‘সায়েন্স ল্যাব থেকে সকাল সাড়ে ১১ টায় বাসে উঠে ধানমন্ডির ২৭ নম্বরে রাপা প্লাজার সামনে আসতে লেগেছে সাড়ে তিন ঘণ্টা। বাসের বাইরে বৃষ্টি,আর রাস্তায় পানি। বাস থেকে নেমে হাঁটা দেবেন সেই পরিস্থিতি নাই। বাসের বেশিরভাগ জানালা নষ্ট থাকায় বৃষ্টির পানিতে ভেতরেও সেই ভেজা অবস্থা।’ কথাগুলো বলছিলেন জান্নাতুল ফেরদৗস নামের একজন বেসরকারি চাকরিজীবী।
তিনি বলেন, ‘বৃষ্টি এলে এখন আর শিহরণ জাগে না। জানালার বাইরে তাকিয়ে ছেলেবেলার মতো বৃষ্টি দেখতে মন চায় না। মেঘ ডাকা শুরু হলেই সারাদিন ঢাকার রাস্তায় যে হয়রানি হতে হবে, সেই চিত্রই ফুটে ওঠে। পত্রিকায়-টেলিভিশনে কত রকমের পরিকল্পনার কথা শুনি। কিন্তু চোখের সামনে রাজধানীতে জলাবদ্ধতার এলাকা বেড়েই যাচ্ছে।’
সকাল সাড়ে আটটায় বৃষ্টির মধ্যেই অফিসে রওনা দেওয়ার উদ্দেশে বের হন কাজীপাড়া নিবাসী শামীম হোসেন। দোতলা বাসা থেকে সিঁড়ি দিয়ে নামার চেষ্টা করতেই দেখেন, শেষ সিঁড়ির কাছে থইথই করছে বৃষ্টিতে জমে থাকা পানি। ফের গাড়িতে গিয়ে বসেন। শামীম বলেন, ‘গ্যারেজে জেনারেটরের রুমে পানি ঢুকে যাচ্ছে। এরপর এটা সার্ভিসিং করতে হবে। অর্থনৈতিক এসব ক্ষতির দায়ভার কেউ নেয় না। আমাদের অ্যাপার্টমেন্ট ভবন রাস্তা থেকে অনেক উঁচুতে হওয়ার পরও পানি ঢুকে যাচ্ছে। তারপরও ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় না। ঢাকা শহরটাকে বদলানোর পরিকল্পনা দরকার।’
একইভাবে রাজধানীর মোহাম্মদপুর, কাঠালবাগান, রাজারবাজার, তেজকুনিপাড়া, মৌচাক, মালিবাগের ঘরে ঘরে পানি ঢুকে পড়তে দেখা গেছে। এই হয়রানি থেকে কবে নাগাদ রাজধানীবাসীর মুক্তি মিলবে কেউ জানে না। পুরোবর্ষা মৌসুমজুড়েই সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে নানা প্রকল্পর কথা শোনানো হয়েছে। কোন প্রকল্প কবে নাগাদ শেষ হলে এ পরিস্থতি আর দেখতে হবে না, তা জানলে চাইলে সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট বিভাগ জানায়, মিরপুর রোডের পাইলট প্রকল্প হলে পুরো কলাবাগান, সোবহানবাগ, ধানমন্ডি ২৭ এর জায়গাগুলো ডুববে না। কিন্তু আবাসিক এলাকা ডুবে যাওয়া যে তাতে থেমে যাবে, এমন আশ্বাস কেউই দিচ্ছেন না।
রবিবার দিনব্যাপী থেমে থেমে বৃষ্টি এবং সোমবার সকালে ভারি বর্ষণের কারণে ডিএনসিসি’র অভিজাত এলাকা গুলশান, বনানী, বারিধারা, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, পূর্ব রামপুরা, হাজীপাড়া, মৌচাক, মালিবাগ, মগবাজার, প্রগতি সরণীর কুড়িল বিশ্বরোড থেকে বাড্ডা, কারওয়ান বাজার, বেগুনবাড়ি, পান্থপথের বিভিন্ন এলাকা, মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, মালিবাগের গুলবাগ, মগবাজারের নয়াটোলা সড়ক, ফার্মগেটের পূর্ব ও পশ্চিম রাজাবাজার, খিলক্ষেত নিকুঞ্জ ও নিকুঞ্জ-২ এর জামতলা এলাকা, উত্তরার বিভিন্ন সেক্টর, মিরপুরের শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া, কালশী ও মধুবাগে তীব্র জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। নিম্নাঞ্চল বা নিচু বাড়ি ডুবেছে এমন বলার আর সুযোগ নেই। হাঁটু থেকে গলাপানি পর্যন্ত ডুবে যাওয়া ঢাকা ঠিক কবে নাগাদ নগরবাসীকে আবারও বৃষ্টিবিলাসের সুযোগ দেবে তার কোনও সুনির্দিষ্ট সময় বলতে পারছেন না কেউ। কী কী উদ্যোগ নিলে ঢাকা আর ডুববে না বিশেষজ্ঞরা সেটা বললেও আদৌ এই উদ্যোগগুলো বাস্তবায়ন করা যাবে কিনা, সে নিয়ে শঙ্কা রয়েই গেল এবারের বর্ষার শেষ দিকে এসেও।
মিরপুর সড়ক পানিতে ডোবার হাত থেকে রক্ষা পেতে পাইলট প্রকল্পের কথা জানিয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আসাদুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,‘এখানকার পানি নেমে যেতে ঘণ্টাখানেক সময় লাগে। এ এলাকা থেকে নিউমার্কেট পর্যন্ত পরিস্থিতি পরিবর্তনে আমরা মডেল সড়কের পাইলট প্রকল্প নিয়েছি। ইতোমধ্যে পরিকল্পনা জমাও নেওয়া হয়েছে। এই কাজটি হলে এ এলাকার পানি জমা কমবে।’
ঢাকাকে পরিকল্পিত করে গড়ে তোলার কাজটা কে করবে উল্লেখ করে নগর পরিকল্পনাবিদ ও স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা নানা পদ্ধতির কথা বলার চেষ্টা করেছি। গভীর নলকূপ দিয়ে যেভাবে পাম্পিং সিস্টেমে ভূগর্ভের পানি উত্তোলন করা হয়, ঠিক একই সিস্টেমে সে পানি মাটির নিচে ঢুকিয়ে দেওয়া যাবে এটাও ভাবা হয়েছে। কিন্তু কে কখন কাজটা করবে সেই সমন্বয়টা থাকতে হবে সবার আগে।’
পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজটা কে করবে তা নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে, সেটি স্পষ্ট হয় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান প্রকৌশলী ফরাজি সাহাব উদ্দিন এর কথায়। তিনি বলেন, ‘আইন অনুযায়ী জলাবদ্ধতার মূল অথরিটি ঢাকা ওয়াসা। আমরা ওয়াসার সহযোগী হিসেবে কাজ করছি। বৃষ্টির পানি অপসারণের সব ড্রেন ও খাল ওয়াসার। তাদের খাল ও ড্রেনের সঙ্গে আমাদের কিছু সংযোগ লাইন রয়েছে। তাদের খাল ও ড্রেন যখন ব্লক হয়ে যায়, তখন আমাদের সংযোগ লাইন কাজ করে না। তখন আমাদের করার কিছুই থাকে না।’
সাহাব উদ্দিন বলেন, ‘আমাদের মাত্র একটা খাল আছে, ধোলাইখাল। কিন্তু ধোলাইখাল এলাকায় কোনও জলাবদ্ধতা নেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা জলাবদ্ধতা নিরসনে শান্তিনগরে মাত্র একটা প্রকল্প নিয়েছি। সেটার কাজ শেষ হয়নি। যে কারণে ওই এলাকায় এখনও পুরোপুরি সফলতা দেখা যাচ্ছে না। এছাড়া আমাদের কোনও প্রকল্প নেই।’








