ডলারের দরের ওঠানামায় বিমানের ক্ষতি ১৩২ কোটি টাকা

চৌধুরী আকবর হোসেন
২০ ডিসেম্বর ২০১৭, ২৩:৪৯আপডেট : ২১ ডিসেম্বর ২০১৭, ০০:০১

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ডলারের বিনিময় হারের ওঠানামার কারণে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ১৩২ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। যা বিমানের বার্ষিক আয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। সংস্থাটির ২০১৬-১৭ অর্থবছরের আর্থিক বিবরণী থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

দেশের বাজারে টিকিট বেচাকেনাসহ লেনদেন টাকায় হলেও বিদেশে বিমানবন্দর ও সিভিল এভিয়েশনের চার্জ ছাড়াও জ্বালানি ও যন্ত্রপাতি ডলার দিয়ে কিনতে হয় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সকে।

মঙ্গলবার (১৯ ডিসেম্বর) বিমান পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান এয়ার মার্শাল (অব.) মোহাম্মদ ইনামুল বারীর সভাপতিত্বে সংস্থার প্রধান কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ১০ম বার্ষিক সাধারণ সভায় ২০১৬-১৭ অর্থবছরের আর্থিক বিবরণী অনুমোদিত হয়।

বিমানের এজিএম এ প্রসঙ্গে বিমানের শেয়ারহোল্ডার এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আবুল হাসনাত জিয়াউল হক বলেন, ‘বিমানকে দেশের বাইরে বিভিন্ন বিমানবন্দর ও সিভিল এভিয়েশন অথরিটিকে মার্কিন ডলারে চার্জ দিতে হয়। এছাড়া, ‍উড়োজাহাজের যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য জিনিসপত্র আন্তর্জাতিক বাজার থেকে কিনতে মার্কিন ডলার দিতে হয়। কিন্তু দেশের বাজারে বিমান টিকিট বিক্রিসহ লেনদেন  টাকায় করে থাকে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিনিয়ত ডলার এক্সচেঞ্জ রেট পরিবর্তন হতে থাকে।’

আর্থিক বিবরণীতে বলা হয়েছে, বিমান ধারাবাহিকভাবে তৃতীয় বছরের মতো মুনাফা করেছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বিমান কর পূর্ববর্তী মুনাফা করেছে ১৫১ কোটি টাকা, যা ২০১৫-১৬ অর্থবছরের চেয়ে ২৪ কোটি টাকা বেশি। তবে ডেফার্ড ট্যাক্স বিবেচনায় নিট মুনাফা কমেছে। এ হিসেবে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বিমানের নিট মুনাফা ৪৭ কোটি টাকা। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে যা ছিল ২৩৫ কোটি টাকা।

বিমান ২০১৪-১৫ অর্থবছরে নিট মুনাফা করে ৩২৪ কোটি টাকা। বিগত তিন অর্থবছরে বিমানের নিট মুনাফা হয়েছে ৬০৬ কোটি টাকা।

নিট মুনাফা কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে আর্থিক বিবরণীতে বলা হয়েছে, ডেফার্ড ট্যাক্স বিবেচনা, ডলার এক্সচেঞ্জ রেটের তারতম্য, বিশ্ববাজারের তুলনায় বাংলাদেশে জেট ফুয়েলের তুলনামূলক বেশি দাম, কার্গো পরিবহনে যুক্তরাজ্যের নিষেধাজ্ঞা এবং এশীয় এভিয়েশন মার্কেটে এয়ারলাইন্সগুলোর মধ্যে ভাড়া নিয়ে তীব্র প্রতিযোগিতা।

বিমান সূত্রে জানা গেছে, মিসরের ইজিপ্ট এয়ার থেকে ড্রাই লিজে আনা দুটি বোয়িং ৭৭৭-২০০ ইআর উড়োজাহাজও বিমানের আর্থিক ক্ষতির কারণ। পাঁচ বছরের লিজে আনা উড়োজাহাজ দুটির ইঞ্জিনের সমস্যার কারণে বেকায়দায় পড়তে হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সকে। ২০১৪ সালের মার্চে একটি উড়োজাহাজ বিমানের বহরে যু্ক্ত হয়। অন্য উড়োজাহাজটি যুক্ত হয় একই বছর মে মাসে। চুক্তি অনুযায়ী, যাত্রী পরিবহন করুক আর না করুক মাসে উড়োজাহাজ প্রতি পাঁচ লাখ ৮৫ হাজার ডলার (প্রায় চার কোটি ৭০ লাখ ১৬ হাজার টাকা) ভাড়া দিতে হবে। সব ধরনের রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বহন করতে হবে। পাঁচ বছরের আগে চুক্তি বাতিলও করতে পারবে না বিমান। লিজের মেয়াদ শেষে উড়োজাহাজ দুটি আগের অবস্থায় (ভাড়া নেওয়ার সময় যে অবস্থায় ছিল) ফেরত দিতে হবে। তবে উড়োজাহাজ দুটি একাধিকবার বিকল হওয়ায় লোকসান গুনতে হয় বিমানকে।

২০১৬-১৭ অর্থবছরে বিমান রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ৩৮১ কোটি টাকা রাজস্ব কর দিয়েছে। যা আগের ২০১৫-১৬ অর্থবছরের চেয়ে ৭৭ কোটি টাকা বেশি।

আর্থিক বিবরণীতে বলা হয়েছে, কার্গো পরিবহন খাতে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বিমান ৩৩ হাজার ৫৪২ মেট্রিক টন মালামাল পরিবহন করেছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে যা ছিল ৪০ হাজার ৯৩১ মেট্রিক টন। আগের অর্থবছরের চেয়ে এবার ১৮ শতাংশ কম কার্গো পরিবহন করেছে বিমান।  ২০১৬ সালের ৮ মার্চ যুক্তরাজ্য আকাশপথে কার্গো পরিবহনে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ায় এ খাতে বিমানের আয় কম হয়েছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে কার্গো খাতে বিমানের আয় হয়েছে ২৪৪ কোটি টাকা। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে এ খাতে আয় ছিল ৩১৫ কোটি টাকা।

২০০৮ সালে বিমান বোয়িং কোম্পানির সঙ্গে ২১০ কোটি ইউএস ডলারের ক্রয় চুক্তির অধীনে ১০টি উড়োজাহাজ ক্রয় আদেশ দেয়।  বিমান বহর থেকে পুরনো ডিসি১০-৩০, এয়ারবাস ও এফ-২৮ এয়ারক্রাফট সরিয়ে নতুন বোয়িং এয়ারক্রাফট সংযোজন করা হয়েছে। ইতোমধ্যে বোয়িং থেকে সংগ্রহ করা ছয়টি উড়োজাহাজের বিপরীতে বিমান নিজস্ব আয় থেকে পাঁচ হাজার কোটি টাকা ঋণের কিস্তি পরিশোধ করেছে।

বিমানের শেয়ারহোল্ডার এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আবুল হাসনাত জিয়াউল হক বলেন, ‘আগামী বছর এয়ারক্রাফট বৃদ্ধির পাশাপাশি বিমান তার নেটওয়ার্ক বিস্তার করার উদ্যোগ নিয়েছে। আগামী বছরের মার্চ মাসে চীনের গুয়াংজু রুটে ফ্লাইট চালানোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এছাড়া, ২০১৮ সালে বিমান কলম্বো এবং মালেতেও নতুন রুট খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’

আর্থিক বিবরণীতে বলা হয়েছে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বিমান যাত্রী বহন করেছে ২৩ লাখ ৫১ হাজার। আগের অর্থবছরে যা ছিল ২৩ লাখ ১৮ হাজার। অর্থাৎ, বিগত অর্থবছরে বিমান তার আগের অর্থবছরের চেয়ে ৩৩ হাজার যাত্রী বেশি বহন করেছে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে যাত্রী পরিবহনের পরিমাণ ছিল ২০ লাখ ২০ হাজার। বিগত তিন বছরে বিমানের যাত্রী সংখ্যা বেড়েছে ৩ লাখ ৩১ হাজার।

আর্থিক বিবরণীতে আরও বলা হয়, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বিমান হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নিজস্ব ১৬ হাজার ৪৭৩টি ফ্লাইট এবং ২৬টি বৈদেশিক এয়ারলাইন্সের ৪৮ হাজার ৫০২টি ফ্লাইটের গ্রাউন্ড হ্যান্ডেলিং সেবা দিয়েছে। গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং খাতে সেবার মান বৃদ্ধির লক্ষ্যে এ বছর ১০০ কোটি টাকার ইক্যুইপমেন্ট কেনা হয়েছে। যাত্রী ও কার্গো হ্যান্ডেলিংয়ে ৬৩৭ জন নতুন জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

বিমানের মহাব্যস্থাপক (জনসংযোগ) শাকিল মেরাজ বলেন, ‘লোকসান কাটিয়ে বিমান এখন লাভজনক প্রতিষ্ঠান। মুনাফার এই ধারা এই অর্থবছরে অব্যাহত থাকবে বলে আমরা আশা করি। একইসঙ্গে, যাত্রীসেবার মান বৃদ্ধি ও ফ্লাইট শিডিউলে রেগুলারিটি নিশ্চিত করার জন্য বিমান নিরলসভাবে প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।’

বর্তমানে বিমান বহরে রয়েছে বোয়িংয়ের চারটি ব্র্যান্ড নিউ বোয়িং ৭৭৭-৩০০ ইআর এবং দুটি বোয়িং ৭৩৭-৮০০ উড়োজাহাজ। এছাড়া আরও রয়েছে লিজে সংগৃহীত দুটি বোয়িং ৭৭৭-২০০ইআর, দুটি বোয়িং ৭৩৭-৮০০, একটি এয়ারবাস এ-৩৩০ এবং অভ্যন্তরীণ গন্তব্যের জন্য দুটি ড্যাস ৮-কিউ ৪০০ উড়োজাহাজ। ২০১৮ ও ২০১৯ সালে বিমান বহরে যুক্ত হবে বিশ্বের সর্বাধুনিক চারটি বোয়িং ৭৮৭-৮ ড্রিমলাইনার। কানাডার উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোম্বাডিয়ার থেকে জিটুজি পদ্ধতিতে তিনটি উড়োজাহাজ কেনার বিষয়টিও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

 

/এএম/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বিদ্যুতের দাম বাড়ায় শিল্প ও জ্বালানি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে
বিদ্যুতের দাম বাড়ায় শিল্প ও জ্বালানি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম