২০০৭ সালে আপিল বিভাগের এক যুগান্তকারী রায়ের মাধ্যমে সরকারের নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে পৃথক করা হয়। এর ফলে নিম্ন আদালতের নথি স্থানীয় জেলা প্রশাসকের কাছে থাকার বিধান ওই বছরই চলে যায় সংশ্লিষ্ট বিচারিক আদালতের হাতে। কিন্তু নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথক হওয়ার আগে ২০০৫ সালের একটি রায়ের যাবতীয় নথি না পাওয়ায় আপিলের আইনগত পদক্ষেপ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন প্রতারণা মামলায় সাজা পাওয়া কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ার দক্ষিণ চরটেকী গ্রামের আবু সাইদ।
মামলার বেশ কিছু আদেশের কপি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০০৫ সালে দণ্ডবিধির ৪০৬/৪২০ ধারায় আসামি আবু সাইদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে চার বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেন কিশোরগঞ্জের বিচারিক আদালত। সে রায়ের পর থেকে প্রায় ১৪ বছর পলাতক ছিলেন এই আসামি। তবে তার বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি থাকায় তাকে পাকুন্দিয়া থানা পুলিশ গত ২২ মে গ্রেফতার করে। এরপর সংশ্লিষ্ট বিচারিক আদালতে হাজির করা হলে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন আদালত। তবে কারাবন্দি থাকা অবস্থায় এ মামলা থেকে খালাস চেয়ে কিশোরগঞ্জের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বরাবর আইনজীবীর মাধ্যমে আপিল আবেদন করেন আসামি আবু সাইদ। কিন্তু ২০০৫ সালে রায় হওয়া মামলা সংক্রান্ত নথি আদালতে না থাকায় কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসকের রেকর্ড রুমের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে নথি চেয়ে আদেশ দেওয়া হয়।
আসামির আইনজীবী মোহাম্মাদ আব্বাস উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, মামলাটি ছিল ২০০৫ সালের। তখন প্রতিটি মামলার নথি জেলা প্রশাসকের রেকর্ড রুমে সংরক্ষণ করা হতো। কিন্তু ২০০৭ সালে বিচার বিভাগ পৃথক হয়ে যাওয়ায় মামলার যাবতীয় নথি এখন সংশ্লিষ্ট আদালতের কাছেই সংরক্ষিত রাখা হয়, যার কারণে ২০০৫ সালের মামলার নথি ২০১৮ সালে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে কয়েক দফা তলব করেও কোনও নথি পাননি বিচারিক আদালত। এরপর গত ২৩ এপ্রিল আসামির পক্ষে আপিল দায়ের সাপেক্ষে জামিন আবেদন করা হয়। কিন্তু কিশোরগঞ্জের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মামলার মূল নথি পাওয়ার পর ২০ মে আসামির জামিন বিষয়ে আদেশের দিন ধার্য রাখেন। পরে নির্ধারিত তারিখের মধ্যে নথি না পাওয়ায় আদালত মামলাটি পুনরায় ৩১ মে আদেশের জন্য রাখেন।
নথি তলবের বিষয়ে গত ২০ মে কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসকের রেকর্ড রুম শাখার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও সহকারী কমিশনার মো. মনোয়ার হোসেন আদালতকে জানান, মামলার মূল নথি খুঁজে পাওয়ার জন্য অফিসে রক্ষিত নিষ্পত্তি করা মামলার জমাকৃত রেকর্ডপত্র খোঁজাখুঁজি করা হয়। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও নথিটি পাওয়া যায়নি। নথিটি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে খোঁজা হচ্ছে। মূল নথি পাওয়ামাত্রই তা আদালতে পাঠানো হবে।
এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ৩১ মে আদালত এক আদেশে বলেন, এ মামলার রায়ের মূল কপি তলব করা সত্ত্বেও জেলা প্রশাসকের রেকর্ডরুম থেকে পাওয়া যায়নি। তাছাড়া আসামির সাজার মেয়াদ এক বছরের বেশি হওয়ায় তার জামিন আবেদনটি নামঞ্জুর করা হলো। এরপর আসামির আরেকটি আবেদনের শুনানি নিয়ে গত ৭ জুন কিশোরগঞ্জের দায়রা জজ আদালত তার আদেশে বলেন, এ মামলায় নিম্ন আদালতের নথি পাওয়া যায় না বলে একটি প্রতিবেদন দাখিল হয়েছে। রায় ও সংশ্লিষ্ট আদেশের কোনও কপি দাখিল করা হয়নি। এ অবস্থায় রায় ও আদেশ না পড়ে, না পর্যালোচনা করে আপিল শুনানির কোন সুযোগ নাই। তাই এ অবস্থায় আপিল গ্রহণ করার কোনও সুযোগ না থাকা এবং রায়ের দীর্ঘ ৪ হাজার ৭২৬ দিন পর আপিল দায়ের করায় তা তামাদিসহ সার্বিক পর্যালোচনা করে আপিলটি গ্রহণ করার প্রশ্নে নামঞ্জুর করা হয়। পাশাপাশি তার জামিন আবেদনও নাকচ হয়।
এ অবস্থায় মামলার নথি চেয়ে পুনরায় আদেশ দেন কিশোরগঞ্জের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট। পাশাপাশি এ বিষয়ে পরবর্তী আদেশের জন্য ৬ আগস্ট দিন নির্ধারণ করা হয়। এদিকে কয়েক দফা তলব করেও মামলার নথি না পাওয়ায় জামিন চেয়ে হাইকোর্টে শরণাপন্ন (রিভিশন আবেদন) হন আবু সাইদ। জামিন আবেদনের শুনানি নিয়ে গত ১ আগস্ট বিচারপতি আবু বকর সিদ্দিকের একক হাইকোর্ট বেঞ্চ তাকে ৬ মাসের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দেন। পাশাপাশি এ মামলার নথি খুঁজে পাওয়ার বিষয়টিও জানাতে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।
আইনজীবী মোহাম্মদ আব্বাস উদ্দিন বলেন, ‘হাইকোর্টে জামিন শুনানিতে আমরা আদালতকে বলেছি, আসামির বিরুদ্ধে নিম্ন আদালত ২০০৫ সালে রায় ঘোষণা করে। তাই তিনি গ্রেফতার হওয়ার পর এ বিষয়ে আপিলের সিদ্ধান্ত নেন। অথচ কয়েক দফা তলব সত্ত্বে মামলার মূল নথি পাওয়া যায়নি। তাছাড়া সাংবিধানিকভাবে সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান সুযোগ পাওয়ার অধিকারী। প্রত্যেক আসামি আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পাওয়ার অধিকারী। সুতরাং নথি না পাওয়া সত্ত্বেও এ সময়ের মধ্যে আসামি কারাগারে থাকায় আইনের ব্যত্যয় ঘটে। তাই এসব বিষয় বিবেচনা করে আদালত আসামিকে জামিন দেন।’
এ বিষয়ে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল শেখ সিরাজুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আদালত তাকে ৬ মাসের জামিন দিয়ে এই সময়ের মধ্যে নথি পাওয়া গেলে হাইকোর্টকে জানাতে বলেছেন। এরপরও যদি নথি পাওয়া সম্ভব না হয়, তবে আদালত চাইলে তাকে এ মামলা থেকে খালাস প্রদান করতে পারেন। সেজন্য আদালতের পরবর্তী আদেশের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।’








