দেশে ভিন্ন রক্তের গ্রুপের রোগীর কিডনি প্রতিস্থাপনে যুগান্তকারী সাফল্য

বাংলা ট্রিবিউন রিপোর্ট
২২ জুলাই ২০১৮, ১৯:৩৫আপডেট : ২২ জুলাই ২০১৮, ১৯:৪৭

ভিন্ন রক্তের গ্রুপ হওয়া সত্ত্বেও মায়ের কিডনি নিয়ে সুস্থ হয়েছেন কুড়িগ্রামের ইমরান ফিরোজ। কিডনি ফাউন্ডেশন হাসপাতালে চিকিৎসারত অবস্থায় তোলা ছবি। (ছবি: সৌজন্য

রোগী ও দাতার রক্তের গ্রুপ আলাদা হওয়া সত্ত্বেও কিডনি প্রতিস্থাপন করে এক যুগান্তকারী সাফল্য দেখিয়েছে কিডনি ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট। কুড়িগ্রামের এক যুবকের শরীরে ভিন্ন রক্তের গ্রুপ হওয়া সত্ত্বেও তার মায়ের কিডনি প্রতিস্থাপন করে এই বিরল সাফল্য দেখালো প্রতিষ্ঠানটি।
কিডনি ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের মহাসচিব অধ্যাপক ডা. মুহিবুর রহমান এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ সাফল্যের খবর গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন।  
এই ঘটনার মাধ্যমে বাংলাদেশের চিকিৎসাসেবার উজ্জ্বল ইতিহাসে ঢুকে গেলেন কুড়িগ্রামের  ইমরান ফিরোজ (২৩)। দুটো কিডনিই বিকল হয়ে সংকটাপন্ন অবস্থায় পড়লেও ভিন্ন রক্তের গ্রুপ সত্ত্বেও তার মায়ের কিডনি তার শরীরে সফলভাবে প্রতিস্থাপনে সক্ষম হন কিডনি হাসপাতালের চিকিৎসকরা।

কিডনি হাসপাতালের মহাসচিবের গণমাধ্যমে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, এবিও ইনকমপ্যাটিবল কিডনি প্রতিস্থাপন (এবিওআই)’ পদ্ধতির মাধ্যমে এ ধরনের কিডনি প্রতিস্থাপন বাংলাদেশে প্রথম। এর মাধ্যমে কিডনি সংযোজনে ঘটলো যুগান্তকারী ঘটনা। এটা নিয়মিত সম্ভব হলে রোগীর সঙ্গে ডোনারের রক্তের গ্রুপের মিল থাকার দরকার হবে না। ফলে বেড়ে যাবে কিডনি দাতার সংখ্যা, সমাধান হবে ডোনার সংকটের, কমে যাবে কিডনি বেচাকেনার মতো অবৈধ কাজ। এটা বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে বড়ো অর্জন হবে।

সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা জানান, ইমরান ফিরোজকে বাঁচাতে তার মা নিজের কিডনি দিতে চাইলেও ইমরানের মায়ের রক্তের গ্রুপ আলাদা থাকায় জটিলতা ছিল। কেননা কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য কিডনি দাতার সঙ্গে  রোগীর রক্তের গ্রুপ ও টিস্যু টাইপিংয়ের যথেষ্ট মিল থাকতে হয়। এবিওআই পদ্ধতির সফল প্রয়োগে তার দেহে তার মায়ের কিডনি প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হয়। কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্টের কয়েক সপ্তাহ আগে থেকে ‘প্লাজমাফেরেসিস’ পদ্ধতিতে রক্তের প্লাজমা বা রক্তরসকে রক্তকোষ থেকে আলাদা করা হয়। একটি ছাঁকনির মাধ্যমে বারবার ছেঁকে সেখান থেকে অ্যান্টিবডিগুলো আলাদা করা হয়। আর অ্যান্টিবডি আলাদা করলে অন্য রক্তের গ্রুপের কোনও ব্যক্তির কিডনি প্রতিস্থাপন করার ক্ষেত্রে কোনও সমস্যা থাকে না। ইমরান ফিরোজের অ্যান্টিবডি ছিলো ১: ১২৮ যা ব্ল্যাড এফেরেসিস মেশিনের মাধ্যমে ও কিছু ওষুধ প্রয়োগ করে ১:৮ এ নামিয়ে আনা হয়। পুরো প্রস্তুতি শেষ হতে সময় লাগে তিন সপ্তাহ। এরপরই ট্রান্সপ্ল্যান্টের প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়।
অধ্যাপক ডা. হারুন আর রশিদ বলেন, ‘উন্নত বিশ্বে এই প্রক্রিয়ায় কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্টে সাফল্যের হার প্রায় ৯৫ ভাগ। স্বাভাবিক ট্রান্সপ্ল্যান্ট রোগীদের মতো তাদের ক্ষেত্রেও ইনফেকশন ও কিডনি রিজেকশন ছাড়া অন্য তেমন কোন ঝুঁকি নেই। তবে ট্রান্সপ্ল্যান্টের পর বিশেষ ফলোআপে থাকতে হয় কিছুদিন।’
কিডনি ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইন্সটিটিউটের মেডিক্যাল অফিসার এবং ইমরান ফিরোজের কিডনি প্রতিস্থাপন টিমের একজন সদস্য ডা. শেখ মঈনুল খোকন বাংলা ট্রিবিউনকে মোবাইলে বলেন, ‘কিডনি ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন আর রশিদের নেতৃত্বে বিশেষজ্ঞ নেফ্রোলজি টিম, ট্রান্সপ্ল্যান্ট সার্জন অধ্যাপক ডা. খুরশিদুল আলম ও অধ্যাপক ডা. সাজিদ হাসানের নেতৃত্বে ট্রান্সপ্ল্যান্ট টিম, ব্লাড ব্যাংক স্পেশালিস্ট, অ্যানেসথেসিস্ট ও নার্সের সমন্বয়ে বিশেষ টিম এই ট্রান্সপ্ল্যান্ট কার্যক্রম পরিচালনা করেন।

ভিন্ন রক্তের গ্রুপ হওয়া সত্ত্বেও মায়ের কিডনি নিয়ে সুস্থ হয়েছেন কুড়িগ্রামের ইমরান ফিরোজ। কিডনি ফাউন্ডেশন হাসপাতালে চিকিৎসারত অবস্থায় তোলা ছবি। (ছবি: সৌজন্য)
তিনি বলেন, ইমরান ফিরোজ প্রথম কিডনির সাধারণ রোগ নিয়ে আমাদের কাছে আসেন। তখন আমরা বলি তাকে যে যারা বয়সে তরুণ তাই তাদের হৃদরোগের ঝুঁকি থাকে না। তখন আমরা তাকে কিডনি  ট্রান্সপ্ল্যান্টের জন্য বলি। আমাদের দেশের আইনানুযায়ী বাইরে থেকে কিডনি নেওয়া যায় না। এদিকে, ইমরানের পরিবারে একই রক্তের কেউ নেই। পরবর্তীতে আমার হাসপাতাল তার ট্রান্সপ্ল্যান্টের সিদ্ধান্ত নেয়। এই ট্রিটমেন্ট উন্নত বিশ্বের বাইরে বাংলাদেশে আমরাই প্রথম করলাম।
তিনি বলেন, এখন ইমরান ও তার মা বাড়ি ফিরে গেছে। তারা এখন ভালো আছে। সাধারণত আমরা ট্রান্সপ্ল্যান্টের পর ১৪ দিন পর্যন্ত হাসপাতালে রাখি। এরপর ফলোআপে প্রতি সপ্তাহে ডাকি। এরপর ১৫ দিন পরপর ডাকি। এরপর প্রতি মাসে একবার ডাকি।
তিনি বলেন, ট্রান্সপ্ল্যান্ট করতে আমাদের এখানে ২ লাখ ৬০ হাজার টাকা খরচ হয়। তার সব মিলিয়ে সাড়ে আট লাখ টাকার মতো লেগেছে।
কিডনি ফাউন্ডেশনের অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অফিসার এমডি. মঈন উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে মোবাইলে বলেন, অন্য গ্রুপের রোগী ও ডোনারের মধ্যে কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্টেশন এটা একটু ব্যয়বহুল। ওর রক্ত যা লেগেছে তা পরিবর্তন করতে অনেক খরচ করতে হয়েছে। ওদেরকে সাধারণত কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্টে যে খরচ হয় সেটাই নেওয়া হয়েছে। বাকি অতিরিক্ত অর্থ ফাউন্ডেশন থেকে খরচ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, অবশ্যই আমরা আরও রোগীর ট্রান্সপ্ল্যান্ট করার চেষ্টা করবো।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) এর পেডিয়াট্রিক নেফ্রোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. তাহমিনা জেসমিন বাংলা ট্রিবিউনকে মোবাইলে বলেন, জন্ম থেকে বাবা অথবা মায়ের সঙ্গে বিশেষ করে মায়ের সঙ্গে রক্তের গ্রুপ ও টিস্যুর যদি ৫০ ভাগ ম্যাচ থাকে সেক্ষেত্রে এটা করা যেতে পারে। তবে, ভাইবোনের ক্ষেত্রে এটা ২৫ ভাগ ম্যাচ করতো। এখন বাইরের দেশে আত্মীয় নন এমন লোকরাও কিডনি দান করতে পারে। তখন কিছু দামি ভ্যাকসিন দিতে হয়। আরও কিছু প্রটোকল থাকে।

কিডনি ফাউন্ডেশনের তথ্য মতে, দেশে প্রায় দুই কোটি মানুষ কোনও না কোনোভাবে কিডনি রোগে আক্রান্ত। এরমধ্যে প্রতিবছর সম্পূর্ণভাবে কিডনি বিকল হয় প্রায় ৪০ হাজার রোগী যাদের ৮০ শতাংশই মারা যায়। বাকি ২০ শতাংশের মধ্যে ৯৫ ভাগ হেমো ডায়ালাইসিস ও ২ থেকে আড়াই ভাগ সিএপিডি ও কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্টের মাধ্যমে বেঁচে থাকে। এ পর্যন্ত বাংলাদেশে ২ হাজারের বেশি রোগীর কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট হয়েছে যাদের সবই জীবিত এবং তাদের কিডনি আত্মীয়-স্বজনদের কাছ থেকে নেওয়া।


/টিওয়াই/টিএন/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
গরমে শিশুর সুরক্ষা: সামান্য ভুলও ডেকে আনতে পারে বড় বিপদ
গরমে শিশুর সুরক্ষা: সামান্য ভুলও ডেকে আনতে পারে বড় বিপদ
থানার ভেতরে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটিয়ে আহত, ৩ পুলিশ প্রত্যাহার
থানার ভেতরে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতাকে পিটিয়ে আহত, ৩ পুলিশ প্রত্যাহার
ড্রোন কিনতে ২০০০ বিলিয়ন রুপি ব্যয়ের পরিকল্পনা ভারতের
ড্রোন কিনতে ২০০০ বিলিয়ন রুপি ব্যয়ের পরিকল্পনা ভারতের
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম