আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি জয়নুল আবেদীনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এর অনুসন্ধান বন্ধে সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া চিঠির বৈধতা নিয়ে জারি করা রুলের দ্বিতীয় দিনের শুনানি অনুষ্ঠিত হয়েছে।
মঙ্গলবারের শুনানিতে দুদকের কাজের গতি এবং তথ্য বিবরণী ফরমের কিছু বিষয় নিয়ে মন্তব্য করেছেন আদালত।
এ সময় আদালত বলেছেন, কবে কত টাকার বাজার করলাম, মুরগি কিনলাম তিনশ’ টাকায়, মাছ কিনলাম চারশ’ টাকায়, দৈনন্দিন বাজারের হিসাবও রাখতে হবে, এমন প্রশ্ন তুলেছেন আদালত।
মঙ্গলবার (২৪ অক্টোবর) বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি সহিদুল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ মন্তব্য করেন।
মঙ্গলবার দুপুরে এ সংক্রান্ত মামলার কার্যক্রম শুরু হলে প্রথমেই বিচারপতি জয়নুল আবেদীনের পক্ষের আইনজীবী ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেন দাঁড়িয়ে বলেন, ‘দুদকের পাঠানো প্রথম চিঠির পর সব কাগজ-পত্র দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। এই আদালতের সামনে যে চিঠি দেওয়া হয়েছে, সেটি দ্বিতীয়বারে পাঠানো।’
তিনি বলেন, ‘এই চিঠির পরও সব তথ্য সরবরাহ করা হয়েছে। এই চিঠির আর কার্যকারিতা নেই।’
ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেন বলেন, ‘এমন না যে, বিচারপতি জয়নুল আবেদীন প্রধান বিচারপতির ভাই বা আত্মীয়। এখানে প্রধান বিচারপতির (সুরেন্দ্র কুমার সিনহা) ব্যক্তিগত কোনও লাভ নেই। তিনি বিচার বিভাগের অভিভাবকের মতো কাজ করেছেন। এখানে অসৎ উদ্দেশ্যের প্রশ্নই আসে না।’
এ সময় তিনি বিচারপতি জয়নুল আবেদীনের পক্ষে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন এবং তা থেকে কিছু অংশ পাঠ করে শোনান।
এরপর তিনি বলেন, ‘দুদক অনুসন্ধান কার্যক্রম নিয়ে বিভিন্ন সময় সাংবাদিকদের তথ্য দিয়ে থাকে। মূলত মিডিয়া ট্রায়ালের জন্য তারা এটা করে।’
ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেনের বক্তব্যের পর দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান আদালতকে বলেন, ‘আমি জবাব দেবো।’
তখন আদালত বলেন, ‘এটার জবাব দেওয়ার সুযোগ নেই। আপনার কোনও শুনানি থাকলে সেটা বলতে পারেন। তবে তার আগে আমাদের কয়েকটি প্রশ্নের জবাব দেন…।’
এ সময় আদালত দুদকের আইনজীবীর কাছে জানতে চান, ‘আপনাদের যে সম্পদ বিবরণীর ফরম আছে। তাতে দেখা যায়, হিসাব বিবরণকারীর সন্তানেরা যে বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয় বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছে তার তথ্যও চেয়েছেন, এটা কেন চান?’
আদালতের এ প্রশ্নের জবাবে দুদক আইনজীবী খুরশিদ আলম খান বলেন, ‘এটার প্রয়োজন পড়ে।’
আদালত আবার প্রশ্ন করেন, ‘এটা কি কেউ অনুসরণ করে?’
জবাবে দুদক আইনজীবী বলেন, ‘আমার ছেলে স্কলাস্টিকা স্কুলে পড়ে। আমি তো তার সব তথ্যই রাখি।’
তখন আদালত বলেন, ‘আপনি দুদকের আইনজীবী তাই হয়তো রাখেন। ৩৫ বছর আগে কেউ একজনের ছেলে প্রাইমারি স্কুলে পড়েছে, তার হিসেব কি কেউ রাখে? আপনি এমন একটা তথ্য চাচ্ছেন- যা অবাস্তব। ধরেন কোনও একজন ব্যক্তি মসজিদ, মাদ্রাসা, ক্লাবে চাঁদা দেন, সেটার রশিদ কি কেউ রাখেন? মোটা অংকের টাকা দিলে কেউ হয়তো হিসাব রাখতে পারেন। সামান্য অংকের টাকা দিলে কি কেউ রাখেন ?’
দুদক আইনজীবীর জবাব, ‘স্বচ্ছতার স্বার্থেই রাখা প্রয়োজন এবং দুদক সেটা চেয়ে থাকে।’
আদালত বলেন, ‘কেউ সামাজিক অনুষ্ঠানে সামান্য টাকা ব্যয় করলো, সেটার হিসাব রাখতে হবে?’
এর জবাবে দুদকের আইনজীবী একই উত্তর দেন।
এ সময় আদালত কিছুটা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘কবে কত টাকার বাজার করলাম, মুরগি কিনলাম তিনশ’ টাকায়, মাছ কিনলাম চারশ’ টাকায়- এরকম দৈনন্দিন বাজারের হিসাবও রাখতে হবে? তদন্ত করার অনেক পদ্ধতি আছে। তাই বলে কি এভাবে! এটা অবাস্তব! বাস্তবতার নিরিখে বিষয়টি দেখুন। আপনারা ব্যাংক অ্যাকাউন্টের হিসাব চাইছেন, সেটা চাইতেই পারেন। তবে তথ্য ফরমেট ৬, ৭, ১১ ও ১২ ক্রমিকে যা চাচ্ছেন, তা বাস্তব সম্মত না।’
আদালতের এ মন্তব্যের পরে দুদক আইনজীবী খুরশিদ আলম খান বলেন, ‘এই ফরম নিয়ে আদালতের অভিমত কমিশনকে জানানো হবে।’
তিনি বলেন, ‘এই ব্যক্তির (বিচারপতি জয়নুল আবেদীন) বিরুদ্ধে এখনও কোনও মামলা হয়নি। তাই তাকে নির্যাতন করা হচ্ছে বলে যে অভিযোগ, তা সত্য নয়।’
দুদক মিডিয়া ট্রায়াল করে, ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনের এমন বক্তব্যের বিরোধিতা করে দুদক আইনজীবী বলেন, ‘এটা কোনও মিডিয়া ট্রায়াল না। সাংবাদিকরা তথ্য চাইলে দুদক তা দিতে বাধ্য। সাংবাদিকদের চাওয়ার প্রেক্ষাপটে দুদক সময় সময় তথ্য সরবরাহ করে থাকে ।’
খুরশীদ আলম খান বিচারপতি জয়নুল আবেদীন সম্পর্কে বলেন, ‘নোটিশের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১০ সালের ৮ আগস্ট বিচারপতি জয়নুল আবেদীন দুদকে সম্পদ বিবরণী দাখিল করেন। এই বিবরণী পাওয়ার পর দুদকের অনুসন্ধানে দেখা যায়, ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে বেশ কিছু টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে। এগুলো আমেরিকা, মালয়েশিয়া , সুইজারল্যান্ডসহ কয়েকটি দেশে পাচার করেছেন তিনি। এর সত্যতা জানার স্বার্থেই অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে চিঠি দেয় দুদক। সেই চিঠির এখনও জবাব পাওয়া যায়নি।’ তবে সার্বক্ষণিকভাবে দুদক অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে চলেছে বলেও জানান তিনি।
তিনি বলেন, ‘বিদেশে পাচার করা অর্থের তথ্য খুব দ্রুত পাওয়া সম্ভব না।’
এসময় খুরশীদ আলম খান অর্থপাচার রোধ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক একটি আইনের উল্লেখ করে বলেন, ‘যে প্রক্রিয়ায় এ তথ্য পাওয়া যায়- তা সময়সাপেক্ষ। এগুলো প্রয়োজন পড়ে এ কারণে যে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দাখিল করা সম্পদ বিবরণীর সঙ্গে সুক্ষ্মভাবে মিলিয়ে দেখার জন্য এবং সতর্কভাবে দেখার জন্যই প্রয়োজন পড়ে।’
তখন আদালত বলেন, ‘এত সতর্কভাবে করছেন যে, একজন ব্যক্তিকে ১০ বছর ঝুলিয়ে রেখেছেন। অনুসন্ধানের নামে বছরের পর বছর ঝুলিয়ে রাখা হচ্ছে। আবার আপনারা মিডিয়াকেও তথ্য দেন ওই ব্যক্তি সম্পর্কে। এভাবে চললে তো মিডিয়া ওই ব্যক্তিকে শেষ করে ফেলবে। তাই এই প্রক্রিয়ায় আপনারা অনুসন্ধান না করে, যাকে নোটিশ দেবেন, তাকে নোটিশ দেওয়ার আগে তার বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করে নেবেন। তাহলে তো আর হয়রানির শিকার হতে হবে না।’
আদালত বলেন, ‘বিচারপতি জয়নুল আবেদীন সম্পদ বিবরণী দাখিল করেছেন ২০১০ সালের ৮ আগস্ট। আর আপনারা সেই তথ্য জানার জন্য সুপ্রিম কোর্টকে চিঠি দিচ্ছেন চলতি বছরের ২ মার্চ। এইটুকু তথ্য জানতে আপনাদের সাত বছর সময় লাগলো। আপনারা তো ওই সময়ই সুপ্রিম কোর্টকে চিঠি দিতে পারতেন।’
জবাবে দুদক আইনজীবী বলেন, ‘একটি মহৎ উদ্দেশ্যে চিঠি দেওয়া হয়েছে। একজন বিচারপতির সম্পদের হিসাব খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলেই সময় লেগেছে।’
এ সময় আদালত এক ধরনের উষ্মা প্রকাশ করে বলেন, ‘আপনারা যদি এই গতিতে চলেন, তাহলে দেখা যাবে আরেকটা তথ্যের জন্য ২০২৪ সালে গিয়ে আরেকটা নোটিশ দিচ্ছেন। আসলে দুদক এক্সপ্রেসের মতো চলছে না। দুদক চলছে কচ্ছপ গতিতে।’
জবাবে খুরশীদ আলম খান বলেন, ‘ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠিত করতে হলে সময় লাগবে। রাতারাতি কিছু হবে না।’
দুদকের আইনজীবীর এমন বক্তব্যে আদালত ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘একটি লোককে সম্পদের হিসাব চেয়ে নোটিশ দিলেন ১০ বছর আগে। আপনারা ১০ বছর ধরে অনুসন্ধান করতে থাকলেন। যে ব্যক্তির বিষয়ে অনুসন্ধান করতে থাকলেন, সে ব্যক্তির অবস্থাটা কী দাঁড়ালো? তার যদি ডায়াবেটিকস নাও থাকে, তাহলে আপনাদের অনুসন্ধানের কারণে ডায়াবেটিকস হয়ে যাবে, প্রেশার না থাকলেও প্রেশার বেড়ে যাবে। একটি লোক প্রতিদিন ঘুমানোর আগে এবং ঘুম থেকে ওঠার পর যদি চিন্তা করে দুদক তার বিরুদ্ধে অনুসন্ধান করছে, তাহলে এর চেয়ে মানসিক হয়রানির আর কী আছে? একটা সময় হয়তো এই লোক হার্ট অ্যাটাক করবেন।’
এরপর অ্যামিকাস কিউরি অ্যাডভোকেট প্রবীর নিয়োগী আদালতকে বলেন, ‘আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান। সেই দৃষ্টিতে কোনও ব্যক্তি দায়মুক্তি পেতে পারেন না। সাবেক বিচারপতির ক্ষেত্রে আলাদা বলে কোনও আইন নেই। তাই সুপ্রিম কোর্টের এই চিঠি সংবিধান এবং আইনবহির্ভুত। সুপ্রিম কোর্ট চিঠিতে যে ভাষা ব্যবহার করেছে, তা আইন বহির্ভুতভাবে করা হয়েছে। কোনও প্রতিষ্ঠান এভাবে বলতে পারে না।’
এসময় আদালত তার কাছে জানতে চান, ‘সুপ্রিম কোর্টের এই চিঠির বিচার করার এখতিয়ার হাইকোর্টের আছে কিনা।’
জবাবে প্রবীর নিয়োগী বলেন, এটা প্রধান বিচারপতির প্রশাসনিক আদেশ। সুতরাং প্রশাসনিক আদেশের বিচার করার এখতিয়ার হাইকোর্টের রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
এরপর দ্বিতীয় অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে এ এম আমিনউদ্দিন বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্ট আইনগতভাবে এ ধরনের চিঠি দিতে পারে না। প্রধান বিচারপতি হলেও এ জাতীয় অভিমত তিনি দিতে পারেন না। একজন বিচারপতি দায়মুক্তি পেতে পারেন না।’
এ সময় তিনি সাবেক রাষ্ট্রপতি হোসেইন মুহাম্মদ এরশাদের জনতা টাওয়ার মামলার উদাহরণ টেনে বলেন, ‘এই মামলায় এরশাদের সাজা হয়েছে। আপিল বিভাগ সে সাজা বহাল রেখেছে। তিনিতো রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থায় প্লট বরাদ্দ নিয়ে একটি আদেশ দিয়েছিলেন। সে আদেশের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল, যেটি জনতা টাওয়ার মামলা নামে পরিচিত। এই মামলায় একজন রাষ্ট্রপতিকেও দায়মুক্তি দেওয়া হয়নি। তাই একজন বিচারপতি যদি অপরাধ করে থাকেন, তবে তিনি দায়মুক্তি পেতে পারেন না।’
এরপর তৃতীয় অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন মঙ্গলবার আদালতে উপস্থিত না থাকায় রুলের পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ৩১ অক্টোবর তারিখ ধার্য করে এ মামলার কার্যক্রম মূলতবি করা হয়।
উল্লেখ্য, গত ৯ অক্টোবর আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি মো. জয়নুল আবেদীনের বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান বন্ধে সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া চিঠি কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না , তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন আদালত। একই সঙ্গে এ রুল শুনানির জন্য তিন জন অ্যামিকাস কিউরি নিয়োগ দেয় হাইকোর্ট।
আরও পড়ুন:
দুদকের কাজ চলে কচ্ছপ গতিতে: হাইকোর্ট








