রাজধানীর বনশ্রী আবাসিক এলাকার জি-ব্লকের ৬ নম্বর সড়কের মোড়ে অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে একটি স’মিল। এখানে রাত-দিন গাছ চেরানোর শব্দে দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয়রা। তাদের অভিযোগ, এ কারণে ঘরে একে-অন্যের কথা পর্যন্ত শোনেন না।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এখানে গভীর রাতে ট্রাকে গাছ ও কাঠ ওঠানো-নামানো হয়। গাছভর্তি ট্রাক প্রবেশের পাশাপাশি কাঠবোঝাই ট্রাকও বের হয়। এসব কাজের সময় বিকট শব্দ হয়। এ কারণে তাদের ঘুমে এবং স্কুল-কলেজ পড়ুয়া ছাত্রছাত্রীদের পড়ালেখায় ব্যাঘাত ঘটে। সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে অভিযোগ জানিয়েও কোনও প্রতিকার মেলেনি বলে দাবি করেন তারা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বনশ্রী কল্যাণ সমিতির সদস্য কামাল ভূঁইয়া অবৈধভাবে এই স’মিল গড়ে তুলেছেন। স্থানীয়রা জানান, ওই ব্যক্তি নিজেকে বনশ্রী কল্যাণ সমিতির নেতা ও স্থানীয় কাউন্সিলরের আত্মীয় দাবি করেন। তবে স্থানীয় কাউন্সিলর মো. মাকসুদ হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, এই নামে তিনি কাউকে চেনেন না।
কাউন্সিলর আরও বলেন, “আমি খবর নিচ্ছি। যদি ওই এলাকায় এমন কোনও স’মিল থেকে থাকে, তাহলে সিটি করপোরেশনের আঞ্চলিক অফিস থেকে নোটিশ পাঠানো হবে। মিল মালিকের কোনও ট্রেড লাইসেন্স আছে কিনা তা দেখবে। থাকলে আবাসিক এলাকায় কিভাবে তাকে ট্রেড লাইসেন্স দেওয়া হলো, সেই বিষয়ে খোঁজ নেবো। যদি তার ট্রেড লাইন্সেস না থাকে, তাহলে মিল উচ্ছেদ করা হবে।’
সালমান নামে স্থানীয় একজন বলেন, “এই স’মিলের কারণে রাতে ঘুমাতে পারি না। গভীর রাতে ট্রাকভর্তি গাছ এনে এই মিলে ফেলা হয়। গাছ ফেলার শব্দে ঘুম ভেঙে যায়। এছাড়া রাতদিন কাঠ চেরানোর শব্দে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছি। বারবার অভিযোগ করেও কোনও প্রতিকার পাওয়া যাচ্ছে না।”
পাশের ভবনের বাসিন্দা শারমিন আক্তার বলেন, ‘মিলের শব্দে বাসায় একে-অন্যের সঙ্গে কথা বললে তা শোনা যায় না। বাচ্চাদের পড়াতে পারি না। বাড়ির মালিকের কাছে বারবার অভিযোগ দিলেও কোনও সমাধান দিতে পারছেন না তিনি। এখন বাসা ছেড়ে দেওয়ার চিন্তাভাবনা করছি।’
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে স’মিল মালিক কামাল ভূঁইয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এটা আবাসিক এলাকা না। আমার মিল মেরাদিয়া হিন্দুপাড়ায় অবস্থিত। আমার ট্রেড লাইসেন্স রয়েছে। সিটি করপোরেশন আমাকে ট্রেড লাইসেন্স দিয়েছে।’
তবে তার এই বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তবতার কোনও মিল পাওয়া যায়নি। তার মিলটি আগে মেরাদিয়ার হিন্দুপাড়ায় ছিল। সেখান থেকে এটি স্থানান্তর করে বনশ্রীর জি-ব্লকের ৬ নম্বর সড়কের মোড়ে নিয়ে আসা হয়েছে।
কামাল ভূঁইয়া আরও বলেন, ‘আমার মিল নিয়ে খবর প্রকাশ করতে হলে আপনাকে পুরো বনশ্রী এলাকা নিয়ে লিখতে হবে। কারণ নিয়ম অনুযায়ী আবাসিক এলাকায় কোনও দোকান, খাবার হোটেল, মিল-কারখানা, পোশাক কারখানা থাকতে পারবে না। কিন্তু বনশ্রী এলাকায় সবই আছে। আবাসিক এলাকা দিয়ে হাইওয়ে করা হয়েছে। এটা আমাদের দেশের বাস্তবতা। এটা মেনে নিতে হবে। আমি তো শুধু একাই অপরাধ করছি না, অন্যরাও একই অপরাধ করছে। আমি এই এলাকার ছেলে। এই মিলের পেছনে ৪০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছি।’
স’মিলের কারণে আশপাশের কিছু পরিবারের সমস্যা হচ্ছে বলে মেনে নিয়েছেন এই ব্যবসায়ী। তার ভাষ্য, ‘আমার মিল কখনও রাতে চলে না। মাসে মাত্র তিন দিন ট্রাকভর্তি গাছ আসে। এখন এই আবাসিক এলাকা ছাড়া অন্য এলাকাগুলোতে কি রাতে বড় বড় ট্রাক ঢোকে না? এরপরও যদি মানুষের সমস্যা হয়, তাহলে গাছ ফেলার সময় যেন শব্দ না হয় সেদিকে সজাগ থাকতে বলবোকর্মচারীদের।’
তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে স’মিলের একজন কর্মচারী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আসলে এভাবে আবাসিক এলাকার মধ্যে মিল গড়ে উঠতে পারে না। রাতে ভর্তি ট্রাক খালি করার সময় অনেক শব্দ হয়। মানুষ ঘুমাতে পারে না। লোকজন এসে শুধু আমাদের ধমকায়। আমরা তো কর্মচারী। আমরা মালিককে জানিয়েছি। এটা তার বিষয়। তিনি যে সিদ্ধান্ত নেবেন আমরা তাই করবো।’
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে দক্ষিণ সিটির করপোরেশনের অঞ্চল-২-এর নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবু নাঈম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “আবাসিক এলাকায় কোনোভাবেই স’মিল পরিচালনা করা বৈধ নয়। কালই আমাদের ইন্সপেক্টরকে পাঠাচ্ছি। অভিযোগ প্রমাণিত হলে ট্রেড লাইসেন্স বাতিলের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’








