সরকার কঠোর থেকে কঠোরতর আইন প্রণয়নের মাধ্যমে মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে সংকুচিত করে রেখেছে। জনগণের গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামকে পুলিশি নির্যাতন ও দলীয় বাহিনী দিয়ে আক্রমণ করে রাজনৈতিক মতকে দমন করছে। এজন্য নাগরিকদের মৌলিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষায় ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধের সংগ্রাম করতে হবে বলে মত প্রকাশ করেছেন আলোচকরা।
বুধবার দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে ফ্যাসিবাদী ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী জাতীয় কমিটি আয়োজিত 'ফ্যাসিবাদ ও জনগণের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস রুখে দাঁড়াও' শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে আলোচকরা এসব কথা বলেন। আলোচকরা বলেন, সম্প্রতি কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশ ও ছাত্রলীগের হামলা, নির্যাতন, গ্রেফতার ও রিমান্ড এবং আহতদের চিকিৎসায় সরকারি প্রতিষ্ঠানের বাধা দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদালয় প্রশাসনের উদাসীনতা এবং নির্যাতনকারীদের সহায়তা দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে র্যাব-পুলিশ বাহিনী দিয়ে সারাদেশে এ পর্যন্ত ১৬৩ জনকে বিনাবিচারে হত্যা করা হয়েছে।
ফ্যাসিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী জাতীয় কমিটির সভাপতি বদরুদ্দীন উমর বলেন, ‘আমাদের দেশে বর্বরোচিত যেসব কাজ হচ্ছে সেগুলো বিশ্বের অন্য কোনও দেশে হচ্ছে না। আজকের যারা ব্যবসায়ী শ্রেণি, যারা লুটপাট করছে তারাই দেশের শাসক শ্রেণি। তারা চুরির টাকা দিয়ে মনোনয়ন নিয়ে ক্ষমতায় বসছেন।’ নির্বাচন কমিশনকে শেষ করে দেয়া হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশে সরকার পরিবর্তনের কোনও অবস্থা নেই। নির্বাচন কমিশনকে অকার্যকর করে দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘দেশের সবচেয়ে বড় শয়তান হচ্ছে বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক ও সংগীত শিল্পীরা। জনগণ কোনো প্রতিরোধ গড়লে র্যাব-পুলিশ পেটায়, ব্যবস্থা নেয় কিন্তু বুদ্ধিজীবী।প্রতিরোধ যাতে গড়ে উঠতে না পারে সেজন্য কাজ করছে শিক্ষক শ্রেণি। তারা প্রতিরোধের গোড়া মেরে দিচ্ছে।’
বাংলাদেশ বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, ‘অপরাধের প্রতি জিরো টলারেন্সের ঘোষণা দিয়ে অপরাধীর সাজা রাষ্ট্রীয়ভাবে মাফ করে তাকে নিরাপদে দেশ ত্যাগের সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে। দুর্নীতিবাজদের বিচার না করে এবং মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা না নিয়ে ন্যক্কারজনক দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হচ্ছে।’ দেশের নাগরিকদের গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করে তাদের জীবনের নিরাপত্তা বিধান ও মৌলিক অধিকার সুরক্ষার দাবি জানান তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সি আর আবরার বলেন, ‘যে ন্যক্কারজনক ঘটনা আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখেছি, তার জন্য শিক্ষক হিসেবে আমি লজ্জিত। বিশ্ববিদ্যালয়ে পচন ধরেছে, আমরা একটি স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ভর্তি করি। শিক্ষার্থীরা বলছে- হলে থাকতে হলে বড় ভাইদের পা ধরতে হয়। বড় ভাইদের প্রটোকল মেনে চললেও চড়-থাপ্পড় আমাদের খেতে হয়। শুধু তাই নয়, বর্তমানে ছাত্র নেতাদের ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর হওয়ার নজিরও রয়েছে।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ম. নূরুন্নবী বলেন, ‘আমাদের দেশে গণতন্ত্রের কথা বলা হয়, তবে কোনও গণতন্ত্র নেই। একটা দল সংবিধানের কথা বলে অন্য দলকে ঠেকাচ্ছে অথচ দলটি নিজেরাই সংবিধানবিরোধী কাজ করছে। মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা লোক দেখানো, এটা সার্থক হবে না। কারণ যারা মাদকের মূলহোতা সরকার তাদের আইনের আওতায় আনছে না।’
গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ড. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, কোটা সংস্কার আন্দোলন এখন পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে বড় আন্দোলন। কিন্তু এটা আমরা বাস্তবায়ন করতে পারছি না, এটাকে ধরে রাখতে পারছি না। যারা মুক্তিযোদ্ধার নাম ভাঙিয়ে চলছে, তারা এটি হতে দিচ্ছে না।’
আয়োজক সংগঠনের সভাপতি বদরুদ্দীন উমরের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আকরাম হোসেন, মানবাধিকারকর্মী শিরীন হক, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের বিনযন চাকমা প্রমুখ।








