জাতীয় বাজেটে স্থানীয় সরকারের জন্য যে বরাদ্দ থাকে তার একটি সামান্য অংশই ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ,সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদ পেয়ে থাকে। এ স্বল্প বরাদ্দের ওপরও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কর্তৃত্ব থাকে খুব কম। গত বেশ কয়েক বছর ধরে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য প্রকৃত উন্নয়ন বরাদ্দ শতকরা ২ ভাগেরও নিচে। তাই স্থানীয় সরকারের জন্য বাজেটে বরাদ্দ বৃদ্ধির পাশাপাশি বিকেন্দ্রীকরণ নীতি প্রণয়ন ও তার আলোকে স্থানীয় সরকারের জন্য সমন্বিত আইন প্রণয়নে উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন জনপ্রতিনিধি, অর্থনীতিবিদ ও স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞরা।
বুধবার (৩০ মে) সিরডাপ মিলনায়তনে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নাগরিক সমাজের সংগঠন ও নেটওয়ার্ক, স্থানীয় সরকার প্লাটফর্ম, স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে গঠিত জোট ‘গভার্নেন্স অ্যাডভোকেসি ফোরাম’ আয়োজিত বাজেটে স্থানীয় সরকার ও বিকেন্দ্রীকরণ পরিস্থিতি শীর্ষক এক মতবিনিময় সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন।
সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেন, ক্ষমতার দ্বৈততা থাকলে উন্নয়ন প্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে পড়ে। প্রশাসনিক স্তরগুলোতে জাতীয় ও স্থানীয় সরকারের মধ্যে এ দ্বৈততা রয়েছে। স্থানীয় সরকারের ওপর জাতীয় সরকারের কূট-কর্তৃত্ব রয়েছে। এ কর্তৃত্ব বাদ দিতে হবে। উপজেলা পরিষদে সংসদ সদস্যদের ‘উপদেষ্টার’ বিধান থাকা ঠিক নয়। স্থানীয় পর্যায়ে সম্পদের অপচয় ও দুর্নীতি দূর করতে হবে। টেকসই উন্নয়নের জন্য টেকসই রাজনীতি অর্থাৎ গণতান্ত্রিক সরকার,শক্তিশালী স্থানীয় সরকার থাকা প্রয়োজন। থোক বরাদ্দ বাড়াতে হবে।
ফোরামের সভাপতি ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, স্থানীয় সরকারের একাধারে রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও আর্থিক ক্ষমতায়ন দরকার। শুধু নির্বাচনি ইশতেহারে নয়, প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীও বিভিন্ন সময়ে বিকেন্দ্রীকরণের ব্যাপারে সুস্পষ্ট বক্তব্য দিয়েছেন। বাংলাদেশ বর্তমানে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এগিয়ে গেলেও মানুষের মধ্যে বৈষম্য বেড়েছে। এ বৈষম্য কমাতে হলে স্থানীয় সরকারকেই কাজে লাগাতে হবে। স্থানীয় সরকারকেই দেশের দারিদ্র্য দূরীকরণে প্রধান ভূমিকা পালন করতে হবে। মানুষকে উন্নয়নের কেন্দ্রে নিয়ে আসতে পারলেই প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব, সেক্ষেত্রেও ভরসা স্থানীয় সরকার।
বিশেষ অতিথি ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, সব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের সংকট ও চাহিদা একরকম নয়। উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নে সক্ষমতা তৈরি না হলে স্বশাসিত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে না। বিভিন্ন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যক্রম পরিচালনা ও এখতিয়ারের ক্ষেত্রে সমন্বয়হীনতা দূর করতে হবে।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন সদস্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. আখতার হোসেন বলেন, স্থানীয় সরকারগুলোর দীর্ঘ কাজের তালিকা থাকলেও সে অনুযায়ী মঞ্জুরি বরাদ্দ দেওয়া হয় না। যদিও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সূত্রে বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়ন হয়, যেখানে জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা খুব কম থাকে।
ওয়েভ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক মহসিন আলী তার প্রবন্ধে উল্লেখ করেন, ২০০৮ ও ২০১৪ সালে ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচনি ইশতেহারে বিকেন্দ্রীকরণ ও স্থানীয় সরকার বিষয়ে যে অঙ্গীকার ছিল সে আলোকে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ গৃহীত হয়নি। উপজেলা পরিষদে ‘হস্তান্তরিত’ ১৭টি দফতর ও কাজ এবং ইউনিয়ন পরিষদে ‘হস্তান্তরযোগ্য’ ৭টি বিষয়ের বাস্তবায়ন এখনও ঘটেনি। উপজেলা পরিষদে স্থানীয় সংসদ সদস্যদের ‘উপদেষ্টা’ হিসেবে ভূমিকা পালন একটি দ্বান্দ্বিক পরিস্থিতি তৈরি করেছে। ইউনিয়ন পরিষদে এখনও‘হিসাব সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর’ নিয়োগ কার্যকর হয়নি। উপজেলা পরিষদে ভাইস চেয়ারম্যানের পদসহ অন্যান্য স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে সংরক্ষিত নারী আসনের বিধান থাকলেও কার্যক্রম বাস্তবায়নে তাদের ভূমিকা নেই।
মতবিনিময় সভায় সভাপতিত্ব করেন গভার্নেন্স অ্যাডভোকেসি ফোরামের চেয়ারপারসন ও পিকেএসএফ-এর চেয়ারম্যান ড. কাজী খলীকুজ্জামান আহমদ। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার,পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা এমপি। ফোরামের সমন্বয়কারী ও ওয়েভ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক মহসিন আলী সভাটি সঞ্চালনা ও প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।








