আইসিডিডিআরবিতে গত কয়েকদিনে ডায়রিয়া রোগীর চাপ বেড়েছে। সেখানে রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্তের বিভিন্ন বয়সী রোগী ভর্তি হচ্ছেন। শিশু, তরুণ, বয়স্ক কেউ বাদ নেই। আইসিডিডিআরবির হাসপাতালে গিয়ে বৃহস্পতিবার দেখা যায়, প্রতি মুহূর্তেই রোগী এসে ঢুকছেন হাসপাতালে। সেখানকার চিকিৎসকরা বলছেন, ঢাকার বাইরে এখনও ডায়রিয়ার প্রকোপ নেই। শুধু ঢাকাতেই হচ্ছে। এখানকার পানি দূষণকেই এর কারণ বলে মনে করছেন তারা। পানি কোথায় দূষিত হচ্ছে তা খুঁজে বের করার তাগিদ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
আইসিডিডিআরবির প্রধান চিকিৎসক ও হাসপাতাল প্রধান ডা. আজহারুল ইসলাম খান বলেন, এখন গরমের প্রকোপ কম, তারপরও প্রচুর ডায়রিয়ার রোগী আসছে। এই ডায়রিয়া পরিস্থিতি আগামীতে ঠিক কোন দিকে যাবে তা এখনই বলা মুশকিল।
জান্নাতুল ফেরদৌসের (১১ মাস) পাঁচদিন আগে ডায়রিয়া শুরু হয়। বৃহস্পতিবার ঢাকার ধামরাই থেকে মেয়েকে হাসপাতালে নিয়ে এসেছেন মা সুলতানা। তিনি বলেন, ‘ও যা খাচ্ছে, তা-ই বমি করে বের করে দিচ্ছে।’ এই মায়ের দুই সন্তান–এক ছেলে এক মেয়ে। ছোট মেয়েটি অসুস্থ হওয়ায় মায়ের মন প্রচণ্ড খারাপ। এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলার সময় কাঁদছিলেন তিনি।
৭ মাসের মেয়ে আইরিনকে এদিন সকালে হাসপাতালে ভর্তি করেছেন টাঙ্গাইলের রেশমা। তিনি বলেন, ‘গত কয়েকদিন ধরে ওর ডায়রিয়া হচ্ছে। এখানে ভর্তি ছিলাম চারদিন। এরপর গত রাতে সায়েদাবাদে আমার ফুফুর বাড়িতে চলে যাই। সেখানে রাতে ওর আবার ডায়রিয়া আর বমি শুরু হওয়ায় এখানে আজ আবার ভর্তি করেছি।’
গ্রামীণ ট্রাস্টের এমডি ও মনিপুরের বাসিন্দা ফজলুর রহমান (৬০) বুধবার বেলা ৩টার দিকে এ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তিনি বলেন, ‘এখানে আসার সঙ্গে সঙ্গে ওরা আমাকে ৬-৭টা স্যালাইন খেতে দিয়েছে। আমার মেয়েও চিকিৎসক। সে প্রাথমিকভাবে বাসায় চিকিৎসা দিয়েছিল। ডায়রিয়ার সঙ্গে বমি হয়, ওষুধে উন্নতি না হওয়ায় আমাকে এখানে নিয়ে এসেছে। আমার শরীর থেকে তরল পানি বেরিয়ে যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত কোনও উন্নতি হয়নি। চিকিৎসক বলেছেন, ৭২ ঘণ্টা না যাওয়া পর্যন্ত কিছু বলা যাবে না। পানি শূন্যতার কারণে শরীর খুব দুর্বল হয়ে পড়েছে।’
টঙ্গীতে একটি ওষুধ কোম্পানিতে কর্মরত উইলিয়াম আহমেদ (৩২) জানান, গতকাল থেকে তার ডায়রিয়া হচ্ছে। বৃহ্স্পতিবার সকালে অবস্থা খুব খারাপ হওয়ায় আইসিডিডিআরবিতে ভর্তি হন।
আইসিডিডিআরবির রিসার্চ অফিসার মল্লিকা শিকদার বলেন, ‘আজ (বৃহস্পতিবার) আমাদের রোগীর সংখ্যা কিছুটা কমেছে। ৬ এপ্রিল রোগী ভর্তি হয়েছেন ৭৮৮ জন, ৭ এপ্রিল ৭৩৫ জন, ৮ এপ্রিল ৭৩২ জন, ৯ এপ্রিল ৬৪১ জন, ১০ এপ্রিল ৬৩৯ জন, ১১ এপ্রিল ৫৮৫ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন।’ তিনি বলেন, এখানে বছরের দুই সময়–মার্চ-এপ্রিল এবং জুন-জুলাইয়ের দিকে রোগী বেড়ে যায়। এখানে চিকিৎসা সম্পূর্ণ ফ্রি। আমরা কোনও রোগীকে ফেরত দেই না। চাহিদা অনুযায়ী বেড বৃদ্ধি করা হয়।’
তিনি বলেন, ‘ডায়রিয়া যেহেতু পানিবাহিত রোগ; পানির কারণে, পথের খাবার খেয়ে, আখের শরবত খেয়ে অনেকে এই রোগে আক্রান্ত হয়। এলাকাভিত্তিক রোগী এখানে বেশি আসে। যেমন মিরপুরের রোগী বেশি।’
আইসিডিডিআরবির প্রধান চিকিৎসক ও হাসপাতালের প্রধান ডা. আজহারুল ইসলাম খান বলেন, ‘দূষিত পানি, দূষিত খাবার এবং পরিবেশের কারণে মানুষ বেশি ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়। মার্চের শেষ দিকে, এপ্রিলের শুরু থেকে মে’র মাঝামাঝি পর্যন্ত ডায়রিয়ার প্রকোপ বেশি থাকে। বৃষ্টির মৌসুমের আগমুহূর্তে ডায়রিয়ায় বেশি আক্রান্ত হয় মানুষ।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রচণ্ড গরম, পানির দূষণের মাত্রা বেড়ে যাওয়া ও শরীরের ঘামের মাধ্যমে পানি বেরিয়ে গিয়ে মানুষ বেশি ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়। প্রচণ্ড গরম পড়লে ডায়রিয়ার প্রকোপ বাড়ে। এবার এখনও গরম পড়েনি। তারপরও প্রচুর ডায়রিয়ার রোগী আসছে। তার মানে বলা যায়, এটা গরমের জন্য হচ্ছে না। ঢাকার বাইরে ডায়রিয়ার প্রকোপ নেই। শুধু ঢাকাতেই হচ্ছে। শুধু ঢাকায় কেন বেড়ে গেল সেটা দেখার বিষয়। পানিটা এখানে মূল সমস্যা। আমরা মনে করছি না যে, ওয়াসার যেখান থেকে পানিটা আসছে সেখানে ময়লা পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। পানি সরবরাহের পর তা যেখান থেকে ব্যবহার হচ্ছে, সেখানে সমস্যা থাকতে পারে। পানির আসলে কোথায় সমস্যা সেটা খুঁজে বের করা দরকার। পানির মূল স্থানে, সরবরাহে না ব্যবহারে সমস্যা হচ্ছে সেটি খুঁজে বের করতে হবে।
প্রতিরোধ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘হাত পরিষ্কার রাখা, টয়লেট ব্যবহারের পর সাবান ব্যবহার, ছোট শিশুদের শুধু মায়ের বুকের দুধ পান করানো, ডায়রিয়া হলে ওরস্যালাইন খাওয়ানো–এই ম্যাসেজগুলো আমরা সতর্কতা হিসেবে দিতে চাই।’
তিনি আরও বলেন, ‘এক-দুই সপ্তাহ এই ডায়রিয়ার প্রকোপ থাকার পর তা এমনিতেই কমে আসে। এখন গরমের প্রকোপ কম, তারপরও প্রচুর ডায়রিয়ার রোগী আসছে। কয়েকদিন পর এটা কমবে না বাড়বে, তা বলা খুব কঠিন। আগে থেকে বলা যাবে না পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে!’








