ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারীসহ ১১ জন বিবৃতি দিয়েছেন। বৃহস্পতিবার (১ মার্চ) বিকালে পাঠানো এই বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন সভাপতি পদপ্রার্থী কুদ্দুস আফ্রাদ, জাফর ওয়াজেদ, আতাউর রহমান, সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী সাজ্জাদ আলম তপু, খায়রুজ্জামান কামাল, সেবিকা রানী, গাজী জহিরুল ইসলাম, এম এ কুদ্দুস, অমিয় ঘটক পুলক, রওশন ঝুনু এবং যুগ্ম সম্পাদক প্রার্থী খায়রুল আলম।
বিবৃতিতে বলা হয়, নজিরবিহীন জাল ভোট, হঠাৎ করে দুই ঘণ্টা ভোট গ্রহণের গতি কমিয়ে দেওয়া, ভোটের সময় এক ঘণ্টা বাড়িয়ে দেওয়ার মতো তুঘলকি সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। জাল ভোট দিয়ে আসা ৩০ জনকে হাতেনাতে ধরিয়ে নির্বাচন কমিশনের হাতে সোপর্দ করা হলেও তাদের রহস্যজনকভাবে ছেড়ে দেওয়া হয়। তিন শতাধিক পেশাদার সাংবাদিক লাইনে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থেকেও ভোট গ্রহণে বিলম্বের কারণে অফিসের সময় হওয়ায় ভোট না দিয়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন।
নির্বাচন চলাকালে কয়েকজন প্রার্থী কমিশনের সদস্য বরাবর মৌখিকভাবে অভিযোগ দিলেও তা আমলে নেওয়া হয়নি বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
এতে আরও বলা হয়, রাত সাড়ে ১২টায় বিক্ষুব্ধ ডিইউজে সদস্যদের প্রতিবাদের মুখে নির্বাচন পরিচালনা কমিটি ফল ঘোষণা না করে কেন্দ্র ত্যাগ করে। রাত সাড়ে ৮টায় কয়েক ব্যক্তির ফেসবুকে বানোয়াট ফল প্রচার করতে দেখা যায়। আর এই ভুয়া নির্বাচনি ফল নিয়ে স্বনামধন্য গণমাধ্যমে যে সংবাদ প্রচার করা হয়েছে, তা দুঃখজনক।
বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী ডিইউজে নির্বাচনে সভাপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা কুদ্দুস আফ্রাদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জাল জালিয়াতির নির্বাচন হয়েছে। নির্বাচনের নামে একটি মহড়া করা হয়েছে। তাৎক্ষণিকভাবে ভেতরে গিয়ে তিন-তিনবার আমি প্রতিবাদ করেছি। কমিশনকে এটা বলেছি–নির্বাচনে জয়ী হই আর পরাজিত হই, এই নির্বাচন আমি মানবো না। এমন নির্বাচন চাই না। কিন্তু আমাদের কোনও অভিযোগকে পাত্তা না দিয়ে একতরফাভাবে নির্বাচন করা হয়েছে। এ অবস্থায় নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন ও পুনরায় নির্বাচনের দাবি করছি।’
তিনি বলেন, নির্বাচনের ফল ঘোষণার চেষ্টা করা হয়েছে রাত ১২টায়। কিন্তু রাত ৮টার দিকে ফেসবুকে প্রিন্টেড কপি চলে গেছে। নির্বাচন কমিশনের তথাকথিত স্বাক্ষরিত ফলের কপির সঙ্গে ওই কপির হুবহু মিল পাওয়া গেছে।
সাধারণ সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা সাজ্জাদ আলম তপু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই নির্বাচন একটি জাল ভোটের মহড়া। নির্বাচনে যা হয়েছে, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের জন্য কলঙ্কজনক। এই নির্বাচন আমরা প্রত্যাখ্যান করেছি।’
সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী সেবিকা রানী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই নির্বাচন জাল ভোটের নির্বাচন, মাগুরার নির্বাচনও এর কাছে হার মেনেছে। এই নির্বাচন আমরা মানি না। নতুন করে নির্বাচন দিতে হবে। প্রহসনের নির্বাচনে ভোট গণনার আগেই প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো ফল ফাঁস করা হয়েছে। জয়দেব নামের একজন সাংবাদিক এই ফল প্রকাশ করেছেন।’
ভোটের ফল ঘোষণার আগেই ফল প্রকাশের বিষয়ে দৃষ্টি আর্কষণ করা হলে সাংবাদিক জয়দেব দাশ বাংলা ট্রিটিউনকে বলেন, ‘সাংবাদিকের কাজ হচ্ছে জাতীয় নির্বাচন থেকে ইউনিয়ন নির্বাচন পর্যন্ত গোপন তথ্য বের করা। সাংবাদিকরা সবার আগে ভেতরের তথ্য বের করে আনেন। এখানে নিজেদের নির্বাচন হোক আর যাই হোক, তথ্য সবার আগে হাতে এসেছে, সবার আগে জাতিকে জানিয়ে দিয়েছি।’
প্রধান নির্বাচন কমিশনার আবু তাহের বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘তারা জাল ভোট বলছে, কিন্তু তাদের কথার তো ঠিক নেই। একবার বলেছে পাঁচটি জাল ভোট আবার বলছে ছয়টি, এখন বলছে শতাধিক। জাল ভোট দিতে এসে দুটি লোক ধরা পড়েছে। ওই সময় মনজুরুল আহসান বুলবুল উপস্থিত ছিলেন। জাল ভোট দিতে আসা দুজনকে ঘণ্টাখানেকের বেশি সময় বসিয়ে রেখে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দিয়েছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘পরাজিত প্রার্থীরা সব সময়ই সুযোগ খোঁজে। নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব ভোট গণনা এবং ফল ঘোষণা করা। যখন তারা জানতে পেরেছেন নির্বাচনে হেরে যাচ্ছেন, তখন সিনক্রিয়েট করেছেন। আমরা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলাম। আমরা ফল ঘোষণা করেছি।’
তবে নির্বাচনের দিন (বুধবার) রাতে ফল ঘোষণার আয়োজনের আগে বক্তব্যে আবু তাহের বলেছিলেন, ‘নির্বাচন গ্রহণযোগ্য মাত্রায় হয়নি। তাদের জন্য আইন আদালত রয়েছে।’
ফল ঘোষণার আয়োজনের আগে সাংবাদিক মনজুরুল আহসান বুলবুল নির্বাচন গ্রহণযোগ্য মাত্রায় হয়নি বলে উল্লেখ করেন।
বুধবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) সকালে ঢাকা সাংবাদিক ইউনয়নের নির্বাচন আনন্দমুখর পরিবেশে শুরু হলেও শেষ হয় অপ্রীতিকর এক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে। ভোট গণণার পর প্রার্থীদের নির্বাচন প্রত্যাখ্যানে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন তাদের সমর্থকরা। ফল ঘোষণা বন্ধের দাবির পরও তা ঘোষণা করা শুরু করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার আবু তাহের। সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ চারটি পদে বিজয়ীদের নাম ঘোষণার পর মাইক কেড়ে নেন বিক্ষুব্ধ কয়েকজন সাংবাদিক। ফলের লিখিত কাগজ তারা ছিঁড়ে ফেলেন। এক পর্যায়ে নির্বাচন কমিশনারকে সাংবাদিক নেতারা উদ্ধার করে জাতীয় প্রেসক্লাবের ভেতরে নিয়ে যান। এ সময় মঞ্চের দিকে চেয়ার ছুড়ে মারা হয়। ফল ঘোষণার আয়োজন পণ্ড হয়ে যায়।








