চাচারা ছিল সালাফি বা আহলে হাদিস মতবাদের অনুসারী। তাদের প্রভাবে প্রথমে সালাফি মতবাদের অনুসারী হয়ে ওঠে ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের ওপর হামলাকারী ফয়জুর হাসান ওরফে ফয়জুল। দাখিল পাসের পরপরই পরিবর্তন দেখা যায় তার আচরণে। ধর্মীয় নানা বিধিনিষেধ মানতে শুরু করে কঠোরভাবে। অনলাইনে জড়িয়ে পড়ে জঙ্গিবাদে। নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিম এবং আনসার আল ইসলামের অনলাইন গ্রুপ দাওয়াহ ইলাল্লাহর সঙ্গে যুক্ত হয় সে। পাঠ নেয় সাংগঠনিক কার্যক্রমের। দাওয়াহ ইলাল্লাহর নির্দেশনা অনুসারে জাফর ইকবালের ওপর হামলার জন্য প্রস্তুতি নেয় সে নিজে নিজেই। ফয়জুলের দাবি, ৩ মার্চ চালানো ওই হামলায় তার সঙ্গে অন্য কেউ ছিল না। দাওয়া ইলাল্লাহ ফোরামের নির্দেশনা অনুযায়ী সে হামলা চালিয়েছে। কিন্তু পুলিশ কর্মকর্তারা ধারণা করছেন, তার এই হামলা পরিকল্পনার সঙ্গে আরও কেউ না কেউ সরাসরি যুক্ত ছিল। এজন্য বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় গাজীপুর থেকে তার ভাই এনামুলকে আটকের পর ফয়জুলের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন এবং ট্যাব থেকে যোগাযোগের তথ্য সংগ্রহ করছে পুলিশ। গতকাল বৃহস্পতিবারই ফয়জুলকে ১০ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়।
কিন্তু ২৩ বছরের এই তরুণ ঠিক কীভাবে ভয়ঙ্কর এক জঙ্গি হয়ে উঠলো? আর দাওয়াহ ইলাল্লাহ কীভাবে তাকে হামলার জন্য প্রস্তুত করেছিল? জাফর ইকবালকে হত্যাচেষ্টার পর আটক হওয়া হামলাকারী ফয়জুলকে দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদের সময় আরও অনেক কিছুর সঙ্গে এই প্রশ্নগুলোর উত্তরও জানার চেষ্টা করেছে ঢাকার কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের কর্মকর্তারা।
সিটিটিসির অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলছেন, ‘ধার্মিক পরিবারে বেড়ে ওঠা ফয়জুল হঠাৎ করেই ২০১৬ সালে পাল্টাতে শুরু করে। তখন থেকেই সে অনলাইনে আহলে হাদিস সম্পর্কিত বিভিন্ন লেখালেখি পড়ে এবং একপর্যায়ে কট্টরপন্থী হয়ে যায়। র্যাডিক্যালাইজড হয়ে যাওয়ার পর সে প্রাথমিক ধাপেই জাফর ইকবালকে হত্যার পরিকল্পনা করে। দাওয়াহ ইলাল্লাহ ফোরাম তাকে এই কাজে উৎসাহিত করে।’ এই কর্মকর্তা ফয়জুলকে তিন দিন ধরে টানা জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন।
ফয়জুলসহ তার বাবা-মা, চাচা এবং এক মামাকে জিজ্ঞাসাবাদকারী সিটিটিসি কর্মকর্তারা বলছেন, তারা জাফর ইকবালের ওপর হামলার আদ্যোপান্ত জানার চেষ্টার পাশাপাশি ফয়জুলের জঙ্গিবাদে সম্পৃক্ত হওয়ার মূল কারণগুলোও জানার চেষ্টা করেছেন। দীর্ঘমেয়াদি কাজের অংশ হিসেবে জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে এই কারণ খোঁজাটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন তারা।
সিটিটিসির এক কর্মকর্তা বলছেন, ফয়জুর তার কুয়েত প্রবাসী আহলে হাদিসের অনুসারী দুই চাচার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে ঠিকই; কিন্তু গত দুই বছরে সে যাদের সংস্পর্শে ছিল তারাও আহলে হাদিসের অনুসারী। ২০১৬ সালে দাখিল পাস করে সিলেট আলিয়া মাদ্রাসায় আলিম শ্রেণিতে ভর্তি হলেও এটি ‘সঠিক পথ নয়’ বলে লেখাপড়ায় ইতি টানে। মঈন কম্পিউটার্স নামে যে প্রতিষ্ঠানে ফয়জুল কাজ করতো সেই প্রতিষ্ঠানের মালিক মঈনও ছিল আহলে হাদিসের অনুসারী। মাঝে বেশ কয়েক মাস কাজ করেছে সিলেটের কুরআন-সুন্নাহ রিসার্চ সেন্টার নামের একটি প্রতিষ্ঠানে। সেখানকার প্রধান শায়খ আব্দুর রহমানও আহলে হাদিস মতবাদের অনুসারী।
