বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার প্রধান লক্ষ্য হয়ে উঠেছে চাকরির যোগ্যতা অর্জন। এর ফলে সৃজনশীলতা হয়ে গেছে বৃত্তবন্দি। যে বৈশ্বিক, সামাজিক ও পারিবারিক পরিবর্তন শিক্ষার্থীরা দেখে ও শেখে, তা পরীক্ষার খাতায় নেই বলে তারা স্কুলের পড়ালেখায় আগ্রহ হারাচ্ছে।
শনিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবন ও আইইআর ভবনে আয়োজিত এক জাতীয় কনফারেন্সে বক্তারা এসব কথা বলেন। ‘বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জন: শিক্ষায় করণীয় চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক দুই দিনব্যাপী জাতীয় কনফারেন্সের প্রথম দিনের কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে।
কনফারেন্সে কী নোট উপস্থাপন করেন ঢাবির শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তারিক আহসান। তিনি বলেন, ‘এ দেশের শিক্ষাব্যবস্থা আইডেনটিক্যাল পারসন বা একই ধরনের ব্যক্তি তৈরি করতে পরিচালিত হয়। ব্রিটিশ আমলে এর মূল লক্ষ্য ছিল সাম্রাজ্যবাদীদের সেবা করতে শেখা, শিল্পায়নের পরে এখন সেটির প্রধান লক্ষ্য চাকরির যোগ্যতা অর্জন। ফলে সৃজনশীলতা বৃত্তবন্দি হয়ে গেছে। লিখিত পরীক্ষাকেই ছাত্র-ছাত্রীদের সৃজনশীলতা পরিমাপের একমাত্র মাপমাঠি হিসেবে বিচার করা হয়। যে বৈশ্বিক, সামাজিক ও পারিবারিক পরিবর্তন শিক্ষার্থী ঘরে, বাইরে দেখে শেখে ও ব্যবহার করে সেটির প্রয়োগ শ্রেণিকক্ষে এবং পরীক্ষার খাতায় নেই বলে স্কুলের পড়ালেখায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।’
তিনি সমসাময়িক গবেষণা ও শিক্ষার মডেলগুলো ব্যাখ্যা করে দেখান যে, শিক্ষাকে যুগোপযোগী করতে নতুন উদ্ভাবনগুলো শিক্ষাব্যবস্থায় প্রয়োগ করতে হবে।
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তারিক আহসানের গবেষণা পর্যালোচক ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ইমেরিটাস ড. মঞ্জুর আহমেদ গবেষণাপত্রের ভাবনার সঙ্গে একমত পোষণ করে বলেন, ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য ২০৩০ সালের মধ্যে রাষ্ট্রকে অন্তত দশম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষাকে সার্বজনীন ও অবৈতনিক করতে হবে। মানোন্নয়নের জন্য প্রতিটি বিভাগের অন্তত একটি জেলায় শিক্ষা অধিদফতর স্থাপন করে শিক্ষাকে বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে।’
ইউনেসকো ঢাকা অফিসের শিক্ষাবিষয়ক প্রধান সুন লেই বলেন, ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য বাংলাদেশ সরকারের যে অঙ্গীকার, সেটি পূরণের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর শিক্ষা কর্মসূচির সঙ্গে ইউনেসকো অবিচ্ছিন্নভাবে কাজ করছে।’
শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ তার বক্তব্যে বলেন, এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সবচেয়ে বড় বাধা দারিদ্র্য। এই দারিদ্র্য দূর করতে প্রাক-প্রাথমিক থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৩৫ কোটি পাঠ্যপুস্তক বিতরণ করা হয়েছে। মেধা, সাধারণ ও উপবৃত্তির মাধ্যমে দুই কোটি ৬০ লাখ দরিদ্র শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহায়তা করা হচ্ছে।’
শিক্ষা সচিব সোহরাব হোসেন বলেন, ‘শিক্ষা মন্ত্রণালয় টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার জন্য শক্তিশালী কর্মপরিপকল্পা তৈরি করে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর মাধ্যমে বাস্তবায়ন করছে। শিক্ষা সংক্রান্ত অবকাঠামো ব্যাপকভাবে উন্নত করছে।’
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের টেকসই উন্নয়নবিষয়ক (এসসিডিজি) প্রধান সমন্বয়ক মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘তিনটি পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে।’
আইইআরের পরিচালক সৈয়দা তাহমিনা আখতার বলেন, ‘এই জাতীয় কনফারেন্সের মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ভবিষ্যত কর্মপন্থা অর্জিত হবে। দুই দিনের এ কনফারেন্সে ১১৩টি গবেষণাপত্র উপস্থাপন করা হচ্ছে।’
কনফারেন্সের শুরুতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর তৈরি একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। এরপর স্বাগত বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) অধ্যাপক ড. আবদুল মালেক।








