গাজীপুরের লাক্সমা সোয়েটারের শ্রমিকদের বেতন আদায়ের চেয়ে আন্দোলনে বেশি মনোযোগী গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন। কয়েকদিন ধরে লাক্সমার শ্রমিকরা রাজধানীতে বিজিএমইএ ভবনের সামনে অবস্থান নিয়ে বকেয়া বেতনের জন্য আন্দোলন করছেন। সহযোগিতার নামে তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছে শ্রমিক অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন। অভিযোগ উঠেছে, শ্রমিকদের বেতন আদায় করে দেওয়ার চেয়ে আন্দোলন দীর্ঘায়িত করার দিকেই বেশি আগ্রহী ওই ট্রেড ইউনিয়নের নেতারা।
অভিযোগ উঠেছে, ইউনিয়ন নেতারা সমস্যা সমাধানে যথাযথ পদক্ষেপ না নিয়ে শ্রমিকদের দিয়ে আন্দোলন বেগবান করার চেষ্টা করছেন। মালিকপক্ষ যথাসম্ভব দ্রুত বকেয়া বেতন পরিশোধ করে দেওয়ার প্রতিশ্রতি দিলেও ট্রেড ইউনিয়ন নেতারা একের পর এক কর্মসূচি দিয়ে যাচ্ছেন। চলমান স্বাভাবিক পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করার জন্য এ আন্দোলনকে ভিন্নপথে প্রবাহিত করার চেষ্টা চলছে বলে মনে করা হচ্ছে।
তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর নেতা এবং ওই কারখানার মালিকপক্ষের দাবি, লাক্সমা সোয়েটার লিমিটেডের মালিক বকেয়া বেতন পরিশোধের জন্য তারিখ দিয়েছেন। কিন্তু শ্রমিকরা সেটা মানছেন না। এমনকি তারা কারখানার মালিকের সঙ্গে একবারও যোগাযোগ করেননি। উল্টো তারা গাজীপুরের ডিসি অফিস, কাওরান বাজারে কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদফতর, বিজিএমইএ ভবনের সামনে আন্দোলন করে বেড়াচ্ছেন। এ আন্দোলনকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আখ্যা দিয়ে বিজিএমইএ নেতারা বলছেন, শ্রমিকদের উসকানি উসকানি দিয়ে আন্দোলন করিয়ে তৈরি পোশাকশিল্প খাত তথা দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করার অপচেষ্টা চলছে।
তবে গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়নের দাবি, তাদের এ আন্দোলন যৌক্তিক। শ্রমিকদের অধিকার আদায়ে তারা আন্দোলন করে যাচ্ছেন। বকেয়া বেতন আদায় ও হঠাৎ করে প্রতিষ্ঠান বন্ধের প্রতিবাদে আন্দোলন করা হচ্ছে। সংবিধান ও আইএলও কনভেনশন অনুসারে শ্রম আইন ও বিধিমালা সংশোধনের দাবিতে আন্দোলন করছেন তারা।
লাক্সমা সোয়েটার লিমিটেডের চেয়ারম্যান সাফিনা রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি অনেক আগেই বলেছি, বকেয়া বেতন পরিশোধ করে দেবো। আমরা একটি তারিখও দিয়েছি। সেই তারিখ এখনও পার হয়নি। তারপরও শ্রমিকদের উসকে দিয়ে আন্দোলন করানো হচ্ছে।’ কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা চলছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘এখানে নিশ্চয় অন্য কোনও গোষ্ঠী শ্রমিকদের দিয়ে আন্দোলন করে ফায়দা লুটতে চাচ্ছে। কারণ, তারা সমস্যা সমাধান করতে চাইলে সবার আগে আমার সঙ্গে কথা বলবে। কিন্তু তারা সেটা না করে বিভিন্নস্থানে গিয়ে আন্দোলন করছে। নেতারা একবারও আমার সঙ্গে কথা বলতে আসেননি। তারা আসলেই সমাধান চান কিনা এ নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।’
একই কথা বলেন তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মো. সিদ্দিকুর রহমান। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শ্রমিকদের বেতন পরিশোধের কথা দিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির মালিক। তারপরও শ্রমিকদের দিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন শ্রমিক সংগঠনের নেতারা। তারা উসকানি দিয়ে শ্রমিকদের আন্দোলন করাচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা শ্রমিক নেতাদের বকেয়া বেতন পরিশোধ করা হবে বলে জানিয়েছি। আর মালিক যদি কারখানা বন্ধ করে দিতে চান তাহলে সে ব্যাপারেও শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা করে সমস্যা সমাধান করা হবে। কিন্তু এসব কথার কিছুই না শোনে শ্রমিক নেতারা আন্দোলন অব্যাহত রেখে পাবলিক সেন্টিমেন্ট আদায়ের চেষ্টা করছেন।’
তবে গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়নের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক মঞ্জুর মঈন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মালিকপক্ষ বারবার এ ধরনের আশ্বাস দিয়েছে। কিন্তু তারা কথা রাখেনি। আমরা তাদের কথার ওপর আস্থা রাখতে পারছি না। আমাদের আন্দোলন চলবে। শুধু বকেয়া বেতন দিলেই হবে না, কারখানা বন্ধ করা হলে সব পাওনা পরিশোধ করতে হবে। তা না হলে আন্দোলন চলবে।’
আন্দোলনের অংশ হিসেবে আগামীকাল বুধবার (২৯ নভেম্বর) শ্রম মন্ত্রণালয় ঘেরাওয়ের কর্মসূচি দেওয়া হয়েছে বলে জানান গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক জলি তালুকদার। তিনি বলেন, ‘আমাদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে কর্তৃপক্ষের টনক নড়ছে না। তাই আমরা কঠোর আন্দোলনের দিকে যেতে বাধ্য হচ্ছি।’
গত ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত লাক্সমা সোয়েটার লিমিটেডে কাজ করেছেন শ্রমিকরা। ৩০ অক্টোবর হঠাৎ করেই কারখানাটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর আন্দোলনে নামেন প্রতিষ্ঠানটির শ্রমিকরা। এরইমধ্যে এক হাজার ১০০ শ্রমিকের মধ্যে প্রায় ৬০০ জনের বেতন পরিশোধ করেছে মালিকপক্ষ। বাকিদের বেতন গত ২৩ নভেম্বর পরিশোধের কথা ছিল। কিন্তু সেদিন মালিকপক্ষ বকেয়া বেতন পরিশোধ করতে পারেনি। পরে তারা এ মাসের ৩০ তারিখ আরও একটি দিন ধার্য করেন। কিন্তু মালিকের দেওয়া তারিখের ওপর আস্থা রাখতে না পেরে গত ২৬ নভেম্বর থেকে লাগাতার অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন শ্রমিকরা। এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছে গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন। গাজীপুর থেকে বাস ভাড়া করে শ্রমিকদের আনা, তাদের দুপুর, রাতের খাবার ও রাতে থাকার ব্যবস্থাও করছে এই ট্রেড ইউনিয়ন।
আরও পড়ুন:
থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে আন্দোলন চাঙা রাখছে শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন








