দিন-দুপুরে কিংবা রাতের অন্ধকারে ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছেন পথচারীরা। ছিনতাইকারীর হাতে প্রাণও যাচ্ছে নারী, শিশু ও পুরুষের। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও নিয়মিত অভিযান চালিয়ে ছিনতাইকারীদের গ্রেফতার করছে, তবু ছিনতাই বন্ধ হচ্ছে না। গত বৃহস্পতিবার (৮ মার্চ) রাতেও রাজধানীর টোলারবাগে মোটরসাইকেল ছিনিয়ে নেওয়ার সময় বাধা পেয়ে এক নিরাপত্তাকর্মীকে কুপিয়ে হত্যা করেছে ছিনতাইকারীরা। প্রায় একই সময়ে মিরপুর-২ নম্বর সেকশনেও দুই নিরাপত্তাকর্মীকে কুপিয়ে মোটরসাইকেল ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। প্রশ্ন উঠেছে, আইন শৃঙ্খলা বাহিনী এত তৎপরতা দেখানোর পরও কেন ছিনতাই বন্ধ করতে পারছে না?
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান বলেন, ‘ছিনতাই বন্ধে পোশাক পরা অবস্থায় এবং সাদা পোশাকে রাজধানী জুড়ে নজরদারি করে থাকে পুলিশ। বিভিন্ন এলাকায় পেট্রোল ডিউটিসহ চেকপোস্টগুলোতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। নিয়মিত ছিনতাইকারী ও ডাকাত সদস্যদের গ্রেফতারও করা হচ্ছে। ছিনতাই বন্ধে পুলিশের আন্তরিকতার কোনও অভাব নেই। যে কোনও ছিনতাইয়ের ঘটনায় পুলিশ জানার সঙ্গে সঙ্গে ছিনতাইকারীদের শনাক্ত এবং গ্রেফতারের জন্য অভিযান শুরু করে।’
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলি বলছে, রাজধানীতে অস্ত্রধারী ছিনতাইকারীদের পাশাপাশি দেশীয় অস্ত্র অর্থাৎ ছুরি-চাপাতি নিয়ে ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটছে। একইসঙ্গে সক্রিয় হয়ে উঠেছে টানা পার্টির সদস্যরা। গ্রুপভিত্তিক বড় বড় ছিনতাইকারী চক্রের পাশাপাশি এলাকাভিত্তিত ছোট ছোট ছিনতাইকারী গ্রুপও গড়ে উঠেছে। তারা বিভিন্ন এলাকার অলি-গলিতে দলবদ্ধভাবে চাকু ঠেকিয়ে পথচারীদের সর্বস্ব কেড়ে নিচ্ছে।
গোয়েন্দা পুলিশের সূত্রে জানা যায়, রাজধানীতে সংঘবদ্ধ বেশ কয়েকটি ছিনতাইকারী গ্রুপ রয়েছে। এরা মূলত ঢাকার উপকণ্ঠ সাভার, গাজীপুর, টঙ্গী, নারায়ণগঞ্জ এলাকা থেকে ভোরে বা সন্ধ্যায় শহরে এসে ছিনতাই করে পালিয়ে যায়। এছাড়া সংঘবদ্ধ ছিনতাই চক্রের সদস্যরা বিভিন্ন এলাকার ব্যাংকগুলোতে রেকি করে। কারা পরিমাণে বেশি অর্থ উত্তোলন করে, কোথায় যাবে সেসব তথ্য সংগ্রহ করে ছিনতাই করে থাকে। এছাড়া বিভিন্ন এলাকায় বিকাশের প্রতিনিধিদের বিষয়ে আগে থেকে খোঁজ-খবর নিয়ে ছিনতাই করে থাকে। ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলনের পর এবং বিকাশ প্রতিনিধিদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা হরহামেশাই ঘটছে।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ এবং র্যাবের সূত্রগুলি বলছে, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় স্পটভিত্তিক ছিনতাইয়ের বেশ কিছু জায়গা তারা চিহ্নিত করে গোয়েন্দা নজরদারি করে থাকেন। সাধারণত যেসব এলাকার সড়ক একটু নিরিবিলি এবং সড়কবাতি থাকে না সেসব এলাকা ছিনতাইয়ের জন্য বেছে নেয় ছিনতাইকারীরা। আর ভোরের দিকে ঢাকার বাইরে থেকে বাস, ট্রেন বা লঞ্চ টার্মিনালগুলোকে টার্গেট করে ছিনতাই করে থাকে। এছাড়া আবাসিক এলাকায় সকালে কেউ বাড়িতে প্রবেশ করার সময় প্রাইভেটকারের মাধ্যমে অস্ত্রধারী ছিনতাইকারী হানা দেয়।
ছিনতাই বন্ধ হচ্ছে না কেন জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, তারা গত দুই মাসে অন্তত শতাধিক ছিনতাইকারীকে গ্রেফতার করেছেন। গোয়েন্দা পুলিশের পাশাপাশি থানা পুলিশও প্রায় প্রতিদিনই কোনও না কোনও এলাকা থেকে ছিনতাইকারী বা ডাকাত সদস্যদের গ্রেফতার করছে। র্যাবও গত দুই মাসে অনেক ছিনতাইকারী গ্রেফতার করেছে। কিন্তু ছিনতাইকারীদের ধরে ধরে কারাগারে পাঠানোর পর মাস পেরোনোর আগেই তারা জামিনে বেরিয়ে আসে। কারাগার থেকে বের হয়ে ফের তারা ছিনতাই শুরু করে। এজন্য এদের ঠেকানো কিছুটা কঠিন হয়ে পড়েছে।
এদিকে ছিনতাইয়ের নতুন কৌশল টানা পার্টির সদস্যদের ঠেকানো প্রসঙ্গে গোয়েন্দা পুলিশের আরেক কর্মকর্তা বলেন, ‘এই গ্রুপটি সন্ধ্যা এবং সকালে ছিনতাইয়ের জন্য মাঠে নামে। প্রাইভেটকার বা মোটরসাইকেলে করে ছিনতাই করে এরা। কিন্তু ছিনতাইয়ের জন্য কোনও ধরনের অস্ত্র ব্যবহার না করায় এদের চেকপোস্টে ঠেকিয়েও আটক করা যায় না।’
গোয়েন্দা পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘এই গ্রুপটিকে কোনও চেকপোস্টে আটকালেও টের পাওয়া যায় না এরা ছিনতাইকারী। জরুরি কাজের কথা বলে বের হয়েছে জানিয়ে চেকপোস্ট পার হয়ে যায়। টান দিয়ে ব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার পরপরই এরা ব্যাগ থেকে নগদ টাকা বের করে নিয়ে ব্যাগটি ফেলে দিয়ে যায়। তারা নিজেরাও সাধারণ পথচারীদের বেশে চলাফেরা করে থাকে।’
প্রসঙ্গত যে, গত ৭ মার্চ রাজধানীর উত্তরায় দেশীয় অস্ত্রসহ ৬ ডাকাতকে গ্রেফতারের পর তাদের কাছ থেকে ১টি লম্বা স্টিলের কিরিচ, ৩টি লোহার চাপাতি, ২টি স্টিলের ছুরি, ১টি স্টিলের প্লাস উদ্ধার করা হয়। পুলিশ সেসময় জানায়, এরা দীর্ঘদিন বিমানবন্দর, উত্তরা পশ্চিম, টঙ্গী, জয়দেবপুর এলাকায় ডাকাতি, ছিনতাই করে আসছিল। এছাড়া ৮ মার্চ যাত্রাবাড়ী এলাকা থেকে চাপাতি ও ছোরাসহ তিন ছিনতাইকারীকে গ্রেফতারের পর পুলিশ জানায়, তারা পকেটে ছোট ছোট ছুরি নিয়ে রাস্তায় পথচারীদের কাছ থেকে ছিনতাই করে আসছিল।








