শেষ রাতে ব্যাপারীদের কান্না

শাহেদ শফিক
২২ আগস্ট ২০১৮, ১০:১৭আপডেট : ২২ আগস্ট ২০১৮, ১৪:১৬

গরু বিক্রি করতে না পেরে কাঁদছেন ইউনুস আলী

কাঙ্ক্ষিত দাম না পেয়ে ও পশু বিক্রি করতে না পেরে রাজধানীর কোরবানির হাটগুলোতে পশু ব্যবসায়ীরা অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। সোমবার (২০ আগস্ট) পর্যন্ত পশুর দাম যথেষ্ট ভালো পেলেও মঙ্গলবার (২১ আগস্ট)  সকাল থেকে পশুর দাম অর্ধেকের নেমে আসে। জীবিকার তাগিদে অনেকেই অপেক্ষাকৃত কম দামে পশু বিক্রি করে দিয়েছেন। আবার অনেক ব্যবসায়ী দাম না পাওয়ায় পশু বিক্রি করতে পারেননি। শেষ রাতে কম মূল্যে পশু বিক্রি করে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন অনেকেই।

মানিকগঞ্জের বাগুটিয়া চর কাটারিপাড়া থেকে ১৩ জন চরবাসী মিলে ২৬টি গরু নিয়ে রাজধানীর মেরাদিয়ে হাটে এসেছেন ইউনুস আলী। সোমবার পর্যন্ত ৮টি গরু বিক্রি করতে পারলেও বাকি ১৮টি গরু বিক্রি করতে পারেননি তারা।

ইউনুস আলী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গতকাল (সোমবার) যে গরু ক্রেতারা ৬০ হাজার টাকা বলেছে, আজ  (মঙ্গলবার) সেই গরুর দাম বলছে ২৫ হাজার টাকা। এই দামে গরু বিক্রি করলে লাভ তো দূরের কথা, অনেক টাকা লস হবে।’

অবিক্রিত গরু নিয়ে চিন্তিত দুই ব্যবসায়ী এই ব্যবসায়ী কান্না জড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার দুইটা ছেলে মেয়ে মাদ্রাসায় পড়ে। কিছু লাভের আসায় এত দূর থেকে গরু নিয়ে ঢাকায় এসেছি। কিন্তু দুটা টাকা নিয়ে যদি বাড়ি না ফিরি, তাহলে তারা ঈদের জামাতে যাবে না। বাড়ি ফিরবো কেমনে?’ বলেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।

কুষ্টিয়া থেকে ২২টি বড় বড় গরু নিয়ে হাটে এসেছেন তবিবুর রহমান। তিনি জানান, তার প্রতিটি গরুর দাম  দুই লাখ টাকা করে। মানুষ গরুগুলো দেখতে আসে। কিন্তু দাম বলে সর্বোচ্চ ৮০ হাজার টাকা করে। এ কারণে তিনি একটা গরুও বিক্রি করতে পারেননি। পরে রাত ১০টার দিকে গরুগুলো ট্রাক ভর্তি করে আবারও গ্রামের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন।

তিনি বলেন, ‘গ্রাম থেকে গরুগুলো আনতে প্রতিটির জন্য আড়াই হাজার টাকা করে মোট ৫৫ হাজার টাকা ট্রাক ভাড়া দিতে হয়েছে। এখন বাড়ি ফেরত নিতে প্রতিটি গরুর জন্য তিন হাজার টাকা করে দিতে হচ্ছে। সব টাকাই লস। বড় গরু হওয়ায় কেউ কিনতে চায় না। দামও বলে না।’ বলতে বলতে চোখের পানি মুছতে থাকেন তবিবুর।

শুধু মানিকগঞ্জের ইউনুস আলী কিংবা কুষ্টিয়ার তবিবুর রহমান নয়, তাদের মতো  শত শত পশু ব্যবসায়ী কেঁদেছেন পশু বিক্রি করতে না পেরে, কেউবা ন্যায্য দাম না পেয়ে।

অবিক্রিত গরু নিয়ে হতাশ ব্যবসায়ীরা সোমবার নাগরীর ২৫টি হাটের প্রায় সব কটিতেই এমন পরিস্থিতি দেখা গেছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, ভারত ও মিয়ানমার থেকে গরু আসার কারণে বাজারে দেশি গরুর দাম কমে গেছে।

মঙ্গলবার সকাল থেকেই রাজধানীর কোরবানির পশুর হাটগুলোতে ছিল মন্দা। পর্যাপ্ত গরু দেখা গেলেও ক্রেতা ছিল কম। গত কয়েকদিন ধরে ক্রেতা-বিক্রেতাদের মধ্যে দর-কষাকষির চিত্র দেখা গেলেও মঙ্গলবার তা আর ছিল না। ক্রেতারা যে দাম বলছেন তা শুনে মন খারাপ হয়ে যায় ব্যবসায়ীদের।
তারা জানান, সোমবার থেকে ভারত ও মিয়ানমারের পশু আসতে শুরু করে। তারা ধারণা করেছিলেন এবার কোনও পশু আসবে না, সীমান্তে কড়াকড়ি থাকবে। যে কারণে গত বছরের মতো এবছরও শেষ মুহূর্তে পশুর সংকট দেখা দিতে পারে। তাই এত দিন বেশি দাম হাঁকিয়ে পশু ধরে রেখেছেন। কিন্তু  সোমবার থেকে ভারত ও মিয়ানমারের পশু আসতে থাকায় মঙ্গলবার পশুর অনেকটাই দাম পড়ে যায়।

 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর হাটগুলোতে শেষ সময়ে যারা এসেছেন, তারা কম দামে পশু পেয়ে ফিরছেন হাসিমুখে। আর কাঙ্ক্ষিত দাম না পেয়ে বিক্রেতাদের চোখেমুখে হতাশার ছাপ দেখা গেছে। সেগুনবাগিচার বাসিন্দা হাজী শাহ আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘রাতে গাবতলী হাট থেকে একলাখ ২০ হাজার টাকা দিয়ে একটা গরু কিনেছি। অনেক বড় গরু। মাংসও অনেক হবে। তুলনামূলক দামটা কমই হয়েছে।’
জানা গেছে, রাতে গাবতলীতে কোরবানির পশুর হাটে অনেক ব্যবসায়ীই দাম না পেয়েছে শেষ রাত পর্যন্ত হাটে অপেক্ষা করেছেন, যারা ঈদের দ্বিতীয় বা তৃতীয় দিন কোরবানি দিচ্ছেন তাদের জন্য।
ঈদের দিন সকালে আফতাব নগর হাটে দেখা গেছে, তখনও পশু নিয়ে বসে আছেন কয়েকজন ব্যবসায়ী। তাদের একজন দিনাজপুরের নাজিম উদ্দিন। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি চারটা গরু নিজের খামারে লালন-পালন করে বিক্রির জন্য ঢাকায় এনেছি। কিন্তু যে দাম, এই দামে বিক্রি করলে পথে বসতে হবে। এখনও বিক্রি করতে পারিনি। গরুগুলো ঢাকায় আনতে খরচ হয়েছে। বাড়িতে ফেরত নেওয়ার কোনও টাকা নেই। সেজন্যই বসে আছি, দেখি বিক্রি হয় কিনা।
বাংলাদেশ মাংস ব্যবসায়ী সমিতির মহাসচিব রবিউল আলম গাবতলী হাটের চিত্র তুলে ধরে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গাবতলী হাটে অনেক গরু। কিন্তু বিক্রি নেই। ব্যবসায়ীরা বাড়ি নিয়ে যাচ্ছেন। এখন ট্রাকও পাচ্ছেন না। ভারত ও মিয়ানমার থেকে অনেক বেশি গরু আসায় এই অবস্থা।’
এই হাটের ইজারাদার মো. লুৎফুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এবার বাজারের অবস্থা খুবই খারাপ। প্রচুর পশু রয়েছ গেছে। ভারতীয় গরুও অনেক। দেশি ব্যবসায়ীরা বিপাকে পড়েছেন। পশুর পেছনে তাদের যে পরিমাণ ব্যয় হয়েছে, তা কিছুতেই পোষাতে পারছেন না। অনেক ব্যবসায়ী চিন্তায় পড়ে গেছেন। অনেকেই খরচ পোষাতে কম দামে বিক্রি করে দিয়েছেন।’
খিলক্ষেত বনরূপা আবাসিক প্রকল্পের খালি জায়গার হাটের ইজারাদার আনিছুর রহমান নাইম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পশুর দাম অনেক কম। বিক্রেতারা কম দামেই বিক্রি করে দিয়েছেন। তারা হতাশ। দাম না পেয়ে অনেকেই কান্না করছে।’

 

/এপিএইচ/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম