বাবা হওয়ার জন্য লড়াইয়ের গল্পটা শুরু গত ২১ ডিসেম্বর। সে রাতে ছিল প্রচণ্ড শীত। সেই শীতের মধ্যে কে বা কারা দেড় মাসের মেয়েশিশুটিকে ফেলে যায় ফেনী সদর হাসপাতালের পুরাতন ভবনের সিঁড়ির নিচে। ছোট্ট শিশুটি কাঁদছে। তার ঠোঁটকাটা।
শিশুটির কথা প্রথমবার শোনার পর থেকে তাকে পাওয়ার জন্য রীতিমতো লড়াই চালিয়ে যান তিনি। অবশেষে একমাসের আইনি ও আমলাতান্ত্রিক লড়াই শেষে পেলেন শিশুটির অভিভাবকত্ব। তিনি ফেনীর বখতিয়ার মুন্না।
সময় টেলিভিশনের ফেনী ব্যুরো চিফ বখতিয়ার মুন্না বৃহস্পতিবার (৮ ফেব্রুয়ারি) তার ফেসবুক ওয়ালে লিখেছেন, ‘অবশেষে পুরো একমাস অপেক্ষার পর মেয়েশিশুটির বিকল্প পরিচর্যাকারী হিসেবে অভিভাবকত্ব অর্জনের জেলা শিশু কল্যাণ বোর্ড সভার সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের চিঠি পেলাম। আজ থেকে আমি কন্যা শিশুটির আইনত বাবা। আমার সহধর্মিনী সাবিনা ইয়াসমিন ঝুনু তার মা। একমাত্র ছেলে ওহী ইসলাম তার বড় ভাই। এখন থেকে আমার মেয়ের নাম হবে কায়নাত ইসলাম রুহী।’
দেশে এখন ঠোঁটকাটার চিকিৎসা আছে। সম্ভবত তা জানতেন না শিশুটির মা-বাবা। আর সে কারণেই হয়তো তারা রেখে যান হাসপাতালে।
বখতিয়ার মুন্না মোবাইলে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অনেকে এমন শিশু দত্তক নিতে চায়, কিন্তু ঝক্কি-ঝামেলার কারণে কেউ নিতে পারে না। আমি ১০ জানুয়ারি আবেদন করি। একই সময় আরও একজন ভদ্রমহিলা আবেদন করেন। আমাদের আবেদন জেলা প্রশাসক মনোজ কুমার রায়ের কাছে পাঠানো হয়। তিনি আবার কমিটি গঠন করেন। তিনি ওই কমিটিকে আইনগত মতামতের জন্য জেলা ও দায়রা জজ আমিনুল হকের কাছে পাঠান। তিনি বলেন, “শিশু আইন ২০১৩-এ দত্তক দেওয়া যাবে। এটা আদালতের ব্যাপার না।” সে অনুযায়ী সুপারিশ করেন তিনি। শিশু কল্যাণ বোর্ড মিটিং ডেকে মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে আমাকে কাগজপত্র বুঝিয়ে দিল।’
বখতিয়ার মুন্না বলেন, ‘২১ ডিসেম্বর শিশুটিকে পাওয়ার পর উই ক্যান চেঞ্জ নামের একটি এনজিও তাকে নেয়। তখন শিশুটির নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়া হয়। ওখানকার চাইল্ড স্পেশালিস্ট আমাকে বলেন, “আপনি চাইলে শিশুটিকে ঢাকায় নিয়ে চিকিৎসা করাতে পারেন, না হলে শিশুটি বাঁচবে না।” তখন ওই এনজিও’র সহায়তায় আমি ঢাকায় নিয়ে চিকিৎসা করাই।’ পরিত্যক্ত নবজাতকের নিরাপত্তার জন্য সরকারি যে ব্যবস্থা আছে, তা সহজ করা উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
দত্তক নেওয়ার চিন্তা কিভাবে এলো জানতে চাইলে বখতিয়ার মুন্না বলেন, ‘প্রথমে আমার ক্লাস নাইনে পড়া ছেলের সঙ্গে কথা বলি। কারণ, তাকেই তো সবাই কথা শোনাবে যে, “তোর বোন কুড়িয়ে পাওয়া।” ছেলে বলে, “সে আমার বোন।” এরপর আর কোনও কথা থাকতে পারে না। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম। আমার ধারণা, এই শিশুর মা-বাবা জানতেন না যে ঠোঁটকাটা শিশু কিভাবে মানুষ করবে?”
তিনি বলেন, ‘আমার সব ভাইবোনের ছেলে-মেয়েরা বড় হয়ে গেছে। এখন পরিবারে কোনো ছোট শিশু নেই। এখন রুহীই সবার ছোট। ওকে নিয়ে পরিবারের সবাই খুব খুশি।’








