রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের কাছে শিক্ষার্থীদের চাপা দেওয়া বাস জাবালে নূরের (ঢাকা মেট্রো ব-১১৯২৯৭) চালকের নাম-পরিচয়সহ বিস্তারিত তথ্য জানেন না পরিবহনটির চেয়ারম্যান জাকির হোসেন। সোমবার (৩০ জুলাই) বাংলা ট্রিবিউনের পক্ষ বাসটির চালক ও হেল্পারদের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলে তিনি প্রথমে কোনও তথ্য দিতে পারেননি। পরে খোঁজ-খবর নিয়ে শুধু চালকের নাম সোহাগ বলে জানাতে পারলেও হেল্পারের নাম-ঠিকানা জানাতে পারেননি।
গতকাল রবিবার (২৯ জুলাই) দুপুরের দিকে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের সামনে বিমানবন্দর সড়কে বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থী নিহত হন। তারা হলেন শহীদ রমিজউদ্দীন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র আবদুল করিম ওরফে সজীব ও একই কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্রী দিয়া খানম ওরফে মীম।
এ ঘটনায় অভিযুক্ত চালক বা হেল্পারের নিয়োগপত্র কিংবা চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স আছে কিনা, সে ব্যাপারেও নিশ্চিত নন জাবালে নূর পরিবহনের চেয়ারম্যান জাকির হোসনে। তবে তিনি জানান, লাইসেন্স অবশ্যই থাকার কথা। কারণ, লাইসেন্স ছাড়া কোনও চালককে তারা গাড়ি দেন না।
জাকির হোসেন বলেন, ‘চালক অপরাধ করেছে। সে জন্যই আমরা তাকে র্যাবের হাতে তুলে দিয়েছি। দোষ করে থাকলে তার অবশ্যই শাস্তি হওয়া উচিত। আমরা কখনও বেপরোয়া গাড়ি চালানোকে সমর্থন দিই না।’
চালক বা হেল্পারকে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়েছে কিনা জানতে চাইলে জাকির হোসেন বলেন, ‘আসলে তারা তো আমাদের পারমানেন্ট (স্থায়ী) কোনও কর্মচারী না। তারা এই আছে এই নেই। এই আসে, এই যায়। এজন্য তাদের বিস্তারিত কোনও কিছু রাখা হয় না। তবে চাকরি দেওয়ার আগে তাদের একটা সিভি (বায়োডাটা) রাখা হয়। রেজিস্টার খাতায় নাম উল্লেখ রাখা হয়।’
হেল্পারের কোনও তথ্য নেই তার কোম্পানির কাছে। এসব কারণে দুর্ঘটনা বা অপরাধমূলক ঘটনা ঘটিয়ে চালক ও হেল্পাররা সহজেই পার পেয়ে যাচ্ছেন বলে মনে করছেন পরিবহন সংশ্লিষ্টরা।
তবে শিক্ষার্থীদের চাপা দেওয়া এই বাসটির চালক চুক্তিভিত্তিক বাস চালাতো বলে জানা গেছে। চুক্তিভিত্তিক হওয়ায় চালকের বিস্তারিত কোনও তথ্য কোম্পানির কাছে নেই। কেননা, এ ধরনের চালকরা ট্রিপভিত্তিক মজুরি পেয়ে থাকেন।
আরও পড়ুন: শিক্ষার্থী নিহতের ঘটনায় দুই বাসচালকসহ গ্রেফতার ৪
জানতে চাইলে যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘রুট পারমিট দেওয়ার সময় বাসের ভাড়া নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। তখন কিন্তু চুক্তিভিত্তিক নয়, নিয়োগভিত্তিকের কথা উল্লেখ আছে। চালকদের বেতনসহ ভাড়া নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। কিন্তু মালিকরা তা মানছেন না। চুক্তিভিত্তিক হওয়ার কারণেই চালকরা সড়কে যাত্রী নিয়ে কাড়াকাড়ি করছে। সে কারণেই এই দুর্ঘটনা ঘটছে।’
পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সড়কে পরিবহন চালক ও মালিকদের অসম প্রতিযোগিতার কারণেই দুর্ঘটনা ঘটছে। কারণ, মালিকের ভাড়া পরিশোধের পর যা থাকে তা-ই পান চালক। তাই রাস্তায় কার আগে কে যাবেন, কে বেশি যাত্রী তুলবেন—এমন প্রতিযোগিতায় বেপরোয়া হয়ে ওঠেন রাজধানীর পরিবহন চালকরা। তীব্র যানজট থাকার পরও এ প্রতিযোগিতা দেখা যায় বিভিন্ন রুটে একই প্রতিষ্ঠান কিংবা ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পরিবহনের মধ্যে। আবার একই রুটে একই মালিকের গাড়ির সঙ্গেও তাদের প্রতিযোগিতা দেখা যায়।
শনিবারের দুর্ঘটনাও একই সূত্রে গাঁথা। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ওই দিন দুপুরে শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থীরা র্যাডিসন ব্লু হোটেলের পাশ দিয়ে রাস্তা পার হচ্ছিলেন। অনেকেই আবার বাসের জন্য ফুটপাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এ সময় জাবালে নূর পরিবহনের একটি বাস এলে শিক্ষার্থীরা সেটিতে ওঠার চেষ্টা করে। পাশাপাশি একই পরিবহনের আরেকটি বাস বাম পাশ দিয়ে ঢুকে শিক্ষার্থীদের চাপা দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই দিয়া খানম মীম ও আব্দুল করিম সজীব নিহত হন।
এ বিষয়ে যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব বলেন, ‘যদি বেতনভিত্তিক নিয়োগ হতো তাহলে এই চালক যাত্রী ওঠানোর জন্য তার একই কোম্পানির অন্য বাসের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতো না।’
শিক্ষার্থীদের চাপা দেওয়া বাস জাবালে নূরের পরিচালক নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের শ্যালক মো. নান্নু মিয়া (৫০)। একই সঙ্গে তিনি মন্ত্রীর খালাতো ভাইও। থাকেন রাজধানীর বনশ্রী এলাকায়। জাবালে নূর পরিবহনের সঙ্গে মাহমুদ হোসেন নামে নৌপরিবহনমন্ত্রীর আরেক আত্মীয়ও জড়িত আছেন বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা সব মালিককে একাধিকবার চিঠি দিয়ে জানিয়েছি কোনও বাস চুক্তিভিত্তিক চালানো যাবে না। এছাড়া সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে আরও কিছু জনগুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কিন্তু অনেক মালিক তা মানছেন না।’








