন বাসায় ওঠে আলম ওরফে আব্দুল্লাহ। তার সঙ্গে আরও একাধিক সহযোগী ছিল। আব্দুল্লাহর বাসার পাশেই আরেকটি বসায় তাদের আস্তানা ছিল। বিস্ফোরণে আলম ওরফে আব্দুল্লাহ মারা যাওয়ার খবর পেয়ে তার সহযোগীরা ওই বাসা থেকে পালিয়ে যায়। ঢাকা থেকে ভালুকায় যাওয়া সিটিটিসির কর্মকর্তারা ওই বাসাতেও অভিযান চালিয়েছে।’

চালক থেকে বোমা তৈরির কারিগর

কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট সূত্র জানায়, স্বল্প শিক্ষিত আলম ওরফে আব্দুল্লাহ এক সময় চালক হিসেবে কাজ করতো। কিন্তু জঙ্গিবাদে জড়িয়ে চালক থেকে সে বোমা তৈরির কারিগর হয়ে যায়। বাসায় বসে সে বোমা বানাচ্ছিল। বোমা তৈরি করতে গিয়ে বিস্ফোরণে মারা যায় সে। তার বাসা থেকে বোমা তৈরির উপকরণসহ একাধিক শক্তিশালী বোমাও উদ্ধার করা হয়েছে।

ঢাকা থেকে ময়মনসিংহে যাওয়া সিটিটিসির সহকারী পুলিশ কমিশনার আহমেদুল ইসলাম বলেন, ‘আলম ওরফে আব্দুল্লাহ বাসায় বসে বোমা তৈরি করছিল। বাসার ভেতর থেকে বোমা তৈরির উপকরণ ও প্রচুর বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া মোবাইলসহ আরও কিছু জিনিসপত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এসব জিনিসপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা হচ্ছে।’

সিটিটিসির কর্মকর্তাদের ধারণা, নব্য জেএমবিতে বোমা তৈরির কারিগর খুব বেশি নেই। অল্প যে কয়েকজন রয়েছে, তারাই অন্যদের বোমা তৈরির প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। বোমা তৈরির প্রশিক্ষকদের ধরতেও অভিযান চালানো হচ্ছে। কর্মকর্তারা বলছেন, ‘তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে চার থেকে পাঁচ জন বোমা তৈরির প্রশিক্ষক রয়েছে। এদের মধ্যে হাদীসুর রহমান সাগর বা আব্দুস সামাদ মামুন ওরফে আরিফের কোনও হদিস নেই। মামুন নামে একজনের কিছু তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, যাকে একাধিকবার অভিযান চালিয়েও ধরা যায়নি। বারবার হাত ফসকে পালাতে সক্ষম হয়েছে সে। সে নব্য জেএমবির নতুন সদস্যদের বোমা তৈরিতে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে।’

সিটিটিসির একজন কর্মকর্তা বলছেন, ‘তাদের ধারণা, ভালুকায় আলম ওরফে আব্দুল্লাহর সঙ্গে এই মামুনও হয়তো অবস্থান করছিল।’

যেভাবে জঙ্গিবাদে আলম ওরফে আব্দুল্লাহ

গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ ও বিভিন্ন সময়ে গ্রেফতার হওয়া জঙ্গিদের জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সিটিটিসির কর্মকর্তারা বলছেন, ‘মৌলভিবাজারের আস্তানায় নিহত হওয়া জেএমবির শীর্ষ নেতা মাইনুল ইসলাম মুসা ও গত আট জুলাই চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ থেকে তিন সহযোগীসহ গ্রেফতার হওয়া আরেক শীর্ষ নেতা হাতকাটা মাহফুজ ওরফে সোহেল মাহফুজের মাধ্যমে জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ে আলম ওরফে আব্দুল্লাহ।’ সিটিটিসির তথ্যমতে, নাটোর থেকে যে চার জন যুবক কথিত হিজরতের নামে বাসা ছেড়ে গিয়েছিলো বলে তাদের কাছে তথ্য ছিল, তার একজন হলো আলম ওরফে আব্দুল্লাহ। নব্য জেএমবির আরেক নেতা আর্চারের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল তার।

নিহত আলম ওরফে আব্দুল্লাহর স্বজনরা জানায়, নাটোরের সদর উপজেলার ছাতনী ইউনিয়নের তালতলা চক আমহাটি এলাকায়। তিন বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে আলম দ্বিতীয়। আলম ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করেছে। এরপর সে শহরের একটি ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপে কাজ করত। এক পর্যায়ে ট্রাকের ড্রাইভার হয়। একটি দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে সে ড্রাইভিং ছেড়ে দিয়ে রাজমিস্ত্রীর জোগানদার হিসেবে কাজ শুরু করে। দুই ছেলে সন্তান ইয়াসিন ও ইসমাইলের বাবা আলম একসময় প্রাণ কোম্পানির গাড়িচালক হিসেবেও কাজ করতেন। নিহত আলম ওরফে আব্দুল্লাহর স্বজনদের দাবি, বাবার সঙ্গে রাগারাগি করে গত ৭ এপ্রিল স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায় সে। বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর থেকেই তার সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ বন্ধ ছিল।

কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, আলম ওরফে আব্দুল্লাহর বিষয়ে তাদের কাছে জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়া এবং কুষ্টিয়ায় অবস্থানের তথ্য ছিল। সে কবে হিজরত করেছে এবং কিভাবে জঙ্গিবাদে জড়িয়েছে তার সহযোগীদের মাধ্যমে জানার চেষ্টা চলছে। তাদের ধারণা, বাড়িতে থাকা অবস্থাতেই সে জঙ্গিবাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়। সংগঠনের প্রয়োজনে এক সময় হিজরতের জন্য বাসা থেকে বেরিয়ে পড়ে।

নতুন করে কি হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে নব্য জেএমবি?

সর্বশেষ আলম ওরফে আব্দুল্লাহর বোমা তৈরি ও বিস্ফোরণ এবং এর আগে ১৫ আগস্ট পান্থপথের হোটেল ওলিও ইন্টারন্যাশনালে সিটিটিসির অভিযানে এক জঙ্গির মৃত্যু কী বার্তা দিচ্ছে? কোনঠাসা হয়ে যাওয়া নব্য জেএমবি কি আবার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে?

সিটিটিসির একজন কর্মকর্তা জানান, আলম ওরফে আব্দুল্লাহ আগে ক্যারিয়ার বা বাহক হিসেবে কাজ করতো বলে তাদের কাছে তথ্য ছিল। কিন্তু গত কয়েক মাসে সে বোমা তৈরির প্রশিক্ষণ নিয়েছে। তার বোমা তৈরির উদ্দেশ্য নতুন করে হামলার প্রস্তুতি ছিল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘নব্য জেএমবি কোনঠাসা হলেও একেবারে নিঃশেষ হয়ে যায়নি। তাদের মুহাজির বা সরাসরি হিজরতকারীর সংখ্যা কমে গেলেও মুনাসির (র‌্যাডিক্যাল হয়ে থাকা) এর সংখ্যা অনেক রয়েছে। যাদের ডাক দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কথিত হিজরতের নামে ঘর ছেড়ে বেড়িয়ে আসবে। বর্তমানে অনলাইনের মাধ্যমেই তাদের নানা রকম শারীরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এমনকি অনলাইনে বোমা তৈরির প্রশিক্ষণও দেওয়া হচ্ছে মুনাছিরদের।

/এসএমএ/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম