মালিককে না বলে শিশু গৃহকর্মী বিস্কুট খেয়ে ফেলেছিল। এ ‘অপরাধে’ তাকে বমি করিয়ে সেটা খেতে বাধ্য করেছেন ওই মালিক। অভিযুক্ত মালিককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। পরে আদালতের নির্দেশে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। নির্যাতনের শিকার ওই শিশুর জবানবন্দি নিয়ে তাকে তার বাবার জিম্মায় দেওয়া হয়েছে।
রাজধানীর উত্তর যাত্রাবাড়ীর ১/১৬ চতুর্থ তলার নিচতলা বাড়িতে এই ঘটনা ঘটে। নির্যাতনের শিকার শিশু গৃহকর্মীর নাম নার্গিস আক্তার (১১)। সে লক্ষ্মীপুর সদর থানার চরমনাসা গ্রামের মো. হেলালের মেয়ে। নার্গিসের বাবা মো. হেলাল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দুদিন আগে নার্গিস তার গৃহকর্তার অনুমতি ছাড়া বিস্কুট খায়। এতে মালিক ইউসুফ ক্ষিপ্ত হয়ে মুখের ভেতরে হাত দিয়ে বমি করতে বলেন। বমি করিয়ে তা তাকে খেতে বাধ্য করেন। এই ঘটনায় আমি খুব কষ্ট পেয়েছি।’’
তিনি আরও বলেন,‘গত বছর রমজানের আগে এক আত্মীয়ের মাধ্যমে উত্তর যাত্রাবাড়ীর ওই বাড়িটির নিচতলার ভাড়াটিয়া মো. ইউসুফ আলীর ফ্ল্যাটে নার্গিস কাজে আসে। তার ওপর বিভিন্ন সময়ে নির্যাতন চালিয়েছেন ইউসুফ আলী ও তার পরিবার। এরমধ্যে একবার তাকে বাড়িতে যেতে দেওয়া হয়েছে। বাকিটা সময় তাকে বাড়িতে যেতে দেওয়া হয়নি।’
বৃহস্পতিবার রাতে নার্গিসকে নির্যাতনের ঘটনায় ইউসুফ আলীকে গ্রেফতার করে যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশ। নার্গিসকে মারধরের একটি ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, নার্গিস সোফায় বসে নির্যাতনের বর্ণনা দিচ্ছে।
যাত্রাবাড়ী থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আব্দুল কাদের বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বৃহস্পতিবার রাত সোয়া ৯টার দিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৪৮ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আবুল কালাম অনু আমাদের ফোন দিয়ে বিষয়টি জানান। আমরা কাউন্সিলরের অফিসে গিয়ে নার্গিসকে উদ্ধার করি। সে যে বাসায় কাজ করতো তার গৃহকর্তাকে গ্রেফতার করা হয়।’
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, ‘নার্গিস জানিয়েছে তাকে দিয়ে ইউসুফ শরীর ম্যাসাজ করাতো। যৌন নিপীড়ন করতো। কথা না শুনলে ইউসুফ তাকে মারধর করতো।’ এসআই বলেন, ‘মেয়েটিকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছিল; তবে মিডফোর্টের চিকিৎসক সেরকম কোনও আলামত পাননি।’ ঘটনার দিন রাতেই নার্গিসের বাবা হেলালকে ফোন দিয়ে ঢাকায় আনে পুলিশ। হেলাল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ফোন পেয়ে সকালেই আমি ঢাকায় যাই। সেখানে গিয়ে জানতে পারি আমার মেয়েকে মারধর করা হয়েছে। কেউ কেউ নির্যাতনের কথাও বলেছেন।’
এদিকে, নার্গিসকে নির্যাতনের ভিডিওটি ফেসবুকে ভাইরাল হওয়ার পর তা নিয়ে চারদিকে সমালোচনা শুরু হয়। অভিযুক্ত ইউসুফের পাশের ফ্ল্যাটের সোহেল ওই ভিডিওটি ফেসবুকে ছড়িয়ে দেন বলে পুলিশ জানতে পেরেছে।
বৃহস্পতিবার সকালে অভিযুক্ত ইউসুফকে আদালতে চালান করে পুলিশ। আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেয়। শিশু নার্গিসের মেডিক্যাল পরীক্ষার পর তাকেও আদালতে নেওয়া হয়। শিশুটি আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে বলে জানিয়েছেন ডিএমপির ডেমরা জোনের সিনিয়র সহকারী কমিশনার ইফতেখায়রুল ইসলাম।
তিনি বলেন, ‘এই ঘটনায় নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের ৯ (৪) (খ) ধারায় মামলা করা হয়েছে। মামলাটি থানা পুলিশ তদন্ত করছে। চিকিৎসক কোনও ধর্ষণের আলামত পাননি। শিশুটি আদালতে যে জবানবন্দি দিয়েছে সেখানেও সে ধর্ষণের কথা বলেনি, তবে মারধরের কথা বলেছে।’ আদালত নার্গিসের জবানবন্দি শেষে তার বাবা হেলালের কাছে বুঝিয়ে দিয়েছেন বলেও জানান তিনি।
এই মামলা তদন্ত সংশ্লিষ্ট যাত্রাবাড়ী থানার এক পুলিশ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইউসুফ যে বাসায় ভাড়া থাকেন, তার পাশের ফ্ল্যাটের ভাড়াটিয়ার সঙ্গে তার ভালো সম্পর্ক নয়। নার্গিস ওই ফ্ল্যাটের এক শিশুকে কোলে নেওয়ায় বৃহস্পতিবার তার ওপর চটেন ইউসুফ আলী। তাকে মারধর করেন। মারধরের সময় নার্গিস কান্নাকাটি করে। এসময় পাশের ফ্ল্যাটের লোকজন প্রতিবাদ করেন এবং ঘটনা ভিডিও করেন। তাদের সঙ্গেও ইউসুফ আলীর বাকবিতণ্ডা হয়। তখন বাড়ির অন্যান্য ফ্ল্যাটের ভাড়াটিয়ারা বিষয়টি স্থানীয় কাউন্সিলর আবুল কালাম অনুকে জানান। কমিশনারের প্রতিনিধিরা এসে পুলিশকে খবর দেন এবং নার্গিসকে কাউন্সিলরের অফিসে নিয়ে যান। সেখানে বসে নার্গিসের কাছে বিভিন্ন প্রশ্ন করে নির্যাতনের বিষয় জানতে চাওয়া হয়। এরপর সেই ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
ঘটনার পর ফেসবুকে যে ভিডিও দেওয়া হয়, তার ক্যাপশনে সোহেল অভিযোগ করেন শিশু নির্যাতনকারী ইউসুফকে যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশ ছেড়ে দিয়েছে। এমনকি মামলাও নেওয়া হয়নি।
তবে এসি ইফতেখায়রুল ইসলাম এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘সঙ্গে সঙ্গেই অভিযুক্ত ইউসুফকে গ্রেফতার করা হয়। শিশুটিকে মেডিক্যালে পাঠানো হয়। মেয়েটির বাবার মামলা নেওয়া হয়। আসামিকে ছেড়ে দেওয়ার কোনও প্রশ্নই আসে না। তারপরও ফেসবুকে মিথ্যা তথ্য দেওয়া হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘ফেসবুকে যারা অসত্য তথ্য ছড়িয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’
ফেসবুকে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগে ইতোমধ্যে সোহেলকে আটকও করা হয়েছে। আরও দু’তিন জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নিয়ে আসা হয়েছে।