দীর্ঘদিন জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে কাজ করে আসা সিটিটিসির কর্মকর্তারা বলছেন, দুনিয়াজুড়ে আহলে হাদিস বা সালাফি মতবাদের বেশিরভাগ অনুসারীই উগ্রপন্থায় জড়িয়ে পড়ছে। বাংলাদেশেও নিষিদ্ধঘোষিত জেএমবি বা নিও জেএমবি এবং আনসার আল ইসলামসহ বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের সদস্যদের অধিকাংশ আহলে হাদিস বা সালাফি মতবাদের অনুসারী।
সালাফিজম বা আহলে হাদিস এমন একটি আন্দোলন, যার মাধ্যমে মুসলিমদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও করণীয়-বর্জনীয় বিষয়াদি ইসলামের প্রথম তিন যুগের সঙ্গে সাদৃশ্য রাখার প্রয়াস চালানো হয়। বাংলাদেশে বর্তমানে আহলে হাদিস অনুসারীদের দুটি সংগঠন সক্রিয় রয়েছে। এর একটি জমিয়তে আহলে হাদিস এবং অন্যটি আহলে হাদিস আন্দোলন বাংলাদেশ। আহলে হাদিস আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আসাদুল্লাহ আল গালিব।
ঢাকার কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের এক কর্মকর্তা বলছেন, সালাফি বা আহলে হাদিস থেকে জঙ্গিবাদে যোগ দেওয়ার পর হামলাকারী ফয়জুল নিজের পরিবারেও জঙ্গিবাদের দাওয়াত দিয়েছিল। ফয়জুলের বাবা হাফেজ আতিকুর রহমানের বরাত দিয়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, সে সময় ফয়জুলের বাবা ছেলেকে তার মতবাদ নিয়ে চলাফেরা করতে বলেন। তিনি নিজে জঙ্গিবাদের দিকে পা বাড়াননি। তবে ফয়জুল তার বোনকে তার মতবাদে বিশ্বাসী চমন ওরফে সুমনের সঙ্গে বিয়ে দিতে চেয়েছিল। ওই হামলার পর থেকে সেই তরুণকেও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
সিটিটিসির কর্মকর্তারা বলছেন, এনামুল হাসান নামে ফয়জুলের যে ভাইকে হামলার পাঁচ দিন পর বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় গাজীপুর থেকে আটক করা হয়েছে , সেও জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। হামলার পরপরই ফয়জুলের মোবাইল ফোন ও ট্যাব এবং কম্পিউটার নিয়ে পরিবারের সঙ্গে সিলেটের বাড়ি থেকে পালিয়ে যায় সে। হামলার দুদিন পর ফয়জুলের বাবা-মা থানায় গিয়ে আত্মসমর্পণ করলেও এনামুলকে পাওয়া যাচ্ছিল না।
সিটিটিসি বলছে, জিজ্ঞাসাবাদে ফয়জুল অনেক কিছুই এড়িয়ে গেছে বলে তাদের মনে হয়েছে। তারা ইতোমধ্যে ফয়জুলের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন ও ট্যাব উদ্ধার করেছেন। এখন এই দুটি ডিভাইস ফরেনসিক পরীক্ষা করে তার কার কার সঙ্গে যোগাযোগ ছিল সেই রহস্য উন্মোচন করার চেষ্টা করছেন তারা।
গত ৩ মার্চ শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি অনুষ্ঠানে ড. জাফর ইকবালের ওপর ছুরি নিয়ে হামলা চালায় ফয়জুল। জাফর ইকবাল এখন ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। আর ঘটনাস্থলেই গণপিটুনি দিয়ে শিক্ষার্থীরা ফয়জুলকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তুলে দেয়। এরপর থেকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা ফয়জুলকে বৃহস্পতিবার ১০ দিনের রিমান্ডে নেয় সিলেটের জালালাবাদ থানা পুলিশ।








