সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে ভিত্তি করে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের উদ্দেশ্যেই পরিকল্পিতভাবে হেট স্পিচ (বিদ্বেষ ছড়াতে কারও বিরুদ্ধে আপত্তিকর মন্তব্য) ছড়নো হয় বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য সিন্ডিকেট করা, দোষারোপ করা আমাদের রাজনৈতিক চর্চার অংশ। সামাজিক যোগোযোগ মাধ্যম আসার আগেই এটা ছিল। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আসার ফলে সেটি বিস্ফোরিত হয়েছে। আর গণমাধ্যম গবেষকরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানো এই নেতিবাচক প্রচারণার বিপরীতে মূলধারার অনলাইন পত্রিকার দায়িত্ব সঠিক তথ্য প্রচার করা। এ জন্য দরকার পাঠকদের মধ্যে বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি।
এদিকে কেবল বাংলাদেশ নয়, বিশ্বজুড়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে হেট স্পিচ ছড়ানোর বিষয়টি ঠেকাতে চলছে নানা উদ্যোগ। সম্প্রতি ফেসবুককে হেট স্পিচ অপসারণ করতে নির্দেশ দিয়েছেন অস্ট্রিয়ার একটি আদালত। দেশটির আদালত সেখানকার এক রাজনীতিবিদকে নিয়ে পোস্ট করা বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ফেসবুকের নেটওয়ার্ক থেকে মুছে ফেলার নির্দেশ দেন।
যত দিন যাচ্ছে, ততই অসহিষ্ণু হয়ে উঠছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারীরা। বিশেষত ফেসবুকের বিপুল ব্যবহারকারী কাউকে ব্যক্তিগতভাবে অপছন্দ করলে তাকে হেনস্তা করতে বিভিন্ন ধরনের বিদ্রূপমূলক বক্তব্য থেকে শুরু করে ফটোশপ ছবি, ক্যারিকেচার ও হেট স্পিচের ব্যবহার করছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক রোবায়েত ফেরদৌস বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ছড়ানো নানা খবর গণমাধ্যমে নানাভাবে উপস্থাপন হতে দেখা যায়, এগুলোর প্রতিবিম্ব দেখতে পাই। যখন-তখন সেটা যেন হেট স্পিচ ছড়ানোয় সহযোগী না হয়, সেটি দেখার দায়িত্ব মূলধারার গণমাধ্যমগুলো নিতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘হেট স্পিচ সংজ্ঞায়িত করা মুশকিল। আমি একজনকে একটি কথা বলে দিলাম মানেই হেট স্পিচ কিনা, নাকি আমার বলা কথায় সমাজে প্রভাব ফেলার ক্ষমতা থাকতে হবে, সেটি বিবেচনায় নিতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘যেকোনও ভিন্নমতকে বা মত প্রকাশের স্বাধীনতার জায়গা সংকুচিত করে ফেলছি কিনা, বিবেচনায় না নিলে বিপদ বাড়বে। মূলধারার পত্রিকাগুলো নিবন্ধ, উপসম্পাদকীয়তে এবং কোনটা হেট স্পিচ, সেটা সংজ্ঞায়িত করে মানুষকে সচেতন করার কাজটা করতে পারে।’
অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টরা বলছেন, যারা সমাজে বিদ্বেষ ছড়াতে চায়, যারা সুনির্দিষ্ট আদর্শর বাইরে ভিন্নমতকে গুরুত্ব দিতে শেখে না, যারা মনে করে সমাজে তারা যেভাবে ভাবছে সেটিই সত্য এবং শেষ ভাবনা তারাই গোষ্ঠীবদ্ধ হয়ে সুনির্দিষ্ট কৌশল অবলম্বন করে হেট স্পিচ ছড়ায়।
কোনও ঘটনাকে কেন্দ্র করে কারা এবং কেন হেট স্পিচে ঢুকে যাচ্ছ? এমন প্রশ্নের জবাবে অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট আরিফ জেবতিক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বাইরের কিছু না, এটি সমাজেরই প্রতিচ্ছবি। হেট স্পিচ সমাজে আছে বলেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এর প্রতিচ্ছবি দেখতে পাই।’ তিনি বলেন, ‘মানুষের মধ্যে দলীয় রাজনীতি চর্চা বেশি হয়ে গেছে। মানুষ জানে, যদি বিপরীত মতকে জায়গা দিই, তাহলে আমার স্পেস সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। তাই মানুষ মরিয়া হয়ে উঠেছে।’
এ পরিস্থিতিতে করণীয় সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘মূলধারার গণমাধ্যমগুলো সঠিক সংবাদ তথ্য যত দেবে তত হেট স্পিচ কমে আসবে। যেকোনও মতামতের ক্ষেত্রে অন্যকে স্পেস দেওয়া, ভিন্নমতকে সম্মান দেওয়ার চর্চা ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্রকে করতে হবে।’
অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট বাকী বিল্লাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের সমাজে বর্ণবিভাজন থেকে হেট স্পিচ ছড়ানো হয়, এমন না। এখন বাস্তবতা, রাজনৈতিক বিভাজনের কারণে রাজনৈতিক নেতারা যে অসহিষ্ণুতা দেখান, সেটাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এসে প্রতিফলিত হয়। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য সিন্ডিকেট করা, দোষারোপ করা আমাদের রাজনৈতিক চর্চার অংশ। সামাজিক যোগোযোগ মাধ্যম আসার আগেই এটা ছিল। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আসার ফলে সেটি বিস্ফোরিত হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘পত্রিকার নিচে যে কমেন্ট সেটা মনে হতে পারে সাধারণ পাবলিক এক্সপ্রেশন, কিন্তু তা নয়। ছোট ছোট সিন্ডিকেটগুলো কোনও একটি ইস্যুকে ম্যানুপুলেট করতে এটা করে।’
গণমাধ্যমের ভূমিকার কথা বলতে গিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘গণমাধ্যম তার ভূমিকায় সুশীল সমাজ, মিডিয়া কালচারাল অ্যাক্টিভিজমের অংশও। ফলে দায়িত্ব তাদের আছেই। মিডিয়া স্বাধীন ভূমিকায় না থাকতে পারে, বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করতে না পারে, তাহলে তাদের পক্ষে কিছু করা সম্ভব না। গণমাধ্যম ও পাঠকের মধ্যে যদি বিশ্বাসের সম্পর্কটা থাকে তাহলে হেট স্পিচ প্রতিরোধে ভূমিকা রাখা সম্ভব ।’
সমাজ উন্নয়ন চিন্তক আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘অনলাইনে আমাদের প্রকাশিত ব্যবহার আমাদের ভাবনারই প্রকাশিত অংশ। ফলে হেট স্পিচের মূলে রয়েছে আমাদের বিশ্বাস ও মূল্যবোধ এবং তার সঙ্গে মত প্রকাশের সুযোগ। আমাদের দেশে যে ধরনের হেট স্পিচের প্রচলন রয়েছে, মোটা দাগে তাদের ৩ ভাগে ভাগ করা যায়। এক ধরনের হেট স্পিচ হয় রাজনৈতিক বিশ্বাস থেকে, দ্বিতীয় ধরনটি সাম্প্রদায়িক বিশ্বাস এবং তৃতীয়টি সামাজিক বিশ্বাস থেকে হয়ে থাকে, যেমন নারী অধিকারের বিরুদ্ধে হেটস্পিচ। এর যেকোনও দুইটি বা তিনটি মিলেও এ কর্মকাণ্ডকে শক্তিশালী করে তুলতে পারে। এই তিন ধরনের বিশ্বাসী ব্যক্তিরা তাদের বিশ্বাসের বাইরের সবকিছুকে যৌক্তিক বস্তুনিষ্ঠ উপাদান দিয়ে মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হলে বেছে নেয় হেট স্পিচ। এটি সমাজে বিভাজন তৈরি করে, অন্যদিকে অনলাইন মাধ্যমে একই বিশ্বাসী মানুষগুলোকে একত্রিত হতেও সহযোগিতা করে।’
আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘মূলত ভিন্নমত ও প্রতিপক্ষকে দমিয়ে নিজের বিশ্বাসের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করতে হেট স্পিচ ব্যবহার করা হয়। সাধারণত সমাজে যাদের ব্যক্তি পরিচয় বা অবস্থান দুর্বল এমন গোঁড়া বিশ্বাসীরা হেট স্পিচ বেশি ছড়ায়। হেট স্পিচ ঠেকাতে মূলধারার গণমাধ্যম অনেক কিছুই করতে পারে। গণমাধ্যম নিজেই কোনও এক বিশ্বাসে আসক্ত না হয়ে সবার যুক্তিনিষ্ঠ মত প্রকাশের সুযোগ করে দিতে পারে। সামাজিক বিভাজন নিরসনে হেট স্পিচের বিপক্ষে লেখালেখির মাধ্যমে সামাজিক আন্দোলন ছড়িয়ে দিতে পারে। সর্বোপরি, অনলাইন ব্যবহারের ভব্যতা শিক্ষা এবং এই যোগাযোগ মাধ্যমের ইতিবাচক ব্যবহারের চর্চা বাড়িয়ে গণমাধ্যম তার ভূমিকা জোরালো করতে পারে।’








