ইংরেজি ভাষার জন্মের দেশ ব্রিটেন। সেই দেশেই এখন ভাষাভাষীর দিক থেকে বাংলার অবস্থান পঞ্চম। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের বাইরের সবচেয়ে বেশি বাংলা ও বাঙালিয়ানার চর্চা ব্রিটেনেই। এ কারণে ব্রিটেনকে এখন প্রবাসী বাংলাদেশি ও বাঙালিরা ডাকেন ‘তৃতীয় বাংলা’ নামে। কেবল সাইনবোর্ড বা প্রতিষ্ঠানের নামকরণ নয়, হাসপাতাল, পার্ক, মসজিদ-সবখানে বাংলা নাম এবং বাংলায় নির্দেশনার বহুল ব্যবহার চোখে পড়ে ব্রিটেনে।
ব্রিটেন প্রবাসী বাংলাদেশি ও বাঙালিরা ইংরেজির পাশাপাশি নিজেদের কমিউনিটিতে বাংলায় কথা বলেন, নিজেদের ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও বিশেষ দিবসগুলো প্রাণের টানে পালন করে থাকেন।
তবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বের হয়ে আসার কারণে নানা নিয়ম-কানুন ও বাজেটে টান পড়ায় ব্রিটেনের বিভিন্ন খাতে অব্যাহতভাবে বাজেট কাটছাঁট হচ্ছে। তারপরও ব্রিটেনের আদালতে এখনও ব্যয়বহুল বাংলা অনুবাদকের অপশন বহাল আছে। ২০১৪ সালের ৭ এপ্রিল পর্যন্ত ব্রিটেনে বাংলা ভাষার ড্রাইভিং টেস্টের থিওরি পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগও বহাল ছিল। পরে ফরেন সব ল্যাংগুয়েজে পরীক্ষাটি দেওয়ার সুযোগ বাতিল করা হলে বাংলায় পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগও বাতিল হয়ে যায়।
ভাষাসৈনিক তাসাদ্দুক আহমেদের এক সময়ের ঘনিষ্ঠ সহচর, লন্ডন সেন্টমেরি সেন্টারের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক চেয়ারম্যান মো.লোকমান উদ্দীন মঙ্গলবার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ব্রিটেনের আইনো ইক্যুয়্যাল অপরচ্যুনিটি বা সমঅধিকারের সুযোগটি নিয়ে বাঙালি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ইংরেজির পাশাপাশি বাংলা চালুর উদ্যোগ নেই আমরা। এখন টাওয়ার হ্যামলেটস, ক্যামডেন, বার্মিংহাম, কার্ডিফের মতো এলাকাগুলোতে ভবন, রাস্তার নাম বাংলায় রয়েছে। বহু রাস্তা ও প্রতিষ্ঠানের নামও বাঙালি বিশিষ্টজনের নামে নামকরণ করা হয়েছে। এমনকি এনএইচএস এর হাসপাতালগুলো ভয়েস ডিরেকশনেও অন্যান্য ভাষার পাশাপাশি বাংলা ও সিলেটি আঞ্চলিক ভাষায় নির্দেশনা চালু করেছে বহু আগে। টাওয়ার হ্যামলেটসের স্পিটারফিল্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশনের বহু ভবনের নাম বাংলায় নামকরণ করা হয়েছে। লন্ডনে কবি নজরুল প্রাইমারি স্কুল, ওসমানী স্কুল এদেশে বাংলা ভাষার ঐতিহ্যের পরিচায়ক।’
লোকমান উদ্দীন আরও বলেন, ‘আমরা সত্তরের দশকের শেষ দিক থেকে এদেশে আন্দোলন করে গেছি ও লেভেল এবং এ লেভেলে বাংলা ভাষা বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ও পরবর্তীতে বহাল রাখার জন্য। বিভিন্ন সময় ফান্ডিং,শিক্ষার্থী ও শিক্ষক না পাওয়ার অজুহাত দেখিয়ে যদিও সেটি ব্যাহত করা হয়। লন্ডনে আলতাব আলী পার্কের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার বাংলা ভাষা ও বাঙালির ঐতিহ্য ও সংগ্রামের বড় পরিচয় ধারণ করে আসছে। ১৯৮৫ সালের আগে আমরা অস্থায়ী শহীদ মিনার বানিয়ে ২১শে ফেব্রুয়ারি পালন করতাম।’
কমিউনিটি ব্যক্তিত্ব ও সাবেক ছাত্র ইউনিয়ন নেতা নুরুর রহিম নোমান বলেন, কেবল লন্ডনের আলতাব আলী পার্কেই নয়, ওল্ডহামেও প্রবাসী বাংলাদেশীরা গড়েছেন স্থায়ী শহীদ মিনার। ব্রিটেন জাতি রাষ্ট্র হিসেবে সব অভিবাসীর মাতৃভাষাকে গুরুত্ব দেওয়ায় বাংলা ভাষা গুরুত্ব পাচ্ছে এখানে। তবে তার অভিযোগ, বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ হাইকমিশনের সেভাবে কোনও দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর উদ্যোগ এখনও দেখা যাচ্ছে না।
আইনজীবী ও লেখক বিপ্লব কুমার পোদ্দার বলেন, ব্রিটেনকে বলা হয় তৃতীয় বাংলা। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের বাইরের সবচেয়ে বেশি বাংলা ও বাঙালিয়ানার চর্চা ব্রিটেনেই। সন্তানকে শুধু বাংলা সংস্কৃতি ও ভাষা শিক্ষা দেওয়ার অভিপ্রায়ে গত এক দশকে কয়েক হাজার প্রবাসী বাংলাদেশি-যারা ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বসবাস করতেন, তারা স্থায়ীভাবে ব্রিটেনে চলে এসেছেন।
তবে ব্রিটেনে থিতু হওয়া প্রবাসী বাংলাদেশি পরিবারগুলোর দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্মে বাংলা ভাষায় কথা বলার চর্চা কমছে দিনে দিনে। দ্বিতীয় বা তৃতীয় প্রজন্মের অনেকে ভালোভাবে বাংলা বলতে পারেন না, লিখতে ও পড়তেও জানেন না। এ কারণে এক পুরুষ পর বিলেতে বাংলার চর্চা থাকবে কিনা তা নিয়ে তিনি সন্দেহও প্রকাশ করেন।
কবি ও লেখক আবু মকসুদ গত বুধবার বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে আলাপকালে এ ব্যাপারে বলেন, বিলাতে (যুক্তরাজ্যে) বাংলাচর্চার ইতিহাস একশ বছরের বেশি সময় ধরে। সেসময়েই এখান থেকে বাংলা সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়েছিল। আর প্রথম সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশের বয়সও সত্তর পেরিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে এ চর্চা আরও প্রসারিত হয়েছে পত্রিকা, টিভি চ্যানেল, সাহিত্য, সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো বাংলা চর্চা এবং প্রচারে উল্লেখযোগ্য ভূমিকার কারণে। প্রতিবছর মেলা উপলক্ষে বিলাত প্রবাসী লেখকদের অনেকগুলো বই প্রকাশিত হয়। কবিতা ছাড়াও কথাসাহিত্য, অনুবাদ, নাটক, গবেষণাধর্মী বই প্রকাশে ব্রিটেন প্রবাসী লেখকেরা পিছিয়ে নাই।
ব্রিটেনের পার্লামেন্টে গত কয়েক মেয়াদ ধরে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নির্বাচিত এমপিও রয়েছেন। চলতি মেয়াদে রয়েছেন তিন বাংলাদেশি নারী। এ তিন নারীর একজন রোশনারা আলী। প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ এমপি রোশনারা আলী এ ব্যাপারে বাংলা ট্রিবিউনকে পাঠানো ইমেইল-বার্তায় বলেন, ‘বাংলা ভাষা নয়,বাঙালির জীবনবোধও অনেকটা শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশদের আগ্রহের বিষয়। ব্রিটিশ ও বাংলাদেশি একসঙ্গে দুটো পরিচয়ই গর্বের। একদিন আসবে হয়তো যখন বাংলা ভাষা ব্রিটেনের দাফতরিক ভাষার স্বীকৃতি পাবে।’
ব্রিটিশ পরিসংখ্যান বিভাগের তথ্য মতে,ব্রিটেনে দুই লাখ ৩১ হাজারের মতো মানুষ বাংলায় কথা বলেন। ব্রিটিশ পরিসংখ্যান বিভাগের পরিচালিত জরিপ থেকে জানা যায়, ভাষাভাষীর দিক থেকে ব্রিটেনে বাংলা ভাষার অবস্থান পঞ্চম। ২০১১ সালে পরিচালিত ব্রিটিশ আদমশুমারিতেও একই চিত্র দেখা যায়। এছাড়াও বিভিন্ন দফতর থেকে সুন্দর ও নির্ভুলভাবে বাংলা ভাষায় বিজ্ঞপ্তি ও ঘোষণা প্রকাশিত হচ্ছে।
ব্রিটেনের এডুকেশন পলিসি বিভাগে একসময় কাজ করা তহুরা রহমান বেগম বলেন, ব্রিটেনে কয়েক হাজার লাইব্রেরিতে বাংলা বই রয়েছে। অন্তত ৯ ধরনের ফর্ম বা চিঠিতে জাতীয়তার কলামে বাংলা চালু হয় আশির দশকে। বাংলাদেশিরা এ মুহুর্তে এ দেশে চতুর্থ বৃহত্তম এথনিক মাইনোরিটি কমিউনিটি। ২০১৭ সালের জুনে ব্রিটেনের স্কুলগুলোতে স্বকীয় ভাষা হিসেবে তালিকাভুক্ত হয় সিলেটি ভাষা। বাংলা ভাষার পাশাপাশি কিছু স্কুলে শিক্ষার্থীদের মাতৃভাষার তালিকায় সিলেটি ভাষাকে স্বতন্ত্র ভাষা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে স্কুলগুলো।








