সড়ক দুর্ঘটনায় চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদের মৃত্যুর ঘটনায় ক্ষতিপূরণ চেয়ে করা মামলায় তার পরিবারকে চার কোটি ৬১ লাখ ৪৫২ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে নির্দেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে আদালত তার পর্যবেক্ষণে বলেছিলেন, এখন থেকে সড়ক দুর্ঘটনার ফলে আহত কিংবা নিহতের পরিবার থেকে ক্ষতিপূরণের মামলা করতে পারবে। তবে আপিলে বিচারাধীন থাকায় এ মামলার ক্ষতিপূরণ এখনও আদায় সম্ভব হয়নি। ওই একই দুর্ঘটনায় নিহত এটিএন নিউজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মিশুক মুনীরের পরিবারের ক্ষতিপূরণ মামলার শুনানি চলছে হাইকোর্ট।
মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার জোকা এলাকায় ২০১১ সালের ১৩ আগস্ট ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে দুর্ঘটনায় মারা যান তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীরসহ ৫ জন। তারেক ও মিশুককে বহনকারী মাইক্রোবাসটির সঙ্গে চুয়াডাঙ্গাগামী একটি বাসের সংঘর্ষে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে একটি মামলা করে।
ওই ঘটনার প্রায় দেড় বছর পর ২০১৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি নিহতদের পরিবারের সদস্যরা মানিকগঞ্জে মোটরযান অর্ডিন্যান্সে ১২৮ ধারায় বাসমালিক, চালক ও ইনস্যুরেন্স কোম্পানির বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণ চেয়ে দুটি মামলা করেন।
মামলায় তারেক মাসুদের স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদ প্রথমে সাত কোটি ৭৬ লাখ ২৫ হাজার ৪৫২ টাকা আর্থিক ক্ষতিপূরণ দাবি করেন। পরে ক্ষতিপূরণের দাবি বাড়িয়ে প্রায় ১০ কোটি টাকা করা হয়।
এরপর সংবিধানের ১১০ অনুচ্ছেদ অনুসারে মামলা দুটি জনস্বার্থে হাইকোর্টে বদলির নির্দেশনা চেয়ে আবেদন করেন বাদীরা। হাইকোর্টে এ মামলায় ক্যাথরিন মাসুদের পক্ষে শুনানি করেন ড. কামাল হোসেন ও ব্লাস্টের নির্বাহী পরিচালক ব্যারিস্টার সারা হোসেন। অন্যদিকে, বাসমালিকদের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী আব্দুস সুবহান তরফদার। এছাড়াও রিলায়েন্স ইনস্যুরেন্স কোম্পানির পক্ষে ছিলেন ব্যারিস্টার ইমরান এ সিদ্দিকী ও ব্যারিস্টার ইহসান এ সিদ্দিকী।
শুনানি শেষে গত ৩ ডিসেম্বর হাইকোর্ট তারেক মাসুদের মৃত্যুর ঘটনায় তার পরিবারকে ৪ কোটি ৬১ লাখ ৪৫২ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে নির্দেশ দেন। একইসঙ্গে আগামী তিন মাসের মধ্যে বাসমালিক, চালক ও সংশ্লিষ্ট ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিকে এই টাকা পরিশোধ করতে বলেন। বিচারপতি জিনাত আরা ও বিচারপতি কাজী ইজারুল হক আকন্দের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চ এই রায় দেন।
এরপর রায়ের লিখিত কপি বিচারপতিদের স্বাক্ষরের পর প্রকাশিত হলেও বাসমালিকদের একটি আপিল আবেদন শুনানির অপেক্ষায় থাকায় ক্ষতিপূরণ পাওয়ার সম্ভাবনা দীর্ঘায়িত হচ্ছে।
এ বিষয়ে ব্লাস্টের আইনজীবী রমজান আলী সিকদার বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ‘বাসমালিকদের একটি আপিল শুনানির অপেক্ষায় থাকায় এ মামলায় ক্ষতিপূরণ পেতে দেরি হচ্ছে।’
এদিকে, ওই একই দুর্ঘটনায় এটিএন নিউজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মিশুক মুনীরের নিহতের ঘটনায় করা ক্ষতিপূরণ মামলায় বিচার কাজ শুরু হয়েছে হাইকোর্টে। বিচারপতি জিনাত আরা ও বিচারপতি কাজী মো. ইজারুল হক আকন্দের বেঞ্চে এ মামলার শুনানি শুরু হয়। আদালতে বাদী পক্ষে ছিলেন শুনানিতে আছেন আইনজীবী রমজান আলী সিকদার, মোতাহার হোসেন ও বিলকিস আক্তার মিলি।
মামলাটি সম্পর্কে রমজান আলী সিকদার বলেন, ‘মামলার ৩ নম্বর সাক্ষী দিলারা বেগম জলিকে ইতোমধ্যে জেরা করেছেন বিবাদী পক্ষের আইনজীবী। এছাড়া, চার নম্বর সাক্ষী ঢালী আল মামুনের সাক্ষ্য চলছে। আগামীকাল বুধবার (৯ মে) ঢালী আল মামুনের সাক্ষ্যগ্রহণ হবে।’
মিশুক মুনিরের মামলা চলমান থাকা অবস্থাতেই হাইকোর্টের আরেকটি বেঞ্চ থেকে মঙ্গলবার (৮ মে) সড়ক দুর্ঘটনার আরেক ভিকটিমের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিচারপতি সালমা মাসুদ চৌধুরী ও বিচারপতি একেএম জহিরুল হকের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ রাজধানীতে দুই বাসের চাপে হাত হারানো ও পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়া তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থী রাজিব হাসানের দুই ভাইকে এক কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার অন্তর্বর্তীকালীন এ আদেশ দেন। একইসঙ্গে বিআরটিসি ও স্বজন পরিবহনকে একমাসের মধ্যে ক্ষতিপূরণের অর্ধেক টাকা রাজিবের দুই ভাইকে পরিশোধ করে আদালতকে জানাতে বলা হয়। পাশাপাশি আগামী ২৫ জুন মামলার পরবর্তী আদেশের দিন নির্ধারণ করা হয়।
এ বিষয়ে রিটকারী আইনজীবী রুহুল কুদ্দুস কাজল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘রাজিবের খালা জাহানার পারভীন এবং রাজিবের গ্রামের বাড়ি বাউফলের সাবেক চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদের ছেলে কাস্টমস কর্মকর্তা ওমর ফারুকের নামে মতিঝিলে সোনালী ব্যাংকের প্রধান শাখায় একটি যৌথ অ্যাকাউন্ট খোলা হবে। বিআরটিসি এবং স্বজন পরিবহনের মালিককে একমাসের মধ্যে ২৫ লাখ টাকা করে ৫০ লাখ টাকা জমা দিতে হবে ওই অ্যাকাউন্টে।’
এছাড়াও ওই ক্ষতিপূরণের টাকা জমা দেওয়ার বিষয়টি আগামী ২৫ জুনের মধ্যে আদালতকে লিখিতভাবে জানাতে হবে বলেও তিনি জানান।








