মশা নিয়ে ডিএনসিসি’র হটলাইন ‘মশকরা’

শাহেদ শফিক
২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ২২:০৯আপডেট : ০১ মার্চ ২০১৮, ১৩:৪৮

ডিএনসিসি মশার কামড়ে অতিষ্ঠ নগরবাসী। এ মৌসুমে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের মধ্যে দক্ষিণের তুলনায় উত্তর সিটিতে মশার প্রকোপ ভয়াবহ। স্কুল, হাসপাতাল, অফিস থেকে শুরু করে বিমানের ভেতরে পর্যন্ত মশার আক্রমণ। উত্তর সিটির বিভিন্ন এলাকায় দিনের বেলায়ও মশারি টাঙিয়ে রাখতে হয়। নর্দমা, ড্রেন ও খালের নোংরা পানিতে জন্ম নেওয়া মশা নিধনে দুই সিটি করপোরেশন কার্যকর কোনও পদক্ষেপ নিচ্ছে না। উপরন্তু, বিভিন্ন সময়ে মশা নিয়ে নগরবাসীর সঙ্গে ‘মশকরা’ করতে দেখা গেছে সংশ্লিষ্টদের।
দুই সিটি করপোরেশনের মধ্যে আয়তনে বড় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। উত্তর সিটিতে মশার প্রকোপ বেশি হলেও এ খাতে সংস্থাটির বরাদ্দ দক্ষিণের চেয়ে কম। ডিএনসিসি’র গুলশান-বনানী ও বারিধারা এলাকার বাসিন্দাদের অনেকেই নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় মশা নিধন করে থাকেন। এরপরেও মশার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাচ্ছেন না এলাকার বাসিন্দারা। বিভিন্ন ব্র্যান্ডের কয়েল ও মশারি টানিয়ে নগরবাসী মশা মোকাবিলা করলেও ডেঙ্গু মশা নিয়ে ইতোমধ্যেই আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। এ অবস্থায় মশার বিষয়ে তথ্য জানাতে হটলাইন চালু করছে ডিএনসিসি। এই উদ্যোগকে নিজেদের সঙ্গে মশকরা হিসেবেই দেখছেন নগরবাসী।
মশার দাপটে অতিষ্ঠ নাগরিকরা বলছেন, মশার বিষয়টি এমন নয় যে এটা নির্ধারিত কোনও বাড়ি বা এলাকাভিত্তিক সমস্যা। রাজধানীজুড়েই মশার উপদ্রব ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এ অবস্থায় সিটি করপোরেশনের উচিত হবে বিশেষ প্রোগ্রাম হাতে নিয়ে একযোগে মশা নিধন শুরু করা। কিন্তু তা না করে হটলাইন চালুর সিদ্ধান্তটি সঠিক নয়। এর অর্থ হচ্ছে—যেখান থেকে ফোন আসবে, কেবল সেখানেই ওষুধ ছিটানো হবে। আর যারা ফোন করতে পারবেন না, তারা এ সেবা পাবেন না।

মশার উপদ্রব অব্যাহতভাবে বেড়ে যাওয়ায় সম্প্রতি একটি হটলাইন চালু করেছে উত্তর সিটি করপোরেশন। ডিএনসিসিভুক্ত যেকোনও এলাকায় মশার উপদ্রবের খবর জানানো যাবে—০১৯৩২৬৬৫৫৪৪ নম্বর হটলাইনে। কোনও এলাকা বা বাড়িতে মশার উপদ্রব দেখা দিলে এই হটলাইনের মাধ্যমে ডিএনসিসিকে খবর জানানো যাবে। পরে ডিএনসিসি কর্মীরা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ওই বাড়ি বা এলাকায় ওষুধ ছিটিয়ে আসবে।

ডিএনসিসি জানিয়েছে, ১২ ফেব্রুয়ারি থেকে তাদের মশা নিধনে ক্র্যাশ প্রোগ্রাম চলছে। এই প্রোগ্রামটি ২৮ ফেব্রুয়ারি শেষ হওয়া কথা থাকলে আরও ১৫ দিন বাড়িয়ে ১৫ মার্চ পর্যন্ত করা হয়েছে। এরই মধ্যে মশা নিধনে ডিএনসিসি’র ক্র্যাশ প্রোগ্রামের ১৭ দিন অতিবাহিত হলেও এর কোনও সুফল পায়নি নগরবাসী। উপরন্তু, মশার উৎপাত আরও বেড়েছে।

এ বিষয়ে ডিএনসিসি’র প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জাকির হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মশার বিষয়ে খবর জানাতে আমরা হটলাইন চালু করেছি। আমরা সফল কিনা তা বলা যাবে না। এর মাধ্যমে তারা আমাদের থেকে সেবা নিতে পারবেন। হটলাইন সেবাটি সবেমাত্র শুরু হয়েছে।’

মশার জন্য হটলাইন সেবা প্রয়োজন আছে কিনা কিংবা এর সুফল ফাওয়া যাবে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এটা আমরা নাগরিকদের সুবিধার জন্যই চালু করেছি। আশা করি এর মাধ্যমে তারা সুফল পাবেন। অন্তত এর মাধ্যমে নাগরিকরা আমাদের কাছে তাদের অভিযোগটি জানাতে পারবেন। আমাদেরও যে কার্যক্রম চলছে, সে সম্পর্কেও তাদের ধারণা হবে। এক্ষেত্রে কেউ যদি বলেন—তার এলাকায় ওষুধ ছিটানো হয়নি,  তখন আমরা গিয়ে ওষুধ ছিটিয়ে আসব।’

বেসরকারি একটি কোম্পানির কর্মকর্তা মনজুরুল কবির থাকেন বনানীর একটি ফ্ল্যাটে । বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি  বলেন, ‘৯ বছর ধরে বনানীতে থাকি। এ সময়ে কোনও দিন মশক নিধন কর্মীদের চোখে পড়েনি আমার। বাসা কিংবা অফিসে স্প্রে করার পরেও মশার কামড় থেকে মুক্তি পাওয়া যায় না। বাসায় এলে তো মশারি টাঙিয়ে থাকায় যায়, অফিসে তা সম্ভব না।’

আফতাব নগরের বাসিন্দা আঞ্জুমান আরা বেগম বলেন, ‘আমাদের এলাকায় কোনও দিন কেউ মশক মারতে  আসেনি। মশা মারতে হটলাইনে ফোন দিয়ে খবর দিতে হবে কেন? সিটি করপোরেশনের ট্যাক্সগুলো লাইনে দাঁড়িয়ে ব্যাংকের মাধ্যমে পরিশোধ করে আসি। তাই তাদের (সিটি করপোরেশন) উচিত হবে নিজ উদ্যোগে এসে আমাদের সেবা দিয়ে যাওয়া।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে খোদ ডিএনসিসির একজন কাউন্সিলর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এটা কি চিকুনগুনিয়া রোগ যে হটলাইনে ফোন করলে ডাক্তার এসে ওষুধ ও চিকিৎসা দিয়ে যাবে? এটা এলাকাভিত্তিক সমস্যা। সিটি করপোরেশনকে সমন্বিত উদ্যোগে এ সমস্যা সমাধান করতে হবে। হটলাইনে ফোন করে নগরবাসীর বাসাবাড়িতে মশককর্মী আনা নগরবাসীর সঙ্গে মশকরা করা ছাড়া আর কিছুই নয়।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডিএনসিসির কয়েকজন মশক সুপারভাইজার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, কেউ ফোন করলে তার বাড়িতে গিয়ে স্প্রে করলে মশা নিধন হবে না। হয়তো তাৎক্ষণিক একটা সুফল আসবে। কিন্তু যদি আশপাশের বিশাল এলাকাজুড়ে স্প্রে করা না হয়, তাহলে এক-দুই ঘণ্টা পর পাশের ভবন থেকে ওই বাড়িতে আবার মশা চলে আসবে। ফলে হটলাইন কোনও কাজে আসবে না। বরং আমাদের উচিত হবে একদিনে দুই-তিনটি ওয়ার্ড করে একযোগে ফগিং করা। তাহলে মশা থেকে নগরবাসীকে মুক্তি দেওয়া যাবে।

ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘মশক নিধনের জন্য আমাদের ২৮৩ জন জনবল রয়েছে। আমরা আগামীকাল (১ মার্চ) থেকে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে আরও ৪৪ জনকে এর সঙ্গে যুক্ত করছি। ’

শুধু হটলাইন নয়, গত বছর মশাবাহিত চিকুনগুনিয়া রোগের ভয়াবহতা বেড়ে গেলে সংস্থাটির প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক নগরবাসীকে দোষারোপ করে বলেছিলেন, ‘চিকুনগুনিয়া রোগের ভাইরাস বহনকারী এডিস মশা জন্মায় বাসাবাড়ি, ফ্রিজ, এসির ট্রে, নির্মাণ সামগ্রী, ফুলের টব, সানশেড, ছাদে জমে থাকা পরিষ্কার পানি, ক্যান, পরিত্যক্ত টায়ার ও ডাবের খোসায়। ফলে আমরা বাসাবাড়িতে গিয়ে ওষুধ দিতে পারি না। আমরা কি বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে মশারি টাঙিয়ে দেব?’ মেয়রের এই বক্তব্যে তখন সমালোচনার ঝড় উঠলে পরে তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন।

গত অর্থবছরে মশা নিধন কার্যক্রমের জন্য ডিএসসিসির বাজেট বরাদ্দ ছিল ১১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এই অর্থবছরে ডিএসসিসির বাজেট বাড়িয়ে ২৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। আর ডিএনসিসিতে এ অর্থবছরে মশক নিধনে বরাদ্দ করা হয়েছে ২০ কোটি টাকা । এক্ষেত্রে ডিএসসিসির তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে ডিএনসিসি।

 

 

 

/এপিএইচ/চেক-এমওএফ/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক