ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ‘অস্পষ্টতা’ আছে

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
০৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ২৩:২২আপডেট : ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০৩:১৩

বাংলা ট্রিবিউন বৈঠকি

সম্প্রতি মন্ত্রিপরিষদে অনুমোদন দেওয়া ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের খসড়া অস্পষ্ট বলে মত দিয়েছেন বিশিষ্টজনেরা। এ আইনের খসড়া অনুমোদনের আগে স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কিংবা সংস্থার সঙ্গে আলোচনারও প্রয়োজন ছিল বলে মনে করেন তারা। বৃহস্পতিবার ( ১ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে অনলাইন নিউজ পোর্টাল বাংলা ট্রিবিউনের সাপ্তাহিক আয়োজন ‘বাংলা ট্রিবিউন বৈঠকি’-তে এই মত ব্যক্ত করেন তারা।

মুন্নি সাহা সাংবাদিক মুন্নি সাহার সঞ্চালনায় হওয়া বৈঠকিটি শনিবার ( ৩ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে বেসরকারি টেলিভিশন এটিএন নিউজ সম্প্রচার করে। এবারের বৈঠকির আলোচ্য বিষয় ছিল ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮।

ব্যারিস্টার রুমীন ফারহানা বিশিষ্ট আইনজীবী ব্যারিস্টার রুমীন ফারহানা বলেন, ‘বড় বড় অপরাধ, যেমন খুন, ধর্ষণ, অ্যাসিড সন্ত্রাসসহ আরও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড আছে। সেখানে কিন্তু আমরা ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনের মতো ভয়াবহ শাস্তি দেখিনি। তারপর এই আইনে মানহানি, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত, শান্তি-শৃঙ্খলা ভঙ্গের অপরাধের কথা বলা হয়েছে, যেটা খুবই সাব্জেক্টিভ। এই একই অপরাধে কিন্তু শাস্তির কথা পেনাল কোডে বলা আছে এবং শাস্তিরও একটা তারতম্যের ব্যাপার আছে। আপনি যদি পেনাল কোডের আশ্রয় নেন, হয় আপনার শাস্তি বেশি আর না হলে শাস্তি কম। আবার আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গের জন্য এখানে ৭ বছরের জেল, আবার পেনাল কোডে ১০ বছরের জেল। এই আইনের অনেকগুলো জায়গায় আমরা এরকম অসামঞ্জস্য লক্ষ্য করছি। অপরাধ যখন একই তখন একই ধরনের সাজার ব্যবস্থা থাকা উচিত বলে মনে করি।’

উদিসা ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনের প্রধান প্রতিবেদক উদিসা ইসলাম মনে করেন, এই আইনের অনেকগুলো জায়গা অস্পষ্ট। ‘এই আইনের এই ধারাগুলো স্পষ্ট করা হবে কি না তা আগে ঠিক করা উচিত। এটা স্পষ্ট না করলে যে যেমন ইচ্ছা তেমন করে ব্যাখ্যা দিতে পারবে। এরকম যে যার মতো ব্যাখ্যার মধ্যদিয়ে আমরা কোন দিক দিয়ে বের হতে পারবো বা কতটা সতর্ক থাকতে হবে, সেটা একটা শঙ্কার জায়গা বলে মনে করি। আমি এ বিষয়ে কয়েকজন সাংবাদিক নেতার সঙ্গে কথা বলেছি। জিজ্ঞেস করেছি এই আইন নিয়ে তারা কী ভাবছে। তারা আমাকে একটা কথাই বললেন যে, “আমাদের সঙ্গে কোনও আলোচনা হয়নি।” এই ধারার সঙ্গে যারা জড়িত তাদের সঙ্গে আলোচনা করলে জিনিসগুলো স্পষ্ট হতো। যদিও আইনমন্ত্রী বলেছেন, ভয় পাওয়ার কিছু নেই, সাংবাদিকরা এর ভেতরে পড়বে না। তারপরও আমরা যারা সাংবাদিকতায় যুক্ত তারা একরকম ভীতিকর অবস্থার মধ্যে আছি। আরেকটা শঙ্কার ব্যাপার হলো, আইনে গুপ্তচরবৃত্তির কথা বলা আছে। এর সঙ্গে কিন্তু রাষ্ট্রদ্রোহিতার একটা ব্যাপার আছে।’

