নারীর জন্য সংবাদের ভাষা

উদিসা ইসলাম
০৮ মার্চ ২০১৮, ২৩:২৩আপডেট : ০৯ মার্চ ২০১৮, ১০:০০

নারী নির্যাতন (ছবি- ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত)

গণমাধ্যমে প্রকাশিত নারী বিষয়ক সংবাদের ভাষা নিয়ে নানা সময়ে প্রতিবাদ জানানো হলেও এখনও জেন্ডার সংবেদনশীল ভাষা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। নিপীড়নের সংবাদে যে ভাষার ব্যবহার করা হয়, তা নারীর জন্য অবমাননাকর। জেন্ডার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নারী-পুরুষ সমতার যে বিষয়টি আমাদের দেশে পাঠ করানো হয়, সেখানে ঘাটতির জায়গা থাকায় বোঝাপড়ায় সমস্যা রয়ে গেছে। পুরুষতান্ত্রিক মাধ্যমে অন্যান্য সংবাদের মতো নারীর ওপর নিপীড়নের সংবাদও একটি পুরুষতান্ত্রিক পণ্য। 

ধর্ষণ বিষয়ক সংবাদে ধর্ষণের শিকার না লিখে ‘ধর্ষিতা’ লেখা, যৌন হয়রানিকে ‘শ্লীলতাহানি’ বা ‘ইভটিজিং’ শব্দ প্রতিস্থাপনের মধ্য দিয়ে অপরাধকে হালকা করে দেখা হয়। যদিও ২০০৯ সালে হাইকোর্টের একটি নির্দেশনায় বলা হয়েছে—ইভটিজিং শব্দটি লেখা যাবে না, এগুলো যৌন হয়রানি। যেখানে বলা— শারীরিক ও মানসিক যেকোনও ধরনের নির্যাতন যৌন হয়রানির পর্যায়ে পড়ে। এর মধ্যে রয়েছে— যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য বা রসিকতা, গায়ে হাত দেওয়া বা দেওয়ার চেষ্টা করা, ই-মেইল, এসএমএস, টেলিফোনে বিড়ম্বনা, পর্নোগ্রাফি বা যেকোনও ধরনের চিত্র, অশ্লীল ছবি, দেয়াল লিখন, অশালীন উক্তিসহ আপত্তিকর কোনও ধরনের কিছু করা, কাউকে ইঙ্গিতপূর্ণভাবে সুন্দরী বলা, কোনও নারীকে ভয়ভীতি প্রদর্শন, যেকোনও ধরনের চাপ প্রয়োগ করা, মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে সম্পর্ক স্থাপন করা, যৌন সম্পর্ক স্থাপনের দাবি বা অনুরোধ, অন্য যেকোনও শারীরিক বা ভাষাগত আচরণ, যার মধ্যে যৌন ইঙ্গিত প্রচ্ছন্ন।

পত্রিকার পাতায় দেখা যায়, ধর্ষণের সংবাদে বিবরণের যে ধরন, সেখানে কোনোভাবেই নারীর জন্য সম্মানজনক শব্দ বা বাক্য ব্যবহার করা হয় না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম করতে চেষ্টা চলছে, বলা হলেও কোনও না কোনোভাবে জেন্ডার অসংবেদনশীল শব্দ সংবাদে প্রবেশ করে। যেমন—গ্রামের এক কলেজছাত্রীকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে রবিবার রাতে ধর্ষণ করেছে সুজন (ছদ্মনাম) নামের এক যুবক। এখানে প্রলোভন শব্দটি দিয়ে নারী প্রলোভিত হয় এই কথাটিই ধর্ষণের অপরাধের আগে মাথায় আসে পাঠকের। অথবা রাজধানী ঢাকায় গত কদিন আগে চালক কর্তৃক এক তরুণীর শ্লীলতাহানি ঘটনার কদিন পরেই এবার প্রাইভেট কারে এক তরুণী শ্লীলতাহানির শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

কেন বার বার বলার পরও এই বিষয়গুলো নজরে নিচ্ছে না গণমাধ্যম, এ প্রশ্নে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কাবেরী গায়েন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মিডিয়া পুরুষতান্ত্রিক ও পুঁজিতান্ত্রিক। ভাষাও পুরুষতান্ত্রিক ও পুঁজিতান্ত্রিক। পুরুষতান্ত্রিক মাধ্যমে অন্যান্য সংবাদের মতো নারীর ওপর নিপীড়ন সংবাদও একটি পুরুষতান্ত্রিক পণ্য। ফলে নিপীড়নের সংবাদে নারী পণ্যটি থেকে যতটা উশুল করে নেওয়া সম্ভব, সেই চেষ্টা চলে। ‘এত বলার পরেও’ পরিবর্তন না হবার কারণ খুবই সহজ। কারণ, যারা এসব বন্ধ করতে বলছেন, মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রির বাণিজ্য সাপেক্ষে তাদের স্বর গুরুত্বপূর্ণ না। যারা বলে চলেছেন তাদের কথা না শুনলে ইন্ডাস্ট্রির বাণিজ্যে হাত পড়তে পারে, বলাটাকে সেই অবস্থায় নিয়ে যেতে না পারা পর্যন্ত পরিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ।’

কী করা যেতে পারে প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘ক্রমাগত বলে, লিখে জনমত তৈরি করা একটা পথ। সেই জনমতের সূত্রে প্রতিটি মিডিয়া হাউজে নিপীড়ন সংবাদসহ নারীবিষয়ক সংবাদে ব্যবহৃত শব্দের নীতিমালা প্রণয়নের চেষ্টা করা আশু কর্তব্য। যেমন আছে যুক্তরাজ্যে। ২০১৩ সালে National Union of Journalists নারীর প্রতি সহিংসতা বিষয়ে সংবাদ করার জন্য নীতিমালা তৈরি করেছে। আমাদের ক্ষেত্রেও এমন নীতিমালা প্রণয়ন এবং কার্যকর করার ব্যবস্থা করা গেলে খানিকটা আগানো সম্ভব। আরেকটা উপায় হলো, সাংবাদিক-সম্পাদক-মালিকদের জেন্ডার সংবেদী প্রশিক্ষণ ও পাঠের আওতায় আনার ব্যবস্থা করা।’

সংবাদের ভাষায় পরিবর্তন আসছে না কেন? এ প্রশ্নে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক জোবাইদা নাসরিন বাংলা ট্রিবিউনকে  বলেন, ‘শ্লীলতাহানি শব্দটির ব্যবহার থামানো যাচ্ছে না।ধর্ষণ যখন আন্ত-অপরাধ তখন শ্লীলতাহানি লেখার সুযোগই নেই।’

তিনি বলেন, ‘পরিবর্তন না হওয়ার কারণ রাষ্ট্র থেকে পরিবারের মধ্যে সমতার যে ভাবনা, সেটার মধ্যে সমস্যা থাকা। আর সে কারণে আক্রমণ বা যৌন হয়রানি ঘটলে শব্দগুলোর সঙ্গে অভ্যস্ত হতে সমস্যা হয়। কেননা, পুরুষতান্ত্রিক মনোজগতে এসব খারাপ শব্দ।’ তিনি আরও বলেন, ‘পরিবার নারীকে চ্যালেঞ্জিং পেশায় যেতে বলছে। কিন্তু পুরুষকে বলে না— তুমি নার্স হও, রিসিপশনিস্ট হও। ধরেই নেওয়া হচ্ছে, এগুলো নারীরই পেশা। আমাদের দেশে জেন্ডার প্যাকেজে একজন মেয়ে পুরষকে অতিক্রম করে যাবে। কিন্তু ছেলেকে আমরা জেন্ডার সচেতন করি না। জেন্ডার সমতার মূল লক্ষ্য কখনও নারী না।’




/ইউআই/এপিএইচ/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক