শারদীয় দুর্গোৎসবের আজ (শুক্রবার) মহানবমী। সকাল ৬টা থেকে রাজধানীর সবকটি মণ্ডপে পূজা দেওয়া শুরু হয়। রাতভর সেভাবেই প্রস্তুতি নিয়েছে দর্শনার্থী ও ভক্তরা। কিন্তু তাদের সেই আয়োজনে বাধ সেধেছে বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতের টানা বর্ষণ আর তাতে জমে যাওয়া অলিগলির পানি। সারারাত ধরেই রাজধানীতে বৃষ্টি হওয়ায় নগরীর অলিগলি সব জায়গাতেই জমে যায় পানি। সকাল ৯টার মধ্যে বেশিরভাগ এলাকার পানি নেমে গেলেও পুরান ঢাকাসহ নিন্মাঞ্চলগুলোর পানি নামতে পারেনি। আর পানি নেমে যাওয়া এলাকাগুলোতেও জমে ছিল কাদা। ফলে মণ্ডপে যেতে আসতে ভক্ত-দর্শনার্থীদের দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে। দর্শনার্থীরা বলছেন, বৃষ্টির কারণে পূজার আনন্দে খানিকটা বিড়ম্বনা তৈরি হয়েছে।
অবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার (২৮ সেপ্টেম্বর) সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত নগরীতে এক মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টার পর থেকে শুক্রবার সকাল ৬টা পর্যন্ত ১১ ঘণ্টায় ৯৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এতে ঢাকার অধিকাংশ এলাকায় পানি উঠে গেছে। সকালেও নগরীর অধিকাংশ অলিগলি ও প্রধান সড়কে হাঁটু পরিমাণ পানি জমে থাকতে দেখা গেছে। এতে পূজা দিতে আসা ভক্তরাসহ দুর্ভোগে পড়েছেন নগরবাসী।
ধানমন্ডির সার্বজনীন পূজা মণ্ডপের পরিচালনা কমিটির কোষাধ্যক্ষ পার্থ প্রতিম দাস বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আজ প্রতিটি মণ্ডপের প্রধান আকর্ষণ আরতি প্রতিযোগিতা। দিনভর ভক্তরা পূজা দিয়ে সন্ধ্যায় এ প্রতিযোগিতায় যোগ দেবেন। রাতকে উজ্জ্বল করে ভক্তরা মেতে উঠবেন আরতি নিবেদনে।’
মণ্ডপ পরিচালনার দায়িত্বে থাকা এই ব্যক্তি আরও বলেন, ‘আজ (শুক্রবার) মহানবমীর আয়োজনে বিপুল পরিমাণ ভক্ত-দর্শনার্থীর প্রত্যাশা করেছিলাম। কিন্তু অন্যসব দিনের তুলনায় এদিন উপস্থিত বরং কম। সম্ভবত বৃষ্টির কারণেই তারা মণ্ডপে আসতে ভোগান্তিতে পড়ছেন। আজ সকালেও তো বৃষ্টি হয়েছে। অনেককেই বৃষ্টিতে ভিজে ছাতা মাথায় পূজা দিতে আসতে দেখা গেছে।’
মেরাদিয়া হিন্দুপাড়ার বাসিন্দা সমিরণ রায় বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গত রাতে পরিবার নিয়ে পূজা দিতে গিয়েছি। কিন্তু বৃষ্টির কারণে সবাই ভিজে গেছি। অনেকেই পূজা দিতে পারেনি। আজ পূজা দেয়ার শেষ দিন। কাল বিসর্জন। মনে করেছিলাম আজও গিয়ে পূজা দেবো। কিন্তু রাত থেকে টানা বৃষ্টি চলছে। এলাকার অলিগলিতে এখনও পানি জমে আছে। এখন পর্যন্ত বাসা থেকে বের হতে পারিনি।’
সারারাত বৃষ্টিতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। সাতসকালে অনেক কর্মজীবী মানুষ নিজ নিজ গন্তব্যে যাত্রা দিয়ে বিপাকে পড়েন। তবে শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটি থাকায় অন্যসব দিনের চেয়ে অফিসগামী মানুষ রাস্তায় কমই ছিলেন। সকালে নগরীর পূর্ব রামপুরা, বনশ্রী, দক্ষিণ বনশ্রী, খিলগাঁও, বাসাবো, মাদারটেক, যাত্রাবাড়ী, কমলাপুর ও নন্দীপাড়া, পুরান ঢাকার নাজিরাবাজার, বদরুন্নেছা সরকারি মহিলা কলেজ এলাকাসহ নগরীর কিছু কিছু স্থানে বৃষ্টির পানির সঙ্গে সেবা সংস্থাগুলোর উন্নয়ন কাজের খোঁড়াখুঁড়ির ফলে তোলা মাটি মিশে কাদায় পরিণত হয়েছে। এতে পথচারীকে দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে। এছাড়া, মিরপুর, শ্যামলী ও ধানমন্ডি ২৭ নম্বরসহ বিভিন্ন স্থানে পানি জমে থাকতে দেখা গেছে।
দুপুরে বান্ধবীদের নিয়ে পুরান ঢাকার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন পূজা মণ্ডপ ঘুরেতে এসেছেন পূজা রানী দাস। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রতিবছর পূজায় আমারা বান্ধবীরা মিলে অনেক মণ্ডপ ঘুরে বেড়াই। কিন্তু এবছর বাসা থেকে বের হয়েই দেখি রাস্তায় হাঁটু পানি। রিকশা সিএনজি কিছুই পাওয়া যায় না। পরে পানিতে ভিজে মণ্ডপ দেখতে বের হয়েছি। বৃষ্টি এবারের পূজার আনন্দ অনেকটাই মাটি করে দিয়েছে।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অতিরিক্ত প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা খন্দকার মিল্লাতুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গত রাত থেকে প্রচুর বৃষ্টি হয়েছে। পুরান ঢাকার জেলখানা রোডে পানি জমে গেছে। গ্রিনরোডেও পানি জমে থাকার খবর পেয়েছি। অনেকেই ফোন করে অভিযোগ করেছেন। দুয়েকটি স্থানে গাছপালাও ভেঙে পড়েছে। আমাদের কর্মীরা যথাসাধ্য এসব দুর্ভোগ কমানোর চেষ্টা করেছেন।’ তবে ওয়াসার আওতাধীন এলাকাগুলোতে সংস্থাটি কাজ করেনি বলেই এসব সমস্যা তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এদিকে আবহাওয়া অধিদফতরের কর্তব্যরত আবহাওয়াবিদ বজলুর রশীদ বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, শুক্রবার সকাল ৯টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে— রাজশাহী, রংপুর, ঢাকা, ময়মনসিংহ, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অধিকাংশ জায়গায় অস্থায়ী দমকা বা ঝড়ো হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। দেশের কোথাও কোথাও ভারি থেকে অতি ভারি বর্ষণ হতে পারে।
শুক্রবার দুপুর ১টা থেকে পরবর্তী ৬ ঘণ্টার জন্য ঢাকা ও আশপাশের এলাকার আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে— আকাশ আংশিক মেঘাচ্ছন্ন থাকতে পারে। হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। দক্ষিণ/দক্ষিণ-পূর্ব দিক থেকে ১০-১৫ কি.মি. বেগে বাতাস প্রবাহিত হতে পারে।








