রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ‘ইমারজেন্সি ল্যাট্রিন’: পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা

উদিসা ইসলাম
১৫ অক্টোবর ২০১৭, ০৮:০০আপডেট : ১৫ অক্টোবর ২০১৭, ০৮:০০

রোহিঙ্গা ক্যাম্প মিয়ানমারে নির্যাতনের শিকার হয়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য কক্সবাজারের বিভিন্ন ক্যাম্পে নির্মাণ করা হয়েছে ‘ইমারজেন্সি ল্যাট্রিন’। কিন্তু এই ল্যাট্রিনগুলোতে স্যুয়ারেজ না থাকায় আগামী তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে ব্যাপক পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন স্যানিটেশনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা। তারা বলছেন, একেতো স্যুয়ারেজ নেই, তার ওপর বিভিন্ন জায়গায় একটা মাত্র রিং দিয়েও টয়লেট বানানোয় এক মাসেই ক্যাম্পের আশেপাশের পরিবেশ দূষিত হতে শুরু করেছে।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ইমার্জেন্সি ল্যাট্রিন রোহিঙ্গাদের ক্যাম্প ঘুরে এসে বাংলা ট্রিবিউনের আলোকচিত্রী নাসিরুল ইসলাম জানান, বালুখালী ও ঠাঙখালী ক্যাম্পে এক-দুই বাড়ি পরপর পাঁচ রিংয়ের ল্যাট্রিন বানানো হয়েছে। প্রতি তিন বাড়ি, চার বাড়ি, পাঁচ বাড়ির জন্য বরাদ্দ একটি ল্যাট্রিন। একেকটি বাড়ির সদস্য সংখ্যা ছয় জনেরও বেশি। ক্যাম্পে প্রবেশের মুখেই দেখা যায়, টয়লেটগুলো ভরে যেতে শুরু করেছে।বাতাসে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।অনেক টয়লেট ইতোমধ্যে বন্ধ করে দিয়ে পাশেই আরেকটি বানানো হয়েছে।

এক-দুই রিং দিয়ে তৈরি ল্যাট্রিন ফটো সাংবাদিক নাসিরুল বলেন, ‘ক্যাম্পে বসবাসকারীরা অপর্যাপ্ত ল্যাট্রিনের কারণে খোলা জায়গায় টয়লেট করায় ছড়িয়ে পড়েছে দুর্গন্ধ।’

স্যানিটেশনের সঙ্গে সম্পৃক্ত সংস্থাগুলো বলছে, ইমারজেন্সি স্যানিটেশনের জন্য এটা ঠিক আছে। কিন্তু ছয় মাসের ব্যবধানে মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। এখনও মানুষ আসা অব্যাহত আছে। এসব ক্যাম্প থেকে কতদিনে রোহিঙ্গাদের সরানো হবে, বা স্থায়ী টয়লেট কতদিনে নির্মাণ করা সম্ভব হবে, সে পরিকল্পনা এখনও চূড়ান্ত না হওয়ায় শঙ্কা বাড়ছে।

কক্সবাজারে ছয় হাজার একর সংরক্ষিত বনাঞ্চল এবং পাহাড়ে এখন  রোহিঙ্গাদের বসতি৷ জমির পরিমাণ বেড়ে আট হাজার একর হওয়ার আশঙ্কা করছে বনবিভাগ৷ বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বন উজাড় করে এই বসতি স্থাপনের কারণে এখানকার পরিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্য মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে৷ বার বার বন উজাড়ের কথা বলা হলেও সেখানে অপরিকল্পিত স্যানিটেশনের কারণে বাতাস আর মাটি বিষাক্ত হয়ে উঠবে। এ বিষয়টি এখনও সংশ্লিষ্টদের নজরদারির বাইরে।

ক্যাম্পে ঘরের কাছেই তৈরি করা হয়েছে ল্যাট্রিন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া গত বুধবার (১১ অক্টোবর) সাংবাদিকদের জানান, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ৩৫ হাজার ল্যাট্রিন প্রয়োজন। সরকার ইতোমধ্যে সাত হাজারের বেশি ল্যাট্রিন নির্মাণ করেছে। অবশিষ্ট ল্যাট্রিন ইউএনএইচসিআর, আইওম ও অন্যান্য এনজিও নির্মাণ করবে। সেগুলো কনক্রিটের হবে উল্লেখ করে ইউনিসেফের সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মকর্তা ফারিয়া সেলিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,‘একটা-দুইটা রিং দিয়ে টয়লেট বানানো হয়েছে। ১০ হাজার ল্যাট্রিন বানানো হবে, যেগুলোতে সেনাবাহিনী কাজ করবে। ওরা কংক্রিট স্টাবলিশমেন্টে সেপটিক ট্যাংক নির্মাণ করবেন। তবে এগুলোর কাজ এখনও শুরু হয়নি।’

তিনি আরও বলেন, ‘জরুরি ভিত্তিতে পাঁচ রিং মানে পাঁচ ফিটের বেশি উচ্চতার জায়গা করে ল্যাট্রিন বানানো হয়ে থাকলে, সেটা গ্রহণযোগ্য। কিন্তু এক-দুই দিনের জন্য বানানো ল্যাট্রিন আমরা সমর্থন করি না। যদিও কেউ কেউ তা করেছে।’

রোহিঙ্গাদের জন্য নির্মিত ইমার্জেন্সি ল্যাট্রিন রাহিঙ্গাদের জন্য স্যাটিনেশন নিয়ে কক্সবাজারে কাজ করছেন ব্র্যাকের কর্মকর্তা মোরশেদ মঈন। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা পাঁচ হাজারের বেশি ল্যাট্রিন বানিয়ে দিয়েছি। রিং এর বিষয়টি মাটির ধরনের ওপর নির্ভর করে। মাটি খোড়ার পর পানি উঠে গেলে, কোথাও কোথাও দুটো রিং দিয়েও ল্যাট্রিন তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে।’

কোথাও একটি রিং দিয়ে ল্যাট্রিন তৈরি করা হয়েছে কিনা প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘একটি রিং দিয়ে বোধহয় কোথাও করা হয় নাই। দুই-তিনটা রিং দিতেই পানি উঠে গেছে এমন অনেক আছে।’ এই ল্যাট্রিন ব্যবহারে ভরে গেলে পরিবেশ বিপর্যয় ঘটবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ওই সময়ে যত তাড়াতাড়ি কাজটা করা দরকার ছিল, সে মোতাবেক করা হয়েছে। ইতোমধ্যে আমাদের ২৮টি টয়লেট ভরে গেছে। পাশেই আবার ২৮টি তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। যদি দ্রুত স্থায়ী কোনও ব্যবস্থা না করা যায়, তাহলে ক্যাম্পের পরিবেশ ও স্বাস্থ্য নিয়ে শঙ্কার কারণ আছে।’

ওয়াটার এইড -এর রোহিঙ্গা বিষয়ক প্রকল্প ব্যবস্থাপক জাহিদ মামুন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘২৪০টি ইমার্জেন্সি ল্যাট্রিনের কাজ চলছে। আধা টন ব্লিচিং পাউডার দেওয়া হয়েছে। যাতে পরিবেশের ক্ষতি না হয়। এখন জরুরি পরিস্থিতি। কিছু কিছু সংস্থা একটা রিং বসিয়ে দিয়েই বলার চেষ্টা করছে, অনেক বেশি জায়গাজুড়ে তারা কাজটা করেছে। এই সংখ্যা বাড়াতে গিয়ে বাস্তবে এসব খুব কাজে লাগছে না। এই দফায় যা করা হয়েছে স্যানিটেশনের জন্য সেটি যদি দীর্ঘমেয়াদে চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়, সেটি হবে ভয়ঙ্কর। যেকোনও সময় ময়লা উপচে পড়বে এবং যথাযথভাবে ঢেকে না দেওয়ার কারণে বাতাস দূষিত হবে।’

কাছাকাছি  ঘর, গোসলখানা ও ল্যাট্রিন দীর্ঘদিন স্যানিটেশন নিয়ে কাজ করছেন পাবলিক হেল্থ প্র্যাকটিশনার সঞ্জয় মুখার্জি। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘এই রিংগুলো ভরে গেলে বিপর্যয় নেমে আসবে। মনে রাখা দরকার, উদ্বাস্তুদের জন্য জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা করতে হয়। প্রাইভেসি ডিগনিটি বোধ ও পরিবেশের কথা ভেবে ঠিক আছে। ম্যাক্সিমাম তিন থেকে চার মাসের জন্য সামাল দেওয়া গেলেও ছয় মাস পর এসব আর কাজে আসবে না।’

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মী গওহার নঈম ওয়ারা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এসব ঠাণ্ডা মাথায় পরিকল্পনা না করার ফল।এখনও হাজার হাজার লোক ওই দেশ থেকে আসছে। নো ম্যান্স ল্যাণ্ডে অপেক্ষা করছে অনেকে। আমরা যদি ভাবি, কোনও একদিন সকালে উঠে দেখব, রোহিঙ্গারা চলে গেছে তাহলে ভুল হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্রথম দিকে দু’টি রিং বসিয়ে দিয়েছিল। সেটা হয়তো ঠিক ছিল। এখনতো পরিস্থিতি সেখানে নেই।’

গওহার নঈম ওয়ারা বলেন, ‘যথাযথ ব্যবস্থাপনার জন্য এদের (রোহিঙ্গাদের) এই এক জায়গায় রাখা সম্ভব না। কোনও মানুষকে এক জায়গায় রাখবেন,আর দূরে ল্যাট্রিন বানাবেন, তা তো হবে না। পাশেই রাখতে হবে। ফলে অবশ্যই এত ছোট পরিসরে এত মানুষকে রাখা যাবে না।’

ছবি: নাসিরুল ইসলাম

/এপিএইচ/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম