ভারতের কুকি বিদ্রোহীদের কাছে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে আনসার আল ইসলাম!

নুরুজ্জামান লাবু
২৬ জুলাই ২০১৮, ২২:৫০আপডেট : ২৭ জুলাই ২০১৮, ১৭:১৭





আনসার আল ইসলাম

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য নাগাল্যান্ড, মিজোরাম ও মনিপুরের বিচ্ছিন্নতাবাদী ‘কুকি বিদ্রোহী’দের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে বাংলাদেশের নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলাম। এমনকি কুকি বিদ্রোহীদের কাছ থেকে অস্ত্র সংগ্রহের চেষ্টাও করছে তারা। আনসার আল ইসলামের শীর্ষ নেতা সেনাবাহিনী থেকে বহিষ্কৃত মেজর জিয়া কুকিদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেছে। জিয়ার হয়ে শেখ আব্দুল্লাহ ওরফে জুবায়ের ওরফে জায়েদ ওরফে বাবেদ ওরফে আবু ওমায়ের কুকি বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতো।
গত ১৭ জুলাই চট্টগ্রাম থেকে জুবায়েরকে গ্রেফতারের পর চাঞ্চল্যকর এসব তথ্য পায় ঢাকার কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি)। জুবায়েরকে সমকামীদের অধিকার বিষয়ক ম্যাগাজিন রূপবান সম্পাদক জুলহাজ মান্নান ও তার সহযোগী মাহবুব তনয় হত্যা মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে রিমান্ডে নেওয়ার পর এসব তথ্য পাওয়া যায়। এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে সে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছে।
ভারতের নাগাল্যান্ড, মিজোরাম ও মনিপুরের সীমান্তবর্তী পাহাড়ি অঞ্চলে কুকিরা তাদের বিচ্ছিন্নতাবাদী কার্যক্রম চালালেও বাংলাদেশের চট্টগ্রামের পাহাড়ি অঞ্চল ও মিয়ানমারের চিন প্রদেশেও তাদের উপস্থিতি রয়েছে। কুকিরা দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের অধিকার আদায় ও স্বাধীনতার জন্য লড়াই করে আসছে।
আনসারুল্লাহ বাংলা টিম— পরবর্তীতে যারা আনসার আল ইসলাম নাম নিয়ে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে আসছে— সেটির ইন্টেল বা গোয়েন্দা শাখার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছে জুবায়ের। সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, জুবায়ের সংগঠনের ‘রাহবার’ বা পথপ্রদর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতো। দালালদের মাধ্যমে ভারতে সংগঠনের সদস্যদের পাঠাতো সে। একই সঙ্গে মেজর জিয়ার ঘনিষ্ঠ ও আস্থাভাজন হওয়ায় সংগঠনের তহবিল সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করতো জুবায়ের।

সিটিটিসির উপ-কমিশনার মহিবুল ইসলাম খান বলেন, ‘জুবায়ের আনসার আল ইসলামের খুবই গুরুত্বপূর্ণ একজন সদস্য। সে জুলহাজ-মান্নান হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। তার কাছ থেকে সাংগঠনিক চাঞ্চল্যকর অনেক তথ্য পাওয়া গেছে। আমরা সেসব যাচাই-বাছাই করে দেখছি।’

জিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, জুবায়েরের সঙ্গে আনসার আল ইসলামের শীর্ষ নেতা বহিষ্কৃত মেজর সৈয়দ জিয়াউল হকের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। চট্টগ্রামের নাসিরাবাদের (৭৬বি জাকির হোসেন রোড) বাসিন্দা জুবায়েরের বাসায় মাস ছয়েক আগেও জিয়া কিছুদিন অবস্থান করেছে। বর্তমানে জিয়া বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলে অবস্থান করলেও তার সুনির্দিষ্ট অবস্থান সম্পর্কে জানা যায়নি।
মেজর (বহিষ্কৃত) জিয়া ও জুবায়ের

সিটিটিসির জিজ্ঞাসাবাদে জুবায়ের জানিয়েছে, জিয়া সবসময় সতর্কতার সঙ্গে চলাফেরা করে। বর্তমানে তার মুখে দাড়ি নেই। একস্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়ার আগে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। নিরাপত্তার স্বার্থে তার আস্তানার ঠিকানাগুলো কখনও জানতে পারেনি সে। তবে পার্বত্য অঞ্চলে জিয়ার চলাফেরার তথ্য দিয়েছে জুবায়ের।
প্রতি মাসে ৫-৬ লাখ টাকা সংগ্রহ
জিজ্ঞাসাবাদে জুবায়ের জানিয়েছে, জিয়ার নির্দেশে সে প্রতিমাসে একবার করে ঢাকায় আসতো। ঢাকার একাধিক ব্যক্তি তাকে দুই থেকে ছয় লাখ টাকা দিতো। সে এই টাকার একটি অংশ জিয়ার কাছে পাঠানো ছাড়াও জিয়ার নির্দেশেই সংগঠনের বিভিন্ন ইউনিটের প্রধানদের কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতো।
জুবায়েরের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সিটিটিসির কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমানে তাদের সংগঠনের জন্য মাসিক পাঁচ থেকে ছয় লাখ টাকা ব্যয় হয়ে থাকে। সারা দেশে আনসার আল ইসলামের সমর্থকদের কাছ থেকে এসব টাকা আসতো। এছাড়া দেশের বাইরে থেকেও হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ আসার প্রমাণ পাওয়া গেছে। জিয়ার নির্দেশে ঢাকার এক ব্যক্তি এসব টাকা গুছিয়ে জুবায়েরের হাতে তুলে দিতো। পুলিশ ওই ব্যক্তির সাংগঠনিক নাম পেয়েছে, তবে তদন্তের স্বার্থে তার নাম প্রকাশ করেনি।
সিটিটিসির অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আনসার আল ইসলামের সিমপ্যাথাইজার হিসেবে যারা অর্থ সহযোগিতা করে থাকে তাদের বিষয়ে কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের বিষয়ে বিস্তারিত খোঁজ-খবর করা হচ্ছে।’
জুলহাজ-তনয় হত্যাকাণ্ডে জড়িত
গ্রেফতারের পর চার দিনের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেওয়ার পাশাপাশি জুলহাজ মান্নান ও মাহবুব তনয় হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথাও স্বীকার করেছে জুবায়ের। ২০১৬ সালের ২৫ এপ্রিল কলাবাগানের নিজ বাসায় জুলহাজ-তনয়কে কুপিয়ে হত্যা করার সময় জুবায়ের ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিল। তার দায়িত্ব ছিল বাসা শনাক্ত করার পর নিয়মিত জুলহাজ-তনয়ের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা। গত সোমবার (২৩ জুলাই) জুবায়ের ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের বিচারক আহসান হাবীবের কাছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।
জুলহাস মান্নান ও মাহবুব তনয়

স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে জুবায়ের জানিয়েছে, ২০১৩ সালে আনসার আল ইসলামে যোগ দেয় সে। এরপর পর্যায়ক্রমে সে সংগঠনের সুরা সদস্য হিসেবে মনোনীত হয়। একই সঙ্গে সংগঠনের কথিত ইন্টেল বা গোয়েন্দা শাখার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে।
স্বীকারোক্তিতে জুবায়ের জানিয়েছে, ২০১৬ সালের ১৪ এপ্রিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলায় সমকামীদের একটি র্যা লি হওয়ার কথা ছিল। সেই তথ্য অনুযায়ী সে তিন সহযোগী নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে যায়। এর আগেই সে ফেক ফেসবুক আইডি খুলে সমকামীদের দলে ঢুকে জুলহাজ মান্নানের বাসা শনাক্ত করে। ঘটনার দিন কুরিয়ার সার্ভিসের কর্মী পরিচয়ে অপারেশন শাখার পাঁচ জন ও ইন্টেল শাখার তিন জন জুলহারে বাসার সামনে যায়। অপারেশন শাখার সদস্যরা বাসায় ঢুকে জুলহাজ ও তনয়কে কুপিয়ে হত্যা শেষে নিরাপদে বেড়িয়ে যাওয়ার পর তারা ঘটনাস্থল থেকে চলে যায়।
পুলিশ কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানান, জুলহাজ-তনয় ছাড়াও জুবায়ের পুরানো ঢাকার ব্লগার নাজিমুদ্দিন সামাদ ও ব্লগার নিলয় হত্যাকাণ্ডেও অংশ নেয়। জুবায়েরের মাধ্যমে জুলহাজ-তনয় হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়া খুনিদের ছবি শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের গ্রেফতারের জন্য এরই মধ্যে ছবি প্রকাশ করা হয়েছে। তাদের ধরতে অভিযান চলছে।

/এইচআই/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বিদ্যুতের দাম বাড়ায় শিল্প ও জ্বালানি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে
বিদ্যুতের দাম বাড়ায় শিল্প ও জ্বালানি খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম