
বাংলাদেশি ডাক্তারদের প্রতি অনাস্থা তৈরি হওয়ায় চিকিৎসার জন্য বিদেশে ছুটছেন রোগীরা। বিশেষ করে ভারত, থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা নিতে যাচ্ছেন রোগীরা।
২০০১ সালে রাজধানী ঢাকার একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পরীক্ষা করার পর সুরাইয়া বেগমের (৩৫) গর্ভাশয়ে টিউমার ধরা পরে। পরে চিকিৎসকের পরামর্শে তিনি অস্ত্রোপচার করে গর্ভাশয় (ovary) ফেলে দিতে বাধ্য হন। পরে গুরুতর স্ত্রীরোগ ও ডায়বেটিস সমস্যার কারণে তাকে কলকাতায় স্থানানন্তর করা হয়। সেখানকার বিশেষজ্ঞ ডাক্তারা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তাকে জানান, তার শরীরে যে আগে যে অপারেশন করা হয়েছে তা অপ্রয়োজনীয় এবং তার এ সমস্যার জন্য ওষুধ খেলেই হতো।
এছাড়াও ঢাকার একটি সরকারি হাসপাতালে পরিবার পরিকল্পনার বিষয়ে আলোচনা করতে যান নব দম্পতি সোনিয়া ও রাজন আহমেদ (ছদ্মনাম)। এ সময় ডাক্তার সোনিয়াকে যতদ্রুত সম্ভব সন্তান নেওয়ার পরামর্শ দেন। কারণ হিসেবে ডাক্তার জানান, তার গর্ভাশয় ধীরে ধীরে ক্যান্সার আক্রান্ত হতে পারে। এ খরবে ওই দম্পত্তি বেশ বিস্মিত হন।
এ বিষয়ে সোনিয়া বলেন, ‘টেস্টের রিপোর্ট দেখে ডাক্তার আমাকে দ্রুত সন্তান নেওয়ার পরামর্শ দেন। কারণ, তারা সিজারের সময় আমার গর্ভাশয় ফেলে দেবেন বলে জানান।’
ডাক্তারের এমন পরামর্শে বিস্মিত হয়ে সোনিয়া একজন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যান। পরে তিনি বিভিন্ন টেস্টের রিপোর্ট পর্যালোচনা করে তাকে জানান, এ বিষয়ে তার উদ্বেগের কোনও কারণ নেই। দেশের দুই ডাক্তারের কাছ থেকে দুই ধরনের পরামর্শ পেয়ে ওই দম্পতি রোগ নির্ণয় ও উন্নত চিকিৎসার জন্য এখন কলকাতায় যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন।
তাদের মতো হাজার হাজার রোগী প্রতিমাসে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাচ্ছেন। যাদের কাছে বিদেশ যাওয়ার কোনও বিকল্প নেই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চিকিৎসা খাতের একজন স্টেকহোল্ডার বলেন, ‘মূলত স্থানীয় ডাক্তারদের প্রতি আস্থাহীনতা ও ত্রুটিপূর্ণ রোগ নির্ণয় ব্যবস্থার কারণে বাংলাদেশের রোগীদের একটি বড় অংশ উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাচ্ছেন। বিশেষ করে ক্যান্সার, কার্ডিয়াক রোগ, অটিজম, সন্তান জন্মদানে অক্ষমতা এবং মেডিক্যাল পরীক্ষার জন্য।’
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ,স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ,বিদেশি বিশেষজ্ঞ হাসপাতালের প্রতিনিধি এবং রোগীরা জানান,বাংলাদেশের অনেক রোগী জীবন ও স্বাস্থ্য নিয়ে কোনও ঝুঁকি নিতে চান না। ফলে তারা উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যান। আর এ হার বেশ ঊর্ধ্বমুখী।
রোগীরা কোথায় এবং কেন যাচ্ছেন:
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব হেলথ ইকোনোমিকসের পরিচালক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, ‘বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশি রোগীদের প্রথম পছন্দ প্রতিবেশী দেশগুলো। দীর্ঘদিন ধরে পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ব্যয় কম হওয়ায় রোগীরা ভারত, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় চিকিৎসা নিতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।’
ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের এক হিসাব মতে, চলতি বছরের (২০১৭) শুরু থেকে গত অক্টোবর মাস পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে এক লাখ ৩০ হাজার রোগী চিকিৎসা নিতে ভিসা নিয়ে ভারতে গেছেন। যা আগের বছরের (২০১৬) একই সময়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
ভারতের কমার্শিয়াল ইনটেলিজেন্স অ্যান্ড স্ট্যাটিসটিকসের মহাপরিচালকের নেতৃত্বে স্বাস্থ্য সেবা রফতানির বিষয়ে পরিচালিত এক জরিপে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৪ লাখ ৬০ হাজার জন বিদেশি রোগী ভারতের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। যাদের মধ্যে বাংলাদেশি রোগীর সংখ্যা এক লাখ ৬৫ হাজার। মজার বিষয় হলো, বাংলাদেশ থেকে এতো রোগী ভারতে গিয়ে চিকিৎসা নিলেও ঢাকার হাইকমিশন থেকে ওইবছর মাত্র ৫৮ হাজার চিকিৎসা ভিসা ইস্যু করা হয়।
ওই জরিপে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ভারতে বিদেশি রোগীদের মধ্যে ৩৫ শতাংশই বাংলাদেশি এবং দেশটির মেডিক্যাল ট্যুরিজম খাতের অর্ধেক আয় (৫০ শতাংশ) আসে বাংলাদেশি রোগীদের কাছ থেকে। যা ভারতের মেডিক্যাল অ্যান্ড হেলথ ট্যুরিজম খাতের সবচেয়ে বড় অবদানকারী।
বাংলাদেশে ভারতকেন্দ্রিক চিকিৎসাসেবা প্রদানকারী ভ্রমণ কোম্পানি আহোয় (Ahoy) বাংলাদেশ লিমিটেডের হিসাব অনুযায়ী, প্রতিমাসে ৩০০-৪০০ জন রোগী ভারতে চিকিৎসা নিতে তাদের মাধ্যমে ভিসার আবেদন করেন।
ভারতে বাংলাদেশি রোগীদের পছন্দের হাসপাতালগুলো মধ্যে রয়েছে, টাকা মেমোরিয়াল হাসপাতাল, ক্রিশ্চিয়ান মেডিক্যাল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতাল, অ্যাপোলো হাসপাতাল, ইন্ডিগো উইমেনস সেন্টার, এশিয়ান হার্ট ইনস্টিটিউট, গ্লেনগেলেস গ্লোবাল হাসপাতাল, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কার্ডিয়াক সায়েন্স এবং ম্যাক্স সুপার স্পেশাল হাসপাতাল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব হেলথ ইকোনোমিকসের পরিচালক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, ‘ভারত বা থাইল্যান্ডে বাংলাদেশ থেকে যেসব রোগী চিকিৎসা নিতে যান তারা স্থানীয় চিকিৎসকদের কাছে গিয়ে সন্তুষ্ট হবে না। কারণ বাংলাদেশের চিকিৎসকরা রোগীদের সমস্যা জানতে খুবই কম সময় ব্যয় করেন। যা দেশের ডাক্তারদের প্রতি অনাস্থা তৈরি হওয়ার অন্যতম কারণ।’
তিনি আরও বলেন, ‘তথ্য অনুযায়ী ২০১৫ সালে ৬৩ হাজার রোগী বাংলাদেশ থেকে চিকিৎসা নিতে থাইল্যান্ডে গিয়েছিলেন।
বাংলাদেশে ব্যাংকক হসপিটাল মেডিক্যাল সেন্টারের একটি প্রকল্প লাইফ অ্যান্ড হেলথ। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক ডা. নীলাঞ্জন সেন বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর গড়ে চারশ’ রোগী উন্নত চিকিৎসা নিয়ে থাইল্যান্ডে যান।’
তিনি আরও বলেন, ‘থাই্যান্ডের ব্যাংকক হসপিটাল মেডিক্যাল সেন্টার ছাড়াও বামরুনগ্রাড ইন্টারন্যাশনাল হসপিটাল এবং সামিতিভেজ হসপিটালে বাংলাদেশি রোগীরা চিকিৎসা নিয়ে থাকেন।’
তিনি বলেন,‘দীর্ঘদিন ধরে পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে বাংলাদেশের মধ্যবিত্তরা ভারতে, উচ্চ মধ্যবিত্তরা থাইল্যান্ডে এবং ধনীরা সিঙ্গাপুরেই চিকিৎসা নিতে পছন্দ করেন। মূলত সাশ্রয়ী পরিবহন ব্যবস্থা বসবাসের ব্যবস্থা এবং হালাল খাবারের জন্য বাংলাদেশিরা চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ডকে বেছে নেন।’
সিঙ্গাপুরের পার্কওয়ে পিটিই হাসপাতালের বাংলাদেশ অফিসের এরিয়া ম্যানেজার মুশফিকুর রহমান অমিত বলেন, ‘মাসে গড়ে আমরা ২৫ জন বাংলাদেশি রোগী পাই।
মেডিকনসালট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘ছুটির দিনেও অনেক বাংলাদেশি মেডিক্যাল চেকআপ করতে বিদেশে যান।’
ডা. আব্দুল হামিদ বলেন, ‘আমাদের দেশের ল্যাবরেটরিগুলোতে দক্ষ টেকনিশিয়ানের অভাব আছে। যারা রোগীদের বিভিন্ন পরীক্ষার রিপোর্ট তৈরি করে বিশ্বাস ভঙ্গ করেন। আমাদের দেশে অনেক রোগীর ভুল চিকিৎসা করতে দেখা যায়। বিশেষ করে বিভিন্ন টেস্টের রিপোর্টে খুঁত থেকে যায়। বিশেষ করে সার্জারির ক্ষেত্রে ডাক্তারদের কনফিডেন্সের অভাব দেখা যায়।যা আমাদের স্থানীয় ডাক্তারদের ভাবমূর্তি নষ্ট করে।’
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা.জাফরউল্লাহ চৌধুরী বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার প্রবণতা বাড়ার জন্য সরকারি পলিসিকেই দায়ী করেন। তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, এবং বিরোধী দলীয় নেতারা বিদেশে চিকিৎসা নেন। আমাদের দেশের রাজনৈতিক নেতারা যদি এটা অব্যাহত রাখে তবে দেশের সাধারণ মানুষও বিদেশে চিকিৎসা নিতে উৎসাহিত হবে।’
কিভাবে এ প্রবণতা রোধ করা যেতে পারে:
২০১২ সালের স্বাস্থ্য বুলেটিনের তথ্য ব্যবহার করে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের এক হিসাব মতে, বিদেশে চিকিৎসা করাতে বাংলাদেশিরা বছরে ২ দশমিক ০৪ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেন। যা বাংলাদেশের মোট জিডিপির ১ দশমিক ৯৪ শতাংশ।
ডা. নীলাঞ্জন সেন এ বিষয়ে বলেন, ‘বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যয় ভারতের চেয়ে অর্ধেক এবং থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরের চেয়ে এক তৃতীয়াংশ থেকে এক দশমাংশ। অনেকে মনে করেন,বাংলাদেশে স্থানীয় ক্লিনিক ও হাসপাতালে ঝুঁকিপূর্ণ অপারেশনের ব্যয় এবং বিদেশের নাম করা হাসপাতালের সামগ্রিক ব্যয় প্রায় সমান। এ জন্য অনেকে স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা না করিয়ে বিদেশের হাসপাতালে করান।
ইউনাইটেড হাসপাতালের কমিউনিকেশন অ্যান্ড বিজনেস ডেভলপমেন্ট বিভাগের প্রধান ডা. সাগুফা আনোয়ার বলেন,‘কিছু সংখ্যক রোগীর বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার বিষয়টা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু স্থানীয় চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি মানুষের মনোবল বাড়াতে মানসিকতা পরিবর্তন প্রধান ভূমিকা পালন করতে পারে। এছাড়াও বাংলাদেশে ভুল চিকিৎসার ক্ষেত্রে ডাক্তারদের দায় নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলাও খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’
ডা. আব্দুল হামিদ সতর্ক করে বলেন, ‘বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ক্রমান্বয়ে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে, যা জাতীয় অর্থনীতির জন্য হুমকি। তবে যখনই আমরা রোগীদের আন্তর্জাতিকমানের সেবা দিতে পারি তবে বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার প্রয়োজন পড়বে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিবছর কয়েক মিলিয়ন ডলার চিকিৎসাসেবা বাবদ বিদেশে চলে যাচ্ছে। যদি আমরা এখনই এটা বন্ধ না করতে পারি তবে আমাদের সামগ্রিক চিকিৎসা ব্যবস্থা এবং বৈদেশিক মুদ্রা সঞ্চিতি (রিজার্ভ) ব্যবস্থা ভেঙে যাবে।’
এ সময় তিনি বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের সুনাম ফেরাতে মূল কারণ চিহ্নিত করতে দেশের নীতিনির্ধারকদের বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করার পরামর্শ দেন।
সৌজন্যে: ঢাকা ট্রিবিউন








