সার্টিফিকেট বাণিজ্য, বোর্ড অব ট্রাস্টিজ নিয়ে দ্বন্দ্ব,অর্ধ শতাধিক আউটার ক্যাম্পাস, ভাড়া বাড়িতে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনাসহ নানা অনিয়ম দুর্নীতির কারণে সরকার ২০০৬ সালে বন্ধ ঘোষণা করে আমেরিকা বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি। এ নির্দেশের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করে স্থগিতাদেশ পেলেও দীর্ঘদিন ধরে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে চালু নেই শিক্ষা কার্যক্রম। অথচ খোলা রয়েছে অফিস, অভিযোগ পাওয়া গেছে, এখানে বিক্রি হচ্ছে সার্টিফিকেটও। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) সম্প্রতি আকস্মিক এক পরিদর্শনে গিয়ে দেখেছে, ১১২ জনকে বিভিন্ন প্রোগ্রামে উত্তীর্ণ হিসেবে সার্টিফিকেট দেওয়ার প্রস্তুতি চূড়ান্ত করেছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। ইউজিসি এ সংক্রান্ত এক প্রতিবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে দাখিল করেছে। যদিও সার্টিফিকেট বিক্রির কথা বাংলা ট্রিবিউনের কাছে অস্বীকার করছেন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসি সূত্রে জানা গেছে, গত ১০ এপ্রিল শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে ইউজিসিতে পাঠানো এক চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে এবং উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী বারিধারা-নর্দা, প্রগতি সরণির ৫৪/১, নম্বর ভবনে বিশ্ববিদ্যালয়টি পরিদর্শনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় ইউজিসি’র কর্মকর্তারা। পরে গত ৫ জুন আকস্মিক পরিদর্শনে যায় ইউজিসি’র ৬ থেকে ৮ সদস্যের একটি টিম।
পরিদর্শন থেকে ফিরে ইউজিসি শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে সম্প্রতি একটি প্রতিবেদন পাঠিয়েছে। ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ওই ভবনের একটি হাসপাতাল, দুটি দোকান এবং ভবনের অষ্টম তলায় ২২শ’ স্কয়ার ফিটের একটি ফ্ল্যাটে বিশ্ববিদ্যালয়টির অফিস। দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও অফিসটিতে ১২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী রেখে তাদের বেতন ভাতা দেওয়া হচ্ছে। শাহ গোলাম মুসা নামের এক ব্যক্তি ইউজিসি’র টিমের কাছে বিশ্ববিদ্যালয়টির বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান হিসেবে নিজেকে দাবি করেন। যদিও ফ্ল্যাটের ভাড়া, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন কেন দিচ্ছেন তার উপযুক্ত কারণ দেখাতে পারেননি মুসা।
একটি কক্ষে কয়েকটি কম্পিউটার বসিয়ে তার সামনে কয়েকজন কর্মচারী কাজ করছেন বলে দেখতে পায় ইউজিসির পরিদর্শন টিম। এরপর কম্পিউটারগুলোর ফাইল ঘেঁটে প্রায় ১১২ জনের বিভিন্ন প্রোগ্রামের সার্টিফিকেট দেওয়ার কাজ চূড়ান্ত অবস্থায় দেখেছেন ওই টিম। প্রমাণস্বরূপ ওই প্রতিবেদনের সঙ্গে এই কর্মকাণ্ডের ছবি যুক্ত করা হয়েছে।
ইউজিসি মন্ত্রণালয়কে আরও জানিয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়টির বিরুদ্ধে থাকা মামলার নথিতে দেখা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব ট্রাস্টিজ তিনটি গ্রুপে বিভক্ত। এই তিনটি গ্রুপ একে অপরের বিরুদ্ধে মামলা চালিয়ে যাচ্ছেন।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে এ প্রতিবেদন পাঠানোর পর গত সপ্তাহে সরেজমিনে পরিচয় গোপন করে ওই বিশ্ববিদ্যালয়টি ঘুরে আসেন বাংলা ট্রিবিউনের এ প্রতিবেদক। সেখানে দেখা যায়, ভবনটির নিচতলায় বিক্রমপুর মিষ্টান্ন ভাণ্ডার, ছনিয়া জেনারেল স্টোর এবং বারিধারা জেনারেল হাসপাতালের প্রবেশ দরজা রয়েছে। দোতলায় সোনালী ব্যাংকের একটি শাখা এবং তিন তলা থেকে ৭ম তলা পর্যন্ত বারিধারা জেনারেল হাসপাতাল। ভবনটির সামনে বিশ্ববিদ্যালয়টির কোনও সাইনবোর্ড দেখা যায়নি। তবে ভবনে লিফট ব্যবহার করে অষ্টম তলায় এলে চোখে পড়ে দেওয়ালে লাগানো আমেরিকা বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইনবোর্ড। পাশেই একটি নোটিশ বোর্ড। ডানের কাঠের দরজা দিয়ে প্রবেশ করতেই কাচে ঘেরা কয়েকটি কক্ষ। প্রতিটি কক্ষে প্রতিটি টেবিলে একটি করে কম্পিউটার। পাশেই একটি বড় কক্ষ। সেখানে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে সারিবদ্ধভাবে রাখা কয়েকটি কম্পিউটারে কাজ করছেন কয়েকজন কর্মী। কথা বলতে চাইলে তারা যোগাযোগ করতে বলেন আমেরিকা বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের অফিসে।
বামে অফিসের প্রবেশ দরজা দিয়ে প্রবেশ করতেই দেখা যায়, রিসিপশন ডেস্কে বসে আছেন এক নারী কর্মী। ভেতরে কাচে ঘেরা আরও কয়েকটি কক্ষ। অফিসের দায়িত্বশীল কোনও কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়টির ডাইরেক্টর মোহাম্মদ কামরুজ্জামান কথা বলতে রাজি হলেন। পরিচয় গোপন রেখে করা এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘আপাতত বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনও শিক্ষার্থী নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। আগামী সেপ্টেম্বর থেকে ভর্তি নেওয়া হবে।‘ খুব শীঘ্রই ভর্তি বিজ্ঞপ্তিও দেবেন বলে বাংলা ট্রিবিউনকে জানান এই কর্মকর্তা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়টি ঢাকাসহ বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে সার্টিফিকেট বিক্রির জন্য রিটেইলার ও এজেন্ট নিয়োগ করেছেন। যাদের মাধ্যমে কাস্টমার সংগ্রহ করে মোটা অংকের অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে এই প্রতারক চক্র। এদিকে উচ্চ আদালতে মামলা চলায় বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ভর্তির বিষয়ে ভর্তিচ্ছুদেরকে বারবার সতর্ক করে বিজ্ঞপ্তি দিচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন।
সার্টিফিকেট বেচাকেনার বিষয়ে জানতে চাইলে সার্টিফিকেট বিক্রির বিষয়টি অস্বীকার করেন তিনি। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘আমাদের শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ, কোনও শিক্ষার্থী নেই। সার্টিফিকেট কেন দেবো? এখান থেকে কোনও সার্টিফিকেট সরবরাহ করা হয় না।’ ইউজিসির দেওয়া প্রমাণসহ প্রতিবেদনটি ভুল দাবি করেন তিনি। বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান শাহ গোলাম মুসা’র সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাইলে মুসা কারও সঙ্গে কথা বলেন না বলেও জানান তিনি।
ইউজিসি’র ওই প্রতিবেদনে সুপারিশে বলা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়টিতে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন অমান্য করছে। শিক্ষার্থী নেই অথচ সার্টিফিকেট বিক্রি করছে। বিশ্ববিদ্যালয়টির তিনটি বোর্ড অব ট্রাস্টিজের মধ্যে দ্বন্দ্ব এবং উচ্চ আদালতে মামলা চলছে। এমন অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়টি পরিচালনার বিষয়ে সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে।
জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আব্দুল মান্নান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ইউজিসি’র একটি টিম বিশ্ববিদ্যালয়টির ওই অফিসে আকস্মিকভাবে পরিদর্শনে যায়। পরিদর্শনে গিয়ে ভয়াবহ কিছু অনিয়ম পাওয়া গেছে। বিভিন্ন প্রোগ্রামের ১১২ টি সার্টিফিকেট প্রস্তুত করা হয়েছে। তাছাড়া তারা এখনও বিশ্ববিদ্যালয় আইন মোতাবেক নিজেদেরকে প্রস্তুত করেনি। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষা কার্যক্রম চালু করার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। এর যাবতীয় তথ্য-প্রমাণ প্রতিবেদন আকারে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। পরবর্তী সিদ্ধান্ত সরকারের।’
আরও পড়ুন- জাল সনদে চাকরি করছেন ৮৪০ জন শিক্ষক