জায়েদু আহসান পিন্টু বৈঠকিতে বিশিষ্ট সাংবাদিক ও বেসরকারি টেলিভিশন ডিবিসি’র সম্পাদক জায়েদুল আহসান পিন্টু বলেন, ‘আমার যতদূর মনে পড়ে ৫৭ ধারা নিয়ে সর্বপ্রথম আমি কলম ধরেছি। তখন সাংবাদিক ইউনিয়ন কোনও স্টেটমেন্ট দেয়নি। উনারা কখন বলেছেন যখন তারা ভিক্টিমাইজড হয়েছেন। আমি একবছর আগেও এখানে বলে গেছি যে, কোনও অবস্থাতেই ৫৭ ধারা থাকা উচিত না। কেন থাকা উচিত না, জিজ্ঞেস করলে আমি বলবো, ভালোর জন্য। কারণ, আমি আজ পর্যন্ত দেখিনি, ৫৭ ধারা কোনও ভালো কাজে ব্যবহৃত হয়েছে। ব্যক্তিবিশেষের ওপর ব্যবহার হয়েছে। ৫৭ ধারার সবচেয়ে খারাপ দিক হলো, যখনতখন আপনি আমার বিরুদ্ধে আসতে পারেন। ৫৭ ধারা যখন ২০০৬ সালে পাস হয় তখন আমরা কোনও প্রতিবাদ করিনি। কারণ, এটার তখন ব্যবহারও হয়নি, কঠিনও ছিল। ২০০৯ সালে সংশোধন করে সাজার মাত্রা বাড়িয়ে দেওয়া হলো। ২০১৩ সালে ৭ বছর বাড়িয়ে ১৪ বছর করা হলো। দেশে কী এমন ঘটে গেল যে, এটাকে আপনার ১৪ বছর করতে হলো? একটা পার্লামেন্ট থাকা অবস্থায় আপনি অর্ডিন্যান্স জারি করে সাজার মেয়াদ বাড়ালেন। এটার উদ্দেশ্য নিয়ে তো অবশ্যই প্রশ্ন করতে হয়। তড়িঘড়ি করে করলেন একমাত্র হেফাজতের দাবি অক্ষুণ্ন রাখার জন্য। আমরা প্রতিবাদ করলাম, আজকে প্রতিবাদের ফল পেয়েছি। সেটা কমিয়ে আবার ৭ বছর করা হয়েছে। এটার মধ্যে আরও সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা ছিল, তা নেই। এই আইনটা যারা করেছে তাদের আমরা মূর্খ বলি না। তারা শিক্ষিত কিন্তু তাদের উদ্দেশ্য খারাপ। আইনমন্ত্রী বলেছেন, “এই আইনের অপব্যবহার হবে না।” আমি মেনে নিলাম, অপব্যবহার হবে না। সরকার আসে, সরকার যায়। আইনটা তো থেকে যায়, পরের সরকার এসে যদি অপব্যবহার করে?’

মোহাম্মদ জমির সাবেক তথ্য কমিশনার ও কূটনীতিক মোহাম্মদ জমির বলেন, ‘এই আইনটিকে যদি অপব্যবহার করা হয় গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায়, এটা অত্যন্ত খারাপ কাজ হবে এবং তা করা উচিত হবে না। ক্যাবিনেটে যা আলোচনা হয়েছে, পাস করার আগে তা হয়েছে, কিন্তু আমি যতদূর জানি, সংসদে পাস করার আগে একটি সাব-কমিটি আছে। সেখানে একটা আলোচনার ব্যবস্থা করা উচিত। নতুন প্রধান তথ্য কমিশনার আগে তথ্য মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব ছিলেন, তাকে সঙ্গে নিয়ে এই আইন সংসদে পাস হওয়ার আগে আরও আলোচনা করা উচিত।’

আরিফ জেবতিক ব্লগার ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট আরিফ জেবতিক প্রশ্ন তোলেন, এত বড় আইন যদি ভালোর জন্য করা হয়ে থাকে, তা হলে স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলাপ করা হলো না কেন? তিনি বলেন, ‘অনেকগুলা স্টেকহোল্ডার থাকার পরও তাদের সঙ্গে কোনও কথা বলা হয়নি। যদিও এখনও আলাপ করার সুযোগ আছে, কিন্তু মন্ত্রিসভায় পাস করার আগে আলাপটা জরুরি ছিল। আলোচনা করলে একটা ভালো আইন হতো। অনেকগুলো জিনিস এখানে বাদ পড়ে গেছে। অনলাইনে নারীর যৌন হয়রানি মারাত্মকভাবে হয়ে থাকে। এটা নিয়ে আইনে কোনোকিছু বলা হয়নি। নারী নির্যাতন অনলাইনে এখন বিশাল আকার ধারণ করেছে, এই ব্যাপারে আইনে থাকা উচিত ছিল।’

ফাহিম মাশরুর বেসিসের সাবেক সভাপতি ফাহিম মাশরুর বলেন, ‘আমি দু’টি বিষয় নিয়ে বলতে চাই। আমাদের ফিলসফিক্যাল জায়গা থেকে ভাবতে হবে। আমরা এদেশকে মধ্যম আয়ের দেশ বলে দাবি করছি। উন্নত দেশগুলো এই ধরনের সমস্যাগুলো কীভাবে সমাধান করে, সেটা আমাদের দেখা দরকার। ইউরোপ-আমেরিকায় সমাধান বের করে ক্রিয়েটিভ পন্থায়। আমার মনে হয় না, তারা সবকিছু আইন দিয়েই সমাধান করছে।’

 

/এসও/এইচআই/এমএ// আপডেট- এপিএইচ/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
যেখানে সকালে বারান্দায় এলেই দেখা মেলে জোড়া রংধনুর
যেখানে সকালে বারান্দায় এলেই দেখা মেলে জোড়া রংধনুর
সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের আড়ালে কী
সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের আড়ালে কী
গরমে শিশুর সুরক্ষা: সামান্য ভুলও ডেকে আনতে পারে বড় বিপদ
গরমে শিশুর সুরক্ষা: সামান্য ভুলও ডেকে আনতে পারে বড় বিপদ
থানার ভেতরে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটিয়ে আহত, ৩ পুলিশ প্রত্যাহার
থানার ভেতরে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটিয়ে আহত, ৩ পুলিশ প্রত্যাহার
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম