আদালতের নির্দেশনা অনুসারে ‘ডেথ গেম’ হিসেবে পরিচিত ব্লু হোয়েলসহ আত্মহত্যায় প্ররোচনাকারী এ জাতীয় সব গেমসের গেটওয়ে লিঙ্ক ও অ্যাপলিকেশন বন্ধ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন হাইকোর্টে দাখিল করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি মো. আশরাফুল কামালের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়।
রাষ্ট্রপক্ষে প্রতিবেদনটি দাখিল করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোতাহার হোসেন সাজু। এ সময় আদালতে রিট আবেদনের পক্ষে ছিলেন ব্যারিস্টার হুমায়ুন কবির পল্লব।
পরে আদালত ক্ষতিকর গেমসগুলোয় আসক্তদের কাউন্সিলিং এবং ব্লু হোয়েলের কারণে হলিক্রস স্কুলের ছাত্রী স্বর্ণার আত্মহত্যা করেছিল কিনা সে বিষয়ে আগামী ২৬ মে তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেন। পাশাপাশি এ বিষয়ে পরবর্তী আদেশের জন্য মামলাটি আগামী ২৭ মে কার্য তালিকায় (কজলিস্ট) রাখারও নির্দেশ দেন।
এর আগে মোবাইলে ব্লু হোয়েলের মরণনেশার ফাঁদে পড়ে রাজধানীর হলিক্রস স্কুলের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী অপূর্বা বর্ধন স্বর্ণার (১৩) আত্মহত্যার খবর প্রকাশের পর তার বাবা অ্যাডভোকেট সুব্রত বর্ধনসহ তিন আইনজীবী গত বছর হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন। সেই রিটের শুনানি নিয়ে আদালত ডেথ গেম হিসেবে পরিচিত ‘ব্লু হোয়েল’ গেমসহ আত্মহত্যায় প্ররোচনাকারী এ জাতীয় সব গেমের গেটওয়ের লিঙ্ক ও অ্যাপলিকেশন বন্ধে পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দেন।
পাশাপাশি যারা এসব গেমসে আসক্ত, তাদের বিষয়ে তদন্ত করে প্রতিবেদন তৈরি এবং আসক্তদের কাউন্সিলিং করতে একটি বিশেষজ্ঞ টিম গঠন করতে নির্দেশ দেন। এছাড়াও রাত ১২টা ১ মিনিট থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত মোবাইল ফোন অপারেটরদের রাত্রিকালীন বিশেষ ইন্টারনেট অফার ছয় মাসের জন্য বন্ধের নির্দেশ দিয়ে রুল জারি করেছিলেন আদালত।
পরে মোতাহার হোসেন সাজু সাংবাদিকদের বলেন, ‘আদালতের নির্দেশনা মোতাবেক একটি স্পেশাল মনিটরিং কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি গঠনের আগে যে গেটওয়ের মাধ্যমে এসব গেম আসতো তা ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। রাত ১২টার পরে যে সমস্ত অপারেটর সুবিধা করে দিতো, যার কারণে স্বল্প খরচে বা অনেক সময় দেখা গেছে পয়সা না দিয়েও সুযোগ নেওয়া যেতো সে পথও এখন বন্ধ। অপারেটরদের তা বন্ধ করতে বলে দেওয়া হয়েছে। এরপরও কোনও কিছু দৃষ্টিগোচর হলে তা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা বিটিআরসিরকে জানাতে বলা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘স্বর্ণার আত্মহত্যা ব্লু হোয়েলের কারণে নয়। অন্য কারণে। সেটার জন্য মামলা পেন্ডিং (অমীমাংসিত) আছে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত স্বর্ণার মৃত্যুর কারণ এখনই নিশ্চিত করে বলা যাবে না। এর বাইরেও আরও কিছু কারণ ছিল। যেমন, কী কারণে আত্মহত্যা করেছে, কাউন্সিলিং হয়েছে কিনা, আদালত এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রস্তুতের জন্য আগামী ২৬ মে পর্যন্ত সময় দিয়েছেন।’
এদিকে হাইকোর্টে দাখিল করা প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, ‘হাইকোর্টের আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ স্পেশাল মনিটিরিং কমিটি গঠন করে। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন এর চেয়ারম্যান ড. শাহজাহান মাহমুদকে সভাপতি করে ১১ সদস্যের এ কমিটি গঠন করা হয়। তবে কমিটির সভাপতি ও সদস্য সচিবের নির্দেশে পুলিশ সদর দফতর, ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন্স মনিটরিং সেন্টার এবং বিটিআরসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কো-অপ্ট (সদস্য) করা হয়। কমিটির প্রথম সভা গত ১৪ মার্চ এবং দ্বিতীয় সভা ২৮ মার্চ অনুষ্ঠিত হয়।’
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ‘সভায় ইন্টারনেটের মাধ্যমে পরিচালিত ক্ষতিকর মোবাইল/অনলাইন গেমস সংক্রান্ত বিশদ পর্যালোচনা করা হয়। পর্যালোচনায় দেখা যায়, ডার্ক ওয়েব/ডিপ ওয়েব-এ এসব ক্ষতিকর, আত্মঘাতীমূলক অনলাইন গেমসসমূহ খেলার জন্য ক্রিপটোকারেন্সি বা বিট কয়েনের মাধ্যমে অর্থ প্রদান করতে হয়। যা ছাত্রছাত্রী বা সাধারণ জনগণের জন্য দুরূহ।’
হলিক্রস স্কুলের ছাত্রী স্বর্ণার আত্মহত্যার কারণ হিসেবে ক্ষতিকর অনলাইন গেমসের সংশ্লিষ্টতা সম্পর্কে প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘হলিক্রস স্কুলের ছাত্রী স্বর্ণার আত্মহত্যার কারণ হিসেবে ক্ষতিকর অনলাইন গেমসের সংশ্লিষ্টতা ছিল কি না, সে বিষয়ে সভায় আলোচনা করা হয়। বিষয়টি নিয়ে নিউমার্কেট থানায় যোগাযোগ করা হয়। এ বিষয়ে থানার ইন্সপেক্টর (তদন্ত) জানান, সুরতহাল অনুযায়ী ঘটনাটি আত্মহত্যা বলে প্রতীয়মান হলেও ক্ষতিকর অনলাইন গেমসের কোনও সংশ্লিষ্টতা পরিলক্ষিত হয়নি।’
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ‘কমিটির সদস্য সচিব বিটিআরসির মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মোস্তফা কামাল ক্ষতিকর মোবাইল বা অনলাইন গেমস প্রতিরোধে বিটিআরসির গৃহীত পদক্ষেপ কমিটির সদস্যদের অবহিত করেন।’
গৃহীত এসব পদক্ষেপ হলো:-
১. হাইকোর্টের নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে মোবাইল ও অনলাইনে ক্ষতিকর গেমস বন্ধ করার জন্য বিটিআরসির লাইসেন্সপ্রাপ্ত সব ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ে (আইআইজি) এবং মোবাইল ফোন অপারেটরদের নির্দেশনা প্রদান করা হয়।
২. অনলাইনভিত্তিক আত্মঘাতী/সংঘাতমূলক/রাষ্ট্র ও সমাজবিরোধী ওয়েবসাইট ও গেমস ব্যবহার সীমিত করতে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত রাত ১২টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত নতুন ও চলমান সব প্রমোশনাল ইন্টারনেট/ডাটা অফার বন্ধ রাখার জন্য মোবাইল ফোন অপারেটরদের নির্দেশনা প্রদান করা হয়।
৩. কতিপয় ক্ষতিকর অনলাইন গেমস, অ্যাপলিকেশন্স, ওয়েবসাইটের নাম উল্লেখপূর্বক তা বন্ধ করার জন্য সব আইআইজিকে নির্দেশনা প্রদান করা হয়। এগুলো ছাড়াও অন্য কোনও ক্ষতিকর অনলাইন গেমস, অ্যাপলিকেশন্স, ওয়েবসাইট পাওয়া গেলে পরবর্তী নির্দেশনার জন্য বিটিআরসিকে অবহিত করতেও জানানো হয়।
৪. গেমসের ক্ষতিকর এসব বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে স্ক্রলে প্রচারের জন্য সব টিভি চ্যানেলকে অনুরোধ করা হয়।








