পান্থপথে বিস্ফোরণ: মন্ত্রী-এমপিসহ শতাধিক মানুষকে হত্যার পরিকল্পনা ছিল জঙ্গিদের

নুরুজ্জামান লাবু
২২ মার্চ ২০১৮, ১৬:৫২আপডেট : ২২ মার্চ ২০১৮, ১৭:২৫

হোটেল ওলিও ইন্টারন্যাশনাল ১৫ আগস্টের শোক দিবসে জঙ্গিরা মন্ত্রী-এমপিসহ শতাধিক মানুষকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল। রাজধানীর পান্থপথের হোটেল ওলিও-তে বিস্ফোরণের ঘটনা তদন্তে এই তথ্য উঠে এসেছে। নব্য জেএমবির আত্মঘাতী দলের সদস্য সাইফুলের পরিকল্পনা ছিল— যে কোনও উপায়ে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু যাদুঘরের কাছাকাছি গিয়ে বিস্ফোরণ ঘটানো। এজন্য বেশ বড় আকারের একটি বোমা তৈরি করে সাইফুলের হাতে পৌঁছে দিয়েছিল তার সহযোগীরা। এই ঘটনায় বোমা তৈরির কারিগর এবং অর্থ সরবরাহকারীসহ ১০ জনকে গ্রেফতার করেছে ঢাকার কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম- সিটিটিসি ইউনিট। গ্রেফতার ব্যক্তিদের মধ্যে আট জন ইতোমধ্যে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। সর্বশেষ মোহাম্মদ তাজুল ওরফে ছোটন নামে এক জঙ্গিকে গত শুক্রবার (১৬ মার্চ) গ্রেফতারের পর তিন দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে সিটিটিসি। সংশিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

গত বছরের ১৫ আগস্ট সকালে হামলার আগেই সিটিটিসি’র অভিযানে পান্থপথের হোটেল ওলিও ইন্টারন্যাশনালের একটি কক্ষে নিজেই বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আত্মঘাতী হয় জঙ্গি সাইফুল। ওই ঘটনায় রাজধানীর কলাবাগান থানায় পুলিশ বাদী হয়ে মামলা দায়ের করে।এ মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তা সিটিটিসি’র উপ-কমিশনার মহিবুল ইসলাম খান বলেন, ‘আমরা এই ঘটনার পুরো রহস্য উদ্ঘাটন করেছি। কারা, কেন এবং কী উদ্দেশ্যে হামলা চালানোর চেষ্টা করেছিল, তা জানা গেছে। এমনকি কারা অর্থ সরবরাহ করেছিল, তাও জানা গেছে। ইতোমধ্যে আট জন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। খুব শিগগিরই আমরা আদালতে চার্জশিটও দিয়ে দেবো।’

ঘটনার দিন ১৫ আগস্ট সকালে রাজধানীর পান্থপথের হোটেল ওলিও ইন্টারন্যাশনালের তৃতীয় তলার একটি কক্ষে আত্মঘাতী এক জঙ্গি অবস্থান করছে, এমন তথ্যের ভিত্তিতে হোটেলটি ঘেরাও করে রাখে পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট সিটিটিসি। পরে সিটিটিসি’র সোয়াট টিমের সদস্যরা অভিযান চালাতে গেলে আত্মঘাতী জঙ্গি দলের সদস্য সাইফুল ইসলাম নিজের কাছে থাকা বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। সিটিটিসি তাদের এই অভিযানের নাম দিয়েছিল ‘অপারেশন আগস্ট বাইট’।

সিটিটিসি’র তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ২০১৬ সালে হোলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার পর পুলিশের জঙ্গিবিরোধী কার্যক্রম জোরদার হয়। ধারাবাহিক অভিযানে কোনঠাসা নব্য জেএমবি আবারও ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য বড় হামলার প্রস্তুতি নেয়। এজন্য তারা ১৫ আগস্টের জাতীয় শোক দিবসকে বেছে নিয়েছিল। যাতে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের মন্ত্রী-এমপিসহ শতাধিক মানুষকে একসঙ্গে হত্যা করা যায়। তাদের টার্গেট ছিল ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর।

গ্রেফতার হওয়া জঙ্গিদের জিজ্ঞাসাবাদ, আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তি এবং গোয়েন্দা তথ্যের বরাত দিয়ে সিটিটিসি’র কর্মকর্তারা বলছেন, আত্মঘাতী জঙ্গি সদস্য সাইফুল হামলা চালিয়ে শহীদ হওয়ার জন্য অস্থির হয়ে পড়েছিল। পরিকল্পনা মতো তিন দিন আগে খুলনা থেকে ঢাকায় আসে সাইফুল। মিরপুরে এক বন্ধুর মেসে একরাত থাকে সে। পরদিন বোমাসহ হোটেল ওলিও ইন্টারন্যাশনালের তৃতীয় তলার একটি কক্ষে ওঠে। সেখান থেকে ১৫ আগস্ট সকালে ব্যাগ নিয়ে  ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে যাওয়ার কথা ছিল তার।

সিটিটিসি’র একজন কর্মকর্তা জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন শ্রদ্ধা জানাতে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে যাবেন, সেসময় গিয়ে বিস্ফোরণ ঘটনোর জন্য সাইফুলকে বলা হয়েছিল। কড়া নিরাপত্তার মধ্যেই নেতাকর্মী ও নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্যদের কাছাকাছি গিয়ে বোমাটির বিস্ফোরণ ঘটাতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। যাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, ভিআইপি অর্থাৎ মন্ত্রী-এমপিসহ অনেক লোককে হত্যা করা যায়। জঙ্গিদের ধারণা ছিল—নেতাকর্মীদের বেশি ভিড়ের কারণে বিস্ফোরণের পর হুড়োহুড়ি বা পায়ের তলায় পিষ্ট হয়েও কিছু লোক মারা যেত। সাফল্যের সঙ্গে এটি সম্পন্ন করতে পারলে তাদের নিজেদের সক্ষমতা প্রদর্শনের পাশাপাশি জঙ্গি দলে আরও বেশি লোকজনকে রিক্রুট করা সম্ভব হতো বলেও প্রত্যাশা ছিল জঙ্গিদের।

সিটিটিসি সূত্র জানায়, ১৫ আগস্ট শোক দিবসে ভয়াবহ এই হামলার পরিকল্পনাটা ছিল আকরাম হোসেন নিলয় নামে এক শীর্ষ জঙ্গির। বুধবার (২১ মার্চ ) রাতে বগুড়ায় পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়েছে সে। তার সঙ্গে গ্রেফতার হয়েছে নব্য জেএমবির আরেক জঙ্গি সাগর। জানা যায়, হোলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার পর বিভিন্ন অভিযানে শীর্ষ জঙ্গি নেতারা নিহত হলে ইংলিশ মিডিয়ামে পড়া নিলয় নব্য জেএমবির হাল ধরে। মূলত সে-ই আবারও নতুন করে নব্য জেএমবি সংগঠিত করার চেষ্টা করছিল।

সিটিটিসির আরেকজন কর্মকর্তা বলেন, নিলয়ের সহযোগী, যারা পান্থপথের ওই বিস্ফোরণের সঙ্গে নানাভাবে জড়িত, তাদেরও বিভিন্ন সময়ে গ্রেফতার করা হয়েছে। শোক দিবসে হামলার জন্য যে বোমাটি আনা হয়েছিল, সেটি তৈরি করেছিল নব্য জেএমবির বোমা তৈরির কারিগর মামুন। গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর উত্তরা এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করে সিটিটিসি। মামুনকে বোমা তৈরির উপকরণ সরবরাহ এবং আশ্রয় দিয়েছিল আইচান কবিরাজ ওরফে রফিক এবং লুলু সরদার নামে দুই জঙ্গি। গত বছরের ১৬ নভেম্বর নওগাঁ থেকে আইচার কবিরাজ এবং লুলু সর্দারসহ পাঁচ জঙ্গিকে গ্রেফতার করেছিল স্থানীয় পুলিশ। পরে মামুনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আইচান ও লুলু কবিরাজকে এই মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। এছাড়া, গত বছরের ২২ অক্টোবর শেরপুরের নকলা থেকে আবুল কাশেম ওরফে আবু মুসাব নামে আরেক জঙ্গিকে স্থানীয় থানা পুলিশ গ্রেফতার করে। ওই বছরেরই ৫ অক্টোবর নকলার চন্দ্রকোণা বাজার থেকে ১৮ ড্রাম তরল কেমিক্যাল উদ্ধার করেছিল পুলিশ, যা মামুন ও শীর্ষ জঙ্গি নেতাদের নির্দেশনায় আবু মুসবা ঘর ভাড়া করে রেখে দিয়েছিল। সিটিটিসির ওই কর্মকর্তা বলেন, আইচান কবিরাজ, লুলু সর্দার ও আবু মুসাব সবার সঙ্গেই বোমা তৈরির কারিগর মামুনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। এজন্য সবাইকে এই মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। লুলু সর্দার ছাড়া বাকিরা সবাই আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।

সিটিটিসি’র সূত্র বলছে, হোলি আর্টিজানে হামলার ঘটনার পর কোনঠাসা নব্য জেএমবিকে চাঙ্গা করতে আকরাম হোসেন নিলয় যে উদ্যোগ নিয়েছিল, তার বাবা আবু তোরাব, মা সাদিয়া হোসনা লাকি এবং বোন তাজরীন খানম শুভ্র তা সবকিছুই জানতো। নিলয়ের জঙ্গিবাদী কাজে মদদ দেওয়া, অর্থের যোগান এবং শোক দিবসে হামলার পরিকল্পনার কথা জেনেও পুলিশকে না জানানোর অভিযোগে গত বছরের ১১ নভেম্বর  গুলশান এলাকা থেকে তাদের গ্রেফতার করা হয়। এছাড়া, অর্থ সরবরাহকারী হিসেবে নিলয়ের এক বন্ধু তানভির ইয়াসিন করিমকে গত বছরের ২০ নভেম্বর গ্রেফতার করা হয়। তানভীর নব্য জেএমবিকে নতুন করে সংগঠিত করতে নিলয়কে পাঁচ লাখ টাকা দিয়েছিল বলে আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিতে জানিয়েছে।

সিটিটিসি’র কর্মকর্তারা বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, নিলয় গ্রেফতার হওয়ায় পান্থপথের বিস্ফোরণসহ নব্য জেএমবির আরও অনেক অজানা তথ্য জানা যাবে।

 আরও পড়ুন: নব্য জেএমবি'র শীর্ষ জঙ্গি সাগর ও নিলয় গ্রেফতার

 

/এপিএইচ/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
যেখানে সকালে বারান্দায় এলেই দেখা মেলে জোড়া রংধনুর
যেখানে সকালে বারান্দায় এলেই দেখা মেলে জোড়া রংধনুর
সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের আড়ালে কী
সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরের আড়ালে কী
গরমে শিশুর সুরক্ষা: সামান্য ভুলও ডেকে আনতে পারে বড় বিপদ
গরমে শিশুর সুরক্ষা: সামান্য ভুলও ডেকে আনতে পারে বড় বিপদ
থানার ভেতরে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটিয়ে আহত, ৩ পুলিশ প্রত্যাহার
থানার ভেতরে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটিয়ে আহত, ৩ পুলিশ প্রত্যাহার
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম