বাড্ডায় ডিশ ব্যবসায়ী আব্দুর রাজ্জাক বাবু ওরফে ডিশ বাবু (৩০) হত্যার পরিকল্পনা হয় মালয়েশিয়ায়। ডিশ ব্যবসা ও এলাকার আধিপত্য নিয়ন্ত্রণ নিতে বাবুকে দুই দফায় হত্যার পরিকল্পনা করে সন্ত্রাসীরা। দ্বিতীয়বার তারা সফল হয়। পুরো পরিকল্পনা হয় মালয়েশিয়ায়। ঢাকায় থাকা সন্ত্রাসীরা তা বাস্তবায়ন করে। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও নিহত বাবুর পরিবার এমনটাই দাবি করেছে।
এদিকে হত্যার সঙ্গে জড়িত একজন বুধবার (৯ মে) রাতেই ডিবির সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে। গ্রেফতার অপর দুই জনের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি এখনও।
ডিবি পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘বাড্ডা, ভাটারা ও গুলশান এলাকার ডিশ ব্যবসা একচেটিয়াভাবে বাবুর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ডিশ বাবুর নিয়ন্ত্রণ থেকে এই ব্যবসা মালয়েশিয়া প্রবাসী রবিন নিয়ন্ত্রণ নিতে দির্ঘদীন ধরে চেষ্টা করছিল। রবিন কোম্পানি গ্রুপের নেতৃত্বে রয়েছে। ঢাকায় তার সহযোগীরা হলো ডালিম, রমজান, তানভীর, হেলাল, শুভ, সাফায়াত তানভীর ওরফে রনি ও অভি।’
এই কর্মকর্তা বলেন, ‘রবিনের এসব এলাকা থেকে অবৈধ কোনও আয় হচ্ছিল না। তাই ঢাকায় থাকা তার সহযোগীদের বাবুকে হত্যার নির্দেশ দেয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী কোম্পানি গ্রুপ কাজ শুরু করে। গত রবিবার শুভ, সাফায়াত তানভীর, সোহেল ও রাসেলসহ আরও কয়েকজন গুলশানে বসে পরিকল্পনা করে। গুলশানের কমার্স কলেজের সামনে থেকে ওই দিন শুভর কাছ থেকে সাফায়াত তানভীর, হেলাল ও অভি অস্ত্র নিয়ে বাড্ডায় আসে। তবে, সেদিন বাবুকে তারা হত্যার সুযোগ না পেয়ে চলে যায়।’
তিনি বলেন, ‘দুই দিন বিরতি দিয়ে ফের হত্যার পরিকল্পনা করে। বুধবার শুভ নিজেই বাবুর অবস্থান নিশ্চিত হতে বাড্ডায় যায়। বিকাল তিনটার দিকে তানভীর, হেলাল ও অভি একটা মোটরসাইকেলে করে বাড্ডায় আসে। তারা রাত পর্যন্ত ওই এলাকায় ঘোরাঘুরি করে। রাত ৯টার দিকে জাগরনী ক্লাবের সামনে মোটরসাইকেল নিয়ে ঢুকে পড়ে তারা তিন জন। আগে থেকে সেখানে প্লাস্টিকের চেয়ারে বসা রতন, টুটুল ও কবিরের সঙ্গেই ছিল ডিশ বাবু। তাকে লক্ষ্য করে গুলি করে তানভীর ও হেলাল। এসময় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বাবুকে গুলি করে তারা মোটরসাইকেল নিয়ে ফের পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। কিছু দূর গিয়ে তাদের মোটরসাইকেল ভাঙ্গা রাস্তায় আটকে বন্ধ হয়ে যায়। তখন তিন জন তাদের কাঁধের ব্যাগে অস্ত্র লুকিয়ে হাতিরঝিলের দিকে হাঁটা শুরু করে। কিছু দূর যাওয়ার পর জুয়েল নামে বাড্ডার স্থানীয় এক যুবলীগ নেতা তানভীরকে দেখে চিনে ফেলে। সে তাকে ঝাপটে ধরে চিৎকার শুরু করলে স্থানীয়রা তানভীরকে ধরে ফেলে। অভি ও হেলাল পালিয়ে যায়। এসময় সোহেল ও রাসেল নামে আরও দুই তরুণকে ওই এলাকা থেকে ধরে স্থানীয়রা। পরে ডিবি পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তানভীর, সোহেল ও রাসেলকে গ্রেফতার করে। রাতভর তানভীর, সোহেল ও রাসেলকে আলাদাভাবে ও মুখোমুখি করে জিজ্ঞাসাবাদ করে ডিবি পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে ডিবি জানতে পারে সোহেল ও রাসেল উৎসুক জনতা ছিল। তারা সেখানে মারামারি দেখে ভয়ে দৌড় দিলে জনতা ধাওয়া করে তাদের ধরে ফেলে। তাদের একজনের বাবা চা বিক্রেতা আরেকজনের বাবা গাড়ি চালক। তানভীরও তাদের চেনে না বলে জানায়। এরপর ডিবি প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়, তারা দুই জন বাবু হত্যার সঙ্গে জড়িত না।
জাগরনী সংসদের ম্যানেজার মো. জামাল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ক্লাবের নিরাপত্তার জন্য পুরো এলাকায় সিসি ক্যামেরা লাগানো হয়েছে। বুধবার রাতের ঘটনার সময় আমি সেখানে ছিলাম না। ঘটনা শুনে আমি এখানে আসি। পরবর্তীতে সিসি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ পুলিশকে হস্তান্তর করেছি।’
তিনি জানান, পুরো জাগরনী সংসদের ভেতরে ও বাইরে ৯টি সিসি ক্যামেরা রয়েছে।
ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, প্রায় ১ মিনিটের এই কিলিং মিশনের তিন অস্ত্রধারী মোটরসাইকেলে করে ক্লাবের ভেতরে প্রবেশ করে। এসময় গেইটটি খোলাই ছিল। সড়কে মানুষের চলাফেরাও ছিল স্বাভাবিক। মোটরসাইকেলটি চালাচ্ছিল অভি। মাঝে হেলাল এবং পেছনে বসা ছিল তানভীর। তাদের মাথায় ক্যাপ ও মুখে মাস্ক পরা ছিল। ক্লাব মাঠে গিয়ে মোটরসাইকেল থামিয়ে গুলি চালায়। এতে ওই সময় ক্লাবের ভেতরে থাকা কয়েকজন দৌড়ে বের হতে দেখা যায়। ঠিক ৯টা ৫ মিনিটে কিলিং মিশন শেষ করে খুব স্বাভাবিকভাবেই তানভির হেঁটে হেঁটে গেটের সামনে আসেন। ওই সময় সে তার হাতে থাকা পিস্তলটি নাড়িয়ে কোমরে লুকিয়ে বের হয়। বাকি দুই জন মোটরসাইকেল নিয়ে গেটের কাছে এলেই তা বন্ধ হয়ে যায়। পরে সেখানে দ্রুত ২ থেকে ৩ বার কিক মারতেই মোটর সাইকেল চালু হয়। বের হওয়ার সময় মোটরসাইকেলে দুই জনকে দেখা যায়।
গোয়েন্দা পুলিশের উপকমিশনার (উত্তর) মো. মশিউর রহমান বলেন, ‘সাফায়াত তানভীরকে রাতে জিজ্ঞাসাবাদের পর ডিবি জানতে পারে, হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী রবিন। তার আরও সহযোগী রয়েছে আফতাব নগর এলাকায়। এরপর তানভীরকে নিয়ে অভিযানে যায় ডিবি পুলিশ। সেখানে যাওয়ার পর তার সহযোগীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি করে। পুলিশও পাল্টা গুলি করলে তানভীর গুলিবিদ্ধ হয়। তাকে বাড্ডা থানা পুলিশ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভোর ৫টার দিকে জরুরি বিভাগে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক রানাকে মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনাস্থল থেকে দুইটি পিস্তল ও একটি মোটরসাইকেল জব্দ করা হয়েছে ‘
তিনি জানান, তানভীরের বাড়ি বরিশালে। সে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ করেছে। বিয়েও করেছে। তার স্ত্রী সাভারে থাকে। ঢাকায় অপরাধ কর্মকাণ্ড করে সে সাভারে চলে যায়। ঢাকায় শুভর কাছে তাদের অস্ত্র থাকতো।
পুলিশ জানিয়েছে, তার বিরুদ্ধে তিনটি হত্যা মামলা, একাধিক অস্ত্র ও চাঁদাবাজিসহ অন্তত ৮/১০ টি মামলা রয়েছে। তার মামলার বিষয়ে পুলিশ তথ্য সংগ্রহ করছে। নিহত আব্দুর রাজ্জাক ওরফে ডিশ বাবুর লাশ ময়নাতদন্ত শেষে তার বাবা মো. ফজলুর রহমান লাশ নিয়ে গেছেন। ফজলুর রহমান স্থানীয় একটি স্কুলের নিরাপত্তা প্রহরী হিসেবে কাজ করেন। তিনি বৃহস্পতিবার বিকালে ঢামেক হাসপাতালের মর্গে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘তানভীরই বাবুকে হত্যা করে। তবে এর আগে কখনও কোনও দ্বন্দ্বের কথা শুনিনি।’
নিহত ডিশ ব্যবসায়ী বাবুর শরীরে একাধিক গুলির চিহ্ন রয়েছে বলে জানিয়েছেন ঢামেক হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান সোহেল মাহমুদ।
এদিকে, ডিবির সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত তানভীরের স্বজনরা বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত কেউ মর্গে আসেননি। তার লাশ মর্গে রয়েছে।
দুই বছর আগেও জাগরনী সংসদের ভেতরে ডিশ ব্যবসায়ী মোফাজ্জল হোসেন রাহীনকে সন্ত্রাসীরা গুলি করে হত্যা করে। এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গেও তানভীর জড়িত ছিল।








